নুসরাতের কাছে চিঠি

মাধব দীপ

শনিবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
401

প্রিয় নুসরাত জাহান রাফি,

লিখতে বসলাম তোকে নিয়ে। কিন্তু কী লিখবো? বারবার কিবোর্ডের সামনে থেকে উঠে গেলাম। এই পরিস্থিতিতে কী লিখা যায়? কোন্‌ শব্দে আমি ধরবো তোর কষ্ট। কোন্‌ বাক্যে আমি বোঝাবো তুই বাঁচতে চেয়েছিলি এই সুন্দর পৃথিবীতে? আর কতো লিখবো? কতো লিখলে এই রাষ্ট্রযন্ত্র, এই সমাজ, এই ভয়ঙ্কর পুরুষতন্ত্র বুঝবে এই জ্বালা?
কিছুতেই ভুলতে পারছি না তোর মুখটা। চোখে জল ভরে এলো। চোখ বুঁজে এলো। ভেসে ওঠলো তোর মায়াময় মুখটা। তোর থুতনির নিচটা লাল রক্তজবা হয়ে ওঠেছিলো শুকিয়ে যাওয়া রক্তে। সেই দাগ জ্বলজ্বলে হয়ে আছে এই বুকে। আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে পারবো না- হৃদয়ের ঠিক কোন্‌ জায়গাটায় তুই নাড়া দিয়ে গেলি। তবু ‘কুম্ভকর্ণের ঘুমে পতিত’ এই সমাজ কি জাগবে? চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই চিৎকার শুনবে কে? কেউ কি আছে শোনার? আর কতো সন্তান এভাবে চলে গেলে আমরা জেগে ওঠবো? বুকে ব্যথা নিয়ে থমকে ছিলাম অনেকক্ষণ। কতোটা তীব্র যন্ত্রণা আর ক্ষোভ নিয়ে তুই চলে গেলি- সে ব্যথার কথা আমি কারে কই? কারে বোঝাই? এ যে বলে বোঝানো যাবে না। লিখে বলা যাবে না।
তাই রাগ হচ্ছে আমার। ঘৃণা হচ্ছে। ক্ষোভ হচ্ছে। মনে হচ্ছে- সেই পাষন্ডকে ‘চিবিয়ে’ খাই। তার সঙ্গী-সাথীদের আসফালনকে পদদলিত করে তোর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাই।
প্রিয় মা আমার,

জানি না এর বিচার হবে কিনা? কিন্তু তোকে হারালাম- এরচেয়ে বড় সত্য এখন আর আমাদের পৃথিবীতে নেই। আমাদেরকে কি তুই কখনো- কোনোদিন- ক্ষমা করবি? আমরা কি ক্ষমা পাবো? আমরা যে ভীরু-কাপুরুষের ‘উপমা’ হয়ে উঠছি দিনকে-দিন। আমাদের চেতনায় প্রতিবাদের অগ্নি স্ফূলিঙ্গ এখন আর ফুঁসে ওঠে না। বায়ান্ন কিংবা একাত্তরে আমরা যা দেখিয়েছি- এখন আর তা দেখাতে পারছি না। ঘুণেধরা সমাজের ক্ষত আমরা আজ বেমালুম চেপে যাচ্ছি।
প্রিয় কন্যা,

বিষণ্ন মন নিয়ে আমি তোর কণ্ঠের রেকর্ডেড জবানবন্দীটি শুনেছি। ফোনালাপও শুনেছি। তুই যে সাহসী ছিলি- এই গর্বে আমার বুকের ছাতি তখন বারবার ফুলে ওঠছিলো। মনে হচ্ছিল- এ যেনো আমাদের সেই রোকেয়া, আমাদের সেই প্রীতিলতা, আমাদের সেই লীলা নাগ, আমাদের সেই সুফিয়া কামাল, আামাদের সেই ফেরদৌস প্রিয়ভাষিণী। এঁরা তো তোর মতোই ‘মৃত্যু-সম’ প্রতিকূলতা’ জেনেও প্রতিবাদে-প্রতিবাদে এই নষ্ট সমাজকে ভেঙে-চুড়ে সাজাতে চেয়েছিলো। বড় অকালেই আমরা তোকে চলে যেতে বাধ্য করলাম, মা আমার। আমরা যদি মানুষ হয়ে থাকি- তবে এই যন্ত্রণা আমরা কখনো ভুলতে পারবো না, মা।
প্রিয় জাহান,

তোর নামের মতোই ছিলো তোর বাবা-মা’র পৃথিবী। কিন্তু যে তোর বাবা-মা’র বেঁচে থাকার পৃথিবীকে এভাবে চলে যেতে বাধ্য করলো- আমরা তার কী করবো? কী করতে পারবো? দেখেছিস- এরই মাঝে কুলাঙ্গারের সমর্থকেরা মিছিল বের করেছে। অভিযুক্ত সেই পাষন্ডকে নাকি মুক্তি দিতে হবে। এও দেখতে হলো এই চোখে! ছিঃ! এই লজ্জা, এই গ্লানি মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয়কে কতোটা কলুষিত করেছে- সেটা হয়তো আমরা ভেবেও দেখবো না।
প্রিয় রাফি,

এই তো কিছুদিন আগেও ‘ভুল চিকিৎসায়’ অকালে চলে গেলো রাফি নামের আরেকটি ফুটফুটে মেয়ে। আমরা এখন তা দিব্যি ভুলে গেছি। আচ্ছা, মনে আছে তোর- দিনাজপুরের পার্বতীপুরের সেই ছয়বছর বয়সী পূজার কথা, মোল্লারহাটের সেই গৃহবধূর কথা, কুমিল্লার তনুর কথা, সিলেটের খাদিজার কথা। নিকটঅতীতের সেইসব লোমহর্ষক ঘটনার মতোই কি তোকে হারানোর এই সময়েও পুলিশ বলবে- ‘আমরা বাকী অপরাধীদের ধরার জন্য বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছি’, ‘আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে’, ‘আসামিকে পাওয়া যচ্ছে না’, আসামি পলাতক’ -ঘরানার গৎবাঁধা কিছু বুলি? আর এভাবেই একদিন আমরা সবাই ‘চুপ’ হয়ে যাবো? । যেভাবে নাগরিক চাপে একদিন চুপ হয়ে গেছি আমরা আগের ঘটনাগুলো থেকেও? হুম, হয়তো দেখবি- কিছুদিন পর সব আবার ধামাচাপা পড়ে গেছে! কে জানে? বগুড়ার সেই তুফান সরকারের মতো এই জামায়াতি অভিযুক্ত সিরাজের হাতও অনেক লম্বা?

চাই, অতিদ্রুত এই ঘটনার বিচার হোক। দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্যে শাস্তি হোক অপরাধীদের। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা তো অহরহ ঘটে চলেছে সারাদেশে। কন্যাশিশু থেকে বয়েসী নারী, দেড়মাস থেকে পাঁচ বছর কিংবা পঞ্চাশ বছর- কেউ বাদ পড়ছে না পুরুষতান্ত্রিক এই বর্বর আক্রমণ থেকে। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষক ধরাও পড়ছে। কিন্তু নারীর চলাচলের পথ-ঘাট, খেলাধুলার স্থান, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- কোনো জায়গা-ই আজ আর নিরাপদ থাকছে না। যে বয়সের শিশুকে দেখা মাত্রই মনের ভিতর স্বত:স্ফূর্তভাবে পিতৃত্ববোধ জেগে ওঠার কথা, যে বয়সের শিশু কাছে এলে তার গাল টেনে তাকে আদর করার কথা সেই বয়সী শিশুও রেহাই পাচ্ছে না পুরুষ নামক কিছু নরপশুর হাত থেকে! ভাবি- এ কেমন সমাজ এটা? যদি এর বিচার না হয় তবে খাদিজা, পূজা, তনু আর এই নুসরাতরা কী কখনো আমাদের ক্ষমা করবে? ক্ষমা করতে পারবে?
জানি না- কী হয় এর বিচার? তবে এটুকু জানি। তোকে বাঁচানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। তোকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্যও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু, শেষ রক্ষা হলো না। ঘাতকদের আগুন যে কতোটা বেপরোয়া- সেটি হয়তো তুই-ই টের পেয়েছিলি কেবল! তাই তুই এভাবে চলে গেলি! আমি মনে করি- তোর এই বেদন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বুঝেন। তিনিও হারিয়েছেন তাঁর সর্বস্ব। নৃশংসভাবে তাঁর পরিবারের সবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো ঘাতকের বুলেট। তাই আমি বিশ্বাস করি- তিনি এর বিচার করবেন। আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই- তাঁর ওপর। তিনি কেবল তিনিই দিতে পারেন তোর আত্মাকে শান্তি। তিনিই পারবেন। তিনি ইতোমধ্যে পেরেছেনও। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। জাতির জনককে হত্যার বিচার করেছেন। একাত্তরে মা-বোনদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের বদলা নিয়েছেন। আমরা এই অপেক্ষায় রইলাম।
যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস মা আমার।
ইতি
তোর দহন যন্ত্রণা সইতে না পারা এক বাবা

x