নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ম্লান

৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ
186

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গঠন করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’। তিনি ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস’। সেই বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগের ইতিহাস ও ঐতিহ্য দাগ লাগার দায় কাদের? যে ছাত্রলীগ নিয়ে জাতির হৃদয়ে আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও গৌরবের প্রকাশ ঘটত সেই ছাত্রলীগ কেন আজ দ্বিধা বিভক্ত? বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলনে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা কিংবা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের আদর্শিক সেই রূপ আজো মানুষের মনে জেগে আছে জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার হয়ে। আজ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর প্রাক্কালে সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বৃত্তায়ন এবং নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিস্বার্থে ছাত্রলীগকে ব্যবহারের প্রবণতা ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ম্লান করে দিচ্ছে। ছাত্রলীগকে ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ছাত্রলীগ পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ এটাই। কোনো ছাত্রসংগঠন এখন ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ নয়। ছাত্রলীগই নিজেদের প্রতিপক্ষ। চাঁদাবাজিটেন্ডারবাজির মতো হীন কাজে জড়িত অনেক নেতাকর্মী। তাদের বাধা দেওয়া দূরে থাক, সমালোচনা করলেও কী পরিণতি হতে পারে, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস তার সাম্প্রতিক উদাহরণ।

আশির দশকের ছাত্রলীগের একাধিক নিবেদিত প্রাণ কর্মী আজাদীর কাছে ছাত্রলীগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কখনো আবেগী হয়েছেন, কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার চেয়েও বড়ো কথা নিজের নাম পরিচয় প্রকাশ করে অনুভূতি জানাতেও ভয় কাজ করছিল তাদের মধ্যে। তাদের মতে শিক্ষা, শান্তি, প্রগতিকে মূলনীতি হিসেবে ধারণ করে জন্ম হয়েছিল যে ছাত্রলীগের, সেখান থেকে ছাত্রলীগ নিজেদের মধ্যে হামলাপাল্টা হামলা, মারামারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, কমিটিবাণিজ্যের মতো নানা বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, ছাত্রলীগের রক্তে হাত রাঙাচ্ছে ছাত্রলীগই। এটা চট্টগ্রামেই শুধু নয়, সারা দেশেই ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। তারা নেতার স্বার্থ দেখতে গিয়ে দলের স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে আস্ফালনের সুযোগ করে দিচ্ছে। ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা বলেন, আগে কমিটিতে আসতো যোগ্যরাই। আর এখন ‘পকেট কমিটি’র ফলে বাড়ছে অস্থিরতা। ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ স্বতন্ত্র্য অবস্থানে নেই। কোন না কোন শীর্ষ নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত তারা। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত ওপেন সিক্রেট। পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার, ভাগ বাটোয়ারা এবং প্রতিপ গ্রুপের কাছে ‘হিরোইজম’ প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে নেতার কাছে জাহির করার প্রবণতা ছাত্রলীগের মধ্যে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্রুপ উপগ্রুপের জন্ম দিয়ে চলেছে। ছাত্রলীগের কলহে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে একাধিক লাশ পড়েছে। সুদীপ্ত, দিয়াজ, সোহেলের মতো মেধাবী ছাত্রনেতারা খুন হয়েছে তাদের সহযোদ্ধাদের হাতেই। দলীয় কোন্দলে পাড়ায়মহল্লায়ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। রেলের টেন্ডারবাজি নিয়ে সিআরবিতে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে। ব্যক্তিগত ঘটনার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে খুন করে প্রামে ঢুকিয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা চলেছে। এক নেতার গ্রুপ থেকে অন্য নেতার মেল্টারে চলে গেলেই সহযোদ্ধা ঘাতক হয়ে রক্ত ঝড়াচ্ছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, মূল খুনিরা অধরা থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকটাই হতাশ ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতাদের অনেকেই। তাদের মতে আদর্শের চেয়ে অর্থের মান যখন বেড়ে যায় তখন এধরনের করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। অন্যদিকে নগর ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ এ ধরনের কোন্দলে জড়িতদের মধ্যে প্রতিপক্ষকে অভিহিত করে ‘ ছাত্রলীগ নামধারী’ বলে।

স্বাধীনতার সময় থেকে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্ধ ভক্ত চট্টগ্রামের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ মনে করে, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিভেদ ছাত্রলীগের কার্যক্রমকে অসংখ্য গ্রুপ উপগ্রুপে বিভক্ত করে ফেলেছে। বহুদিন ধরেই শিক্ষাঙ্গণে বিরোধী ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা নেই। ছাত্রদল ও শিবির পলাতক। বামপন্থী সংগঠনগুলোও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। এ অবস্থায় ছাত্রলীগ নিজেরাই মারামারি করে। সাম্প্রতিক চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপউপগ্রুপে বিভক্ত ছাত্রলীগ কর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ছাত্রলীগের বিরোধে জিম্মি হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পাড়ামহল্লার সাধারণ মানুষ। হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বিরোধ অবসানের তাগিদ দেয়া হলেও এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং দিনে দিনে বিরোধ আরও তীব্রতর হচ্ছে। এখন মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির উদ্দীন অনুসারী হিসেবে দু’টি ধারায় বিভক্ত ছাত্রলীগের পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার ও টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চট্টগ্রামের মন্ত্রী ও সংসদ সসদ্যদের অনুসারী বেশ কয়েকটি গ্রুপ নগরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

এছাড়া বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং থানা ও ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নানা পর্যায়ের নেতাদের অনুসারীর গ্রুপও রয়েছে। ফলে বহু বিভক্ত ছাত্রলীগের গ্রুপগুলো প্রায়ই নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষসঙ্ঘাতে জড়াচ্ছে। ছাত্রলীগের সহিসংতার পর কেন্দ্র থেকে কিছু নেতাকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। তবে বহিষ্কৃত নেতারা ঘুরেফিরেই থেকে যাচ্ছে ছাত্রলীগে। সংঘাতের জেরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল করা হয়। তবে সেখানে সহিংসতার ঘটনা চলছেই। বাতিল কমিটির নেতারাই ক্যাম্পাসে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কলেজেও ছাত্রলীগের কোন কমিটি নেই বলে কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে। তবে কে শোনে কার কথা, সবকিছু চলছে ছাত্রলীগের নামে। তাদের কর্মকাণ্ডে এখানকার নেতারাও এখন ত্যাক্তবিরক্ত। ছাত্রলীগের বিরোধ মেটাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও একাধিকবার চট্টগ্রামে আসতে হয়। এরপরও বিরোধের অবসান হয়নি। এমন বেপরোয়া আচরণের জন্য সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক নেতারা আজাদীর কাছে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করা, সংগঠনের প্রতি নেতাকর্মীদের আদর্শিক আনুগত্য না থাকা, অনুপ্রবেশ, দীর্ঘদিন ধরে দল ক্ষমতায় থাকায় কেউ কিছু করতে পারবে না এমন মনোভাবের সৃষ্টি হওয়া এবং অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া।

চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা খোরশেদ আলম সুজন আজাদীকে বলেন, দলের প্রতি ন্যূনতম আনুগত্য থাকলে কারও পক্ষে ভাইয়ের রক্তে নিজের হাত রাঙানো সম্ভব নয়। এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে জড়িত নেতাুকর্মীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁর মতে, আধিপত্য বিস্তার করার জন্য বাছবিচার ছাড়াই বিভিন্নজনকে ছাত্রলীগের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে বিভিন্ন পক্ষ। ফলাফলতো সকলের চোখেই ধরা পড়ছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হাবিবুর রহমান তারেক নিঃসংকোচে স্বীকার করলেন, রাজনীতি এখন ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের হাতের মুঠোয়। ছাত্রলীগের মূল আদর্শ মানতে যাদের অনীহা, তারাই এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়ে ছাত্রলীগকেই বিতর্কের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আদর্শ মানলেতো আমার নেতা হবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তারপর যদি কেউ থাকেন তবে তিনি জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা নেতৃত্বে একটাই গ্রুপ থাকার কথা। কিন্তু এখন যত নেতা, তত গ্রুপ। এটা কেন হবে? এটা হচ্ছে কারণ ছাত্রলীগে যারা আসছে, তারা লাভের জন্য আসছে। আখের গুছাতে সহকর্মীকে প্রতিপক্ষ ভেবে পথ থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে। এরা আসলেই কি ছাত্রলীগ নাকি অন্য কিছু এ বিষয়টি আমার কাছেই পরিষ্কার নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মেধাবীরা ছাত্রলীগে আসতে চাইবে না। আমি মনে করি এরা সব সুদিনের পাখি। দলের বিপর্যয়ে তারা ভোল পালটে অন্য কোন দলে ভিড়বে।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নূরুল আজিম রনি স্পষ্ট করে জানান, ছাত্রলীগের অতীত ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল, বর্তমান সময়ে ছাত্রলীগ পথভ্রষ্ট। নেপথ্যের কারণগুলোও তিনি বিশদ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সূচনা। ১৯৮১ সালে তবারক হত্যার মধ্য দিয়ে শিবিরের জবাই রাজনীতির শুরু। শিবিরের অস্ত্রের রাজনীতি, পরে ছাত্রদলের সন্ত্রাসের রাজনীতির বিরুদ্ধাচারণ করতে গিয়ে ছাত্রলীগ পথভ্রষ্ট হয়। এর পেছনে আমি অবশ্যই মূল রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করবো। রাজনৈতিক নেতাদের কারণেই বলয় ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির সূচনা হয়। কারণ আদর্শের রাজনীতি চর্চার বিষয়। সেই চর্চাটা না হলে পথভ্রষ্টতো হবেই। প্রত্যেক দলে বলয় তৈরি হয়েছে। কিছু নেতা ছাত্রলীগের একটা গ্রুপকে লেলিয়ে দিয়েছে। আরেকটা গ্রুপ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এমনটাতো হওয়ার কথা ছিল না। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ জাতীয় রাজনীতিতে কখন ব্যবহৃত হবে, জাতির দুঃসময়ে ছাত্রলীগ কাজ করবে। মোট কথা ছাত্রলীগকে ব্যবহারের প্রবণতা নেতাদের কমাতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ছাত্রলীগ আত্ম সংযম করবে, আত্মসমালোচনা করবে, তবেই আত্মশুদ্ধি হবে। ছাত্রলীগ নেতা কর্মীরা, তোমরা আমাদের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেবে। সেই চর্চা কি এখন হচ্ছে? এখন ছাত্রলীগকে বোঝা মনে করা হয়। ছাত্রলীগতো বোঝা হওয়ার কথা নয়, সম্পদ হওয়ার কথা। মহানগর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বর্তমানে শিক্ষা বাণিজ্য, শিক্ষা অনিয়ম ও শিক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে কর্মসূচি চলমান আছে জানিয়ে এ ছাত্রনেতা বলেন, মেধাবীদের উপস্থিতি ছাত্রলীগে বাড়াতে হলে ছাত্রদের জন্য, ছাত্রদের বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন করতে হবে। এ দ্বিধাবিভক্তির দায়ভার আমাদের নয়, আমাদের পরিচালনা করছেন যারা তাদেরই ভেবে দেখতে হবে আমাদের কোথায় কখন কীভাবে ব্যবহার করবেন।

x