নৈতিক শিক্ষাই মানব সন্তানের নৈতিকতা বিনির্মাণে সহায়ক

রুপক কুমার রক্ষিত

শনিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪১ পূর্বাহ্ণ
35

নৈরাজ্যের দাবানলে চারিদিকে হাহাকার। অশান্তি, অবক্ষয়, অসম্মান, লোভ, অনৈতিক চর্চা আর নিষ্ঠুরতা মানুষকে ক্রমে অসহিষ্ণু করে তুলেছে। সমাজ নির্মাণকারী না হয়ে মানুষের সমাজ বিধ্বংসকারী দানবীয় রূপ সর্বত্র বিরাজমান। রাতারাতি গগণচুম্বী বিত্ত অর্জনের নেশায় চলছে ঠকবাজি আর প্রতারণার অসম অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অনৈতিক প্রয়াসে সমাজের মেরুদণ্ড ভঙ্গুর প্রায়। অবক্ষয়ের রুগ্নতা রোধে নৈতিকতার প্রশ্নে জনতার তীর্যক তর্জনী। মানুষ আর নৈতিকতার যোজন যোজন দূরত্বের ইতিকথা নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা। সবার মাঝে অযোধ্যায় সীতা বিসর্জনের ন্যায় সমাজে নৈতিকতা বিসর্জনের আতঙ্ক। জাতির এ সংকটে অনৈতিক বিষয়ে নৈতিক তৎপরতা বড়ই জরুরি। বস্তুত: নৈতিক শিক্ষার আবর্তনে আবর্তিত মানব জীবন- সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মূল্যবোধ, উদারতা, পরোপকারিতা, সেবা, অহিংসা, সম্প্রীতি, মমতা, শ্রদ্ধাবোধ আরো কতো কী। এ নৈতিক শিক্ষা মানব সন্তানের নৈতিকতা বিনির্মাণে সহায়ক বটে। শিশু শ্রেণী হতে শুরু করে ক্রমাগত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরে ছড়ায়, গল্পে, প্রবন্ধে, কবিতায় বিভিন্নভাবে গৃহে ও শ্রেণীকক্ষে তা উপস্থাপন করা হয় বিভিন্নভাবে। উদ্দেশ্য একটাই- শিশুরা নৈতিক শিক্ষা আত্মস্থ করে মনুষ্যত্বে পরিপূর্ণ হয়ে আলোকিত মানুষ হবে। শিক্ষার্থীরা সেই নৈতিক পাঠ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মুখস্থ করে পরীক্ষা পাসের মাধ্যমে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে কেউ ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, শিক্ষক, জার্নালিস্ট, ইত্যাদি নেতৃত্বস্থানীয় উচ্চপদস্থ পেশাজীবীর পদ অলংকৃত করে সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত হয়ে থাকে। পারিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভীর মমতা ও তদারকিতে সফলতায় পরিপূর্ণ হয়ে বিভিন্ন দপ্তরে দেশের দায়িত্ব পালনে হাল ধরে দেশকে সফলতার আলোকে উদ্ভাসিত করবে এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু দায়িত্বে হাল ধরেও নৈতিক সংকটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বেহাল পরিস্থিতির চিত্র সমাজে দৃশ্যমান তা জাতির স্বপ্নকে হতাশ ও দিশেহারা করে বটে। সর্বত্র নীতিবিবর্জিত বিভীষিকার বীভৎস নষ্ট চিত্র। বহু ব্যয়ে দক্ষ প্রকৌশলীর নির্মিত বহুতল ভবন বা ব্রিজ এর করুণ পরিণতি; রোগীদের প্রতি ডাক্তারের সীমাহীন উদাসীনতা- ডাক্তার আর রোগীর সেবার মাঝে এজেন্ট-কমিশন-খদ্দের রূপী মনোভাব; ব্যাংকের টাকা লুটপাটে অসাধু ব্যাংকারের সম্পৃক্ততা, আইন ভঙ্গকারীদের অর্থলোভী আইনজীবীদের প্রশ্রয়; শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যে গুণগত মানের সংকট; ওষুধ শিল্পে জীবন রক্ষাকারী ওষুধে নানান ভেজাল; জাতির কারিগর শিক্ষকদের ছাত্র নির্যাতন নীতি; নোংরা শিক্ষকের নগ্ন পাশবিকতায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এমন কী প্রাইমারী শিশু ছাত্রীও যৌন হয়রানির শিকার, নেতাদের নীতি বিবর্জিত কর্মকাণ্ড আর স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য মূলক মানসিকতা সত্যিই জাতির বিবেককে কঠোরভাবে নাড়া দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ শিক্ষক যখন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তখন অন্যদের দুর্নীতির তথ্য বলাই বাহুল্য। দুঃখজনক হলেও এ যেন বর্তমান কালের হালচাল। অনিয়ম আর দুর্নীতির অসম আবর্তনে জাতি এখন উত্তাল সুনামীর কবলে।
দেশের বড় বড় দায়িত্বে অধিষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বড় বড় লোকগুলো অনেক বড় বিদ্বান বটে। উচ্চ শিক্ষার সফলতায় তারা কানায় কানায় পূর্ণ। ছেলেবেলার নৈতিক শিক্ষায় অনেকে ভাল স্কোর করলেও জীবনকে নৈতিকতায় সাজাতে অনেকের উদাসীনতা সুস্পষ্ট। মনুষ্যত্ব বিকাশে তথা সত্যিকারের মানুষ বিনির্মাণে নৈতিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত স্কোর তাদের অর্জিত হয়নি। মূলত সত্যিকার শিক্ষা ও প্রকৃত শিক্ষার ধারণা পরিস্কার হওয়া দরকার। সত্যিকার শিক্ষা জীবনকে আলোকিত করে, মঙ্গল আর অমঙ্গলের মধ্যে পার্থক্য শেখায়, উচিত এবং অনুচিত সম্পর্কে

ধারণা দেয়। প্রকৃত শিক্ষা অন্যের ক্ষতিতে মনকে বাধা দেয় এবং উপকারে প্রলুব্ধ করে; আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে উদারতা শেখায়, শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমা করা আর হিংসার বদলে অহিংসার শিক্ষা দেয়। অন্যকে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা করতে শেখায় ও অন্যের কল্যাণে দূরত্বের দেয়াল সৃষ্টি না করে মমতার বন্ধন সৃষ্টি করে। এই শুদ্ধাচার আচরণে শিশুরা ধীরে ধীরে আলোকিত মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা ছোটবেলা থেকেই শিষ্টাচার ও শুদ্ধাচার শিক্ষার গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আর শিশুবেলায় যেহেতু সকলে পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই শিশুকে প্রকৃত আলোকে বিকশিত করার ভীত রচনার দায়িত্ব অনেকাংশে পরিবারের উপরই বর্তায়। ‘অ ভধসরষু রং ঃযব নবংঃ ঁহরাবৎংরঃু ভড়ৎ নঁরষফরহম ঁঢ় ধ পযরষফদং সড়ৎধষ পধৎৎরবৎ.’ বস্ততপক্ষে, আলোকিত পরিবার থেকেই একজন শিশু ধীরে ধীরে তার মানবিক সত্তাকে বিকশিত করার প্রশিক্ষণ পায় যেখানে পরিবারের সদস্যরা মূলত: মা-বাবা তার ট্রেইনার এবং তাদের অ্যাকটিভিটিস অর্থাৎ আচরণই শিশুর জন্য প্র্যাকটিক্যাল। মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যা শুনে তা পুরোপুরি করতে চায় না বরং যা দেখে তা শতভাগ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। দেখা যায়, শিশুরা মা-বাবার মত সাজতে ভালবাসে বা তাদের মত আচরণ বা অভিনয়ে ভালবাসে। এ আচরণই একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়। আর ইতিবাচক অভ্যাস মানুষকে প্রতিশ্রুতিপরায়ন হতে শিক্ষা দেয়, এর থেকে সংকল্প ও মর্যাদা বোধ জন্মে যা সফলতায় দ্বার। অর্থাৎ ‘ঢ়ৎধপঃরপব সধশবং ড়হব ঢ়বৎভবপঃ’ পক্ষান্তরে নেতিবাচক অভ্যাসের চর্চা একটি শিশুকে ধীরে ধীরে অন্ধকার বলয়ে পরিচালিত করে। পথভ্রষ্ট হয়ে জীবনের মূলধারা হতে বিচ্যুত হয়ে সমাজে অশান্তি, অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
মূলত: শিশুরা মা-বাবার আচরণকেই অনুসরণ করে। একজন শিশুর নৈতিক বা অনৈতিক বিচারের সুযোগ থাকে না। নিয়মিত আচরণকে সঙ্গত মনে করে তা নিজের মধ্যে লালন করে। প্রত্যহিক জীবনে যা প্রত্যক্ষ করে তাই তাদের মাঝে নেতিবাচকতা বা ইতিবাচকতা জন্মায়। মানুষের প্রতি সদাচরনে তারা যেমন সদগুনাবলী রপ্ত করে। আবার অসদাচরনে মন অসদ্‌মনোপ্রবৃত্তিতে আসক্ত হয়- অতি যত্নে বিদ্বান হলেও বড় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পুকুর চুরিতে জড়িয়ে পড়ে; এমনকি মাতা-পিতা তাদের সংস্পর্শে শেখা অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণের নিদারুণ শিকার হয়। প্রকৃতপক্ষে মা-বাবার ভাল বা খারাপ আচরণ সন্তানের মধ্যে অভ্যাসের মাধ্যমে বিকশিত হয় যা ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত হয়। তাই সন্তানের সুশিক্ষা দেয়ার নেশায় মত্ত হয়ে শুধুমাত্র পরীক্ষা পাসের দিকে নজর থাকলে চলবে না, তার আদর্শগত দিকগুলো বিকশিত হওয়ার দিকে তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখা আবশ্যক। উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে উচ্চ পদে আসীন হওয়ার স্বপ্ন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই পথ যদি মানবিক গুণাবলীতে সিক্ত না হয় তবে অর্জনের সব আয়োজন ব্যর্থ হবে। মানবতা বোধে জাগ্রত ও দায়িত্বশীল হতে না পেরে তারা ইহকাল ও পরকালে কুলাঙ্গার হিসেবে কলংকৃত হবে। কাজেই নিজে সদাচারনে ব্রতী হয়ে সন্তানদের মধ্যে তা আচরণের অভ্যাস করাতে না পারলে সেই সন্তান দেশ ও জাতির যেমন কোন কল্যাণে আসে না তেমনি নিজের কল্যাণও সাধিত হয় না। ফলে সন্তানের প্রতি পিতামাতার সব মমতা অর্জনের বিসর্জন ঘটে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ দিনদিন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। মমতা যেন গল্পের সেই জুজুবুড়ি। চলছে মানুষে মানুষে মনুষ্যত্ব বিবর্জিত প্রতিযোগিতা। দিনরাত নিয়ম ভাঙার অনিয়মের সাথে মিতালী চলছে। লোক সংখ্যা বেড়ে চলেছে কিন্তু সৎ লোকের সংখ্য বাড়ে না, শিক্ষিার হার বাড়ে অথচ সুশিক্ষিত লোকের অভাব, সর্বাঙ্গ সুন্দর লোক অনেক কিন্ত চরিত্র সুন্দর লোক বিরল, আইন বাড়লেও অপরাধ কমে না। এহেন অবস্থায় আমাদের শিশুদের সৎ হয়ে বেড়ে উঠা মোটেও সহজ নয়। শিশুরা আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন- তাদের সুন্দর পরিবেশে সুশিক্ষার আলোকে বেড়ে উঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে মন বিকশিত হওয়ার পথ অন্তরায় হবে। সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও উদারতার শিক্ষা নিঃসন্দেহে জাতির সফলতার দ্বার উন্মোচন করবে। সুস্থ ও সৎ জীবনধারায় জাতির আলোকিত পথ রচিত হোক -এটাই প্রত্যাশা।

x