নোনাজলে নীলপদ্ম : শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের জীবনধর্মী উপন্যাস

শাহাবুদ্দীন চৌধুরী

শুক্রবার , ২৩ মার্চ, ২০১৮ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ
124

‘নোনাজলে নীলপদ্ম’ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের জীবনধর্মী উপন্যাস। মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের বাস্তবমুখী জীবনাচার গুলোই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের কর্মহীন বিপুল জনগোষ্ঠির জীবন-যন্ত্রণার কথামালা দিয়েই উপন্যাসের চরিত্র চিত্রায়ণ। উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণে যে ছরি আঁকা হয়েছে, তা চাকরি প্রত্যাশায় অপে মান বাংলাদেশের হাজারো কর্মহীন মধ্যবিত্ত সমাজের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি।
হাড়-হাভাতে হকার হাশেম মিয়ার জীবনটাও যেমন। মুক্তিযুদ্ধে ভাই হারানো বেকার হাশেম মিয়া চাকরির আশায় ঘুরে ঘুরে অবশেষে পত্রিকা হকার হলেও তার মর্মোপলব্ধিতে বেকার জীবনের যে কষ্ট, যন্ত্রণা, হতাশা বাসা বাঁধে তা সে উপলব্ধি করতে পারে। তাইতো রাহুল কিংবা মফিজরা যখন আসে তখন তাদেও পত্রিকা খুলে পড়তে দেয়। চাকরির বিজ্ঞাপনের সংবাদগুলো হাশেম ওদের দেয়। এও তো একটা জীবনের জন্য আরেকটা জীবনের সহমর্মিতা।
একদিকে কর্মজীবী মানুষের ব্যস্ততা, তাদের জীবনাচার, সমাজচিন্তা, অন্যদিকে নিয়োগকর্তাদের বিলাসী জীবন-যাপন, এই দু’য়ের মধ্যে রাহুলের চাকরি খোঁজা। যেন একটা অধ্যায়ে স্বপ্ন দেখার পর, আরেকটা অধ্যায়ে স্বপ্নভঙ্গের সূচনা। এমনকি বড়কর্তার অফিসের দারোয়ান, তার মানবিক আচরণটাও রাহুলকে ভাবিয়ে তোলে। জীবনের ও জীবিকার সংগ্রামে প্রতিনিয়ত হোঁচট খাওয়া এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবকের সংগ্রামী পথচলা।
উপন্যাসের অনন্ত চরিত্রটি প্রতি পরতে পরতে আশা-নিরাশা, ভালোবাসার দোলাচলে দুলছে। এমন মানুষের সংখ্যা আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে কম নয়। মানুষ ভালোবাসার কাঙ্গাল। এ চিরন্তন সত্যটি অনন্ত’র জীবন চরিত্রটির মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।
উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সাথে মিশে আছে সমাজ চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের কথা। আছে প্রেম- ভালোবাসা, হতাশা-বঞ্চনা, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক অবক্ষয়, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পূর্ণতা-অপূর্ণতার দোলাচলে জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ জীবনবোধের কথা। বইটির ভূমিকায় কথাশিল্পী মনি হায়দার ঠিক এভাবেই বলেছেন- “তরুণ কথাশিল্পী মিলন বনিকের উপন্যাস ‘নোনাজলে নীলপদ্ম’। নোনাজলের স্রোতে কথাকার মূলত মানুষের লড়াকু মহাকেন্দ্রের ছবিই এঁকেছেন। ‘নোনাজলে নীলপদ্ম’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রাহুল। মেসে থাকে, টিউশনি করে আর চাকরি খোঁজে। গ্রামীণ পিতা জগদীশ বাবুর টেনে হেচড়ে নেয়া বিপন্ন ক্লান্ত জীবনের একটিই ছবি আঁকেন, বিএ পাশ পুত্র একদিন চাকরি পেলে পাল্টে যাবে, এই দুঃসহ যাতনা। মেসে থাকে মফিজ। মফিজদের ব্যবসা ছিনতাই। ম্যাড়মেরে জীবনটাকে পাল্টাতে ছিনতাই চাকরিতে আমন্ত্রন জানায়। মানবিক স্বপ্নে বিভোর রাহুল এড়িয়ে চলে। কিন্তু কতক্ষণ? চাকরিদাতাদের দরবারে ঘুরে ঘুরে রাহুল দিশেহারা। প্রেমিকা চৈতি বিয়ের শাড়ি পরে এসেছে। বলে, আমাকে নিয়ে পালাও। কোথায় পালাবে রাহুল? রুঢ় বাস্তবতার কষাঘাতের কলকব্জায় উপন্যাসিক মিলন বনিক কোথায় নিয়ে যান রাহুলকে? রাহুল অবশেষে যোগ দেয় মফিজদের দলে, ছিনতাই চাকরিতে। জীবন পালেট যায় রাহুলের। কিন্তু বিষাক্ত এই জীবনের ধারা রাহুলের নয়। ওর স্বপ্ন আছে। ওর ভেতরে সুন্দর আছে। পুলিশ ওকে খুঁজছে। কোথায় যাবে রাহুল? শেষ গন্তব্য, জগদীশের ঘর। পিতার ঘর। সেখানেও স্বস্থি নেই। অসুস্থ হয়ে রাহুল ভর্তি হয় হাসপাতালে। চিকিৎসার জন্য যাতে সংসারের শেষ সম্বল গরুটা বিক্রি করতে না হয়, তার চেষ্টা করে রাহুল। পাঠক যখন রাহুলের অন্তিম সময়ের জন্য প্রস্তুত হয়, তখন, ঠিক ঠিক তখন আসে চাকরির চিঠি। আগেই লিখেছি, মানুষের জীবন, বিজয়ের জীবন। কথাকার মিলন নিজের মতো লেখা গদ্যশৈলীতে বুনেছেন রাহুলের মধ্যে হাজারো রাহুলের মানচিত্র। আর রাহুলকে ঘিরে চৈতি, অনন্ত, মফিজ, জগদীশতো আমাদের ছাপান্না হাজার বর্গমাইলের প্রতিদিনের হাসি কান্না আর হীরে চুনি পান্নার সমাবেশ। মিলন বনিকের উপন্যাস জীবনের মোহে মুগ্ধ ‘নোনাজলে নীলপদ্ম’ ও পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে গভীর সংবেদে। আশা করি পাঠকেরা উপন্যাসটি সাদরে গ্রহণ করবেন।” উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ‘সেলিনা হোসেন’ কে এবং বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন বাংলা একাডেমিতে কর্মরত খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী তারিখ ফেরদৌস খান, বইটি প্রকাশ করেছে আবীর প্রকাশন, সাত্তার ম্যানসন, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। বইটির দাম রাখা হয়েছে ২০০ টাকা। উপন্যাসটি অত্যন্ত সহজ-সাবলীল ভাষায় লেখা। আশা করছি ‘নোনাজলে নীলপদ্ম’ উপন্যাসটি সব শ্রেণির পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে।

x