নীরবে ক্যারিয়ারের ১১ বছর পার করলেন মাহমুদুল্লাহ

স্পোর্টস ডেস্ক

বৃহস্পতিবার , ২৬ জুলাই, ২০১৮ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
97

একটি যুদ্ধ ক্ষেত্রে নায়ক তো অনেকেই থাকেন। যারা তাদের শৌর্যবীর্য দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন। কিন্তু এসব নায়কের পেছনেও থাকেন অনেক নায়ক। যারা তাদের জ্ঞান, কৌশল ও শক্তি দিয়ে পেছন থেকে নীরবেই সাহায্য করে যান সামনের নায়কদের। এসব নায়করা বেশিরভাগ সময়ই মূল মঞ্চে থাকেন না। কিন্তু তাদের অবদান ছাড়া মূলত সম্ভব হয় না বড় বড় জয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের তেমনই এক নীরব যোদ্ধার নাম মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। বাংলাদেশের অনেক বড় বড় জয়েই অবদান রয়েছে মাহমুদউল্লাহর। কিন্তু প্রায় সবগুলো ম্যাচেই কোনো এক অজানা কারণে স্পটলাইট খুঁজে পায়নি তাকে বা তিনিই হয়তো থাকতে চান না স্পটলাইটে। নীরবেই কাজ করে যান সবার লক্ষ্যে।

বয়সটা তখন ২১। ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে প্রথম ব্যাট হাতে বাংলাদেশ দলে দেখা মেলে এক তরুণের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচেই সবাইকে জানিয়ে দেন, ‘আমি থাকতে এসেছি।’ সে ম্যাচে বল হাতে ২৮ রানে নেন ২ উইকেট। ব্যাট হাতে ৩৬ রান। ওই ম্যাচের পরই একই বছর কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত চারজাতি সিরিজ এবং আইসিসি টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও নাম ওঠে মাহমুদউল্লাহর। ২০০৯ সালে ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন ফরম্যাট টেস্টে অভিষেক হয় মাহমুদউল্লাহর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টেই নির্বাচকরা তাকে নামিয়ে দেন মাঠে। তাদের আস্থার প্রতিদান দিতেও সময় নেননি রিয়াদ। বল হাতে যেনো ক্যারিবীয় দূর্গ ভাঙতে প্রস্তুতই ছিলেন মাহমুদউল্লাহ। একের পর এক আঘাত হেনে তুলে নেন সে সময়কার পাঁচ তারকা ট্রাভিস ডাউলিন, ফ্লয়েড ল্যামন্ট রেইফার, চাদউইক ওয়ালটন, অস্টিন এবং ক্রেমার রোচের উইকেট। তৃতীয় বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্ট অভিষেকেই পাঁচ উইকেট নিয়ে নাম লিখিয়ে ফেলেন রেকর্ডের খাতায়।

তবে জীবনে সফল হতে হলে বন্ধুর পথ আসেই। এর ব্যতিক্রম নন মাহমুদউল্লাহও। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে খারাপ সময়ও দেখেছেন অনেক। আনন্দের পাশাপাশি হেঁটেছেন হতাশার পথেও। দলের হয়ে যেমন ম্যাচ জিতিয়েছেন আবার বাজে পারফরম্যান্স তাকে দল থেকে ছিটকেও দিয়েছে। কিন্তু ধৈর্য হারাননি এই ডানহাতি মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান। ২০১৫ বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্বও অর্জন করেন মাহমুদউল্লা। পরের ম্যাচে সেডন পার্কে আবারও দেখা যায় রিয়াদ ঝলক। গ্রুপ পর্বে দলের সর্বশেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১২৮ রানের ইনিংস খেলেন মাহমুদউল্লাহ। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে জুটি বেঁধে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর সেই মহাকাব্যিক ইনিংস বিশ্ব ক্রিকেটে এক জ্বলজ্বলে উদাহরণ। টিটোয়েন্টি ক্রিকেটে মাহমুদউল্লাহর পারফরম্যান্স আরও ধারালো। এখন পর্যন্ত ৭০ ম্যাচে ১১০৫ রান, সঙ্গে ২৬ উইকেট। আইসিসির র‌্যাংকিংয়ে অলরাউন্ডার হিসেবে পাঁচ নম্বর স্থানও পেয়েছেন মাহমুদউল্লাহ।

মাহমুদউল্লাহর টেস্টের শুরুর দিকে পারফরম্যান্স ছিল দৃষ্টিনন্দন। ভারতের সাবেক ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কর তাকে বিশ্বের সেরা আট নম্বর ব্যাটসম্যান হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে ক্যারিয়ারে মাঝপথে এসে হঠাৎই খেই হারিয়ে ফেলেন। এক পর্যায়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলা বাংলাদেশের শততম টেস্টে দল থেকে বাদ পড়েন। ২০০৭ থেকে ২০১৮ এই ১১ বছরে নিজের উন্নতির গ্রাফটা শুধু উপরের দিকেই নিয়ে গেছেন মাহমুদউল্লাহ। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মূল ভরসার নাম। কিন্তু সেটিও পর্দার আড়ালেই। মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান কিংবা তামিম ইকবালের মতো তুমুল দর্শকপ্রিয় ক্রিকেটারদের তালিকায় থাকেন না মাহমুদউল্লাহ। এমনকি তরুণ সৌম্য সরকার, তাসকিন আহমেদ, সাব্বির রহমানের মতোও তিনি এতটা জনপ্রিয় নন। নিদাহাস ট্রফিতে অধিনায়ক হিসবেই দেখিয়েছেন সফলতা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভরসার নাম আসলে এক বাক্যে উচ্চারিত হয় মাহমুদউল্লাহর নাম। স্টারডাম নয়, নীরবেই নিজেকে চিনিয়ে যান।

x