নিশি সাধারণ-অসাধারণ

সুসেন কান্তি দাশ

শুক্রবার , ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৩০ পূর্বাহ্ণ
40

কবি বিদ্যুৎ কুমার দাশ বর্তমান সময়ের একজন আলোচিত কবি। তিনি দেশপ্রেম নিয়ে কবিতা লিখেন, স্বাধীনতা নিয়ে লিখেন। তবে রোমান্টিক কবির লেখায় তিনি সিদ্ধহস্ত। সম্প্রতি তিনি “নিশি সাধারণ-অসাধারণ” কাব্যগ্রন্থ নিয়ে হাজির হয়েছেন পাঠক মহলে। তিনি কান্নাহাসির পান্নারাশি ছড়িয়ে দিয়ে এই গ্রন্থে।
আমাদের জীবনের দুটি অধ্যায়ের মতো, দিবা-নিশি বিচলিত হয়ে আসছে। দিবার শেষে নিশির কালো অন্ধকারে কতো যে আলো জ্বলমলিয়ে উঠে তা আমরা টের পাই, উপলব্ধি করি বোধশক্তি দিয়ে। এই নিশি কবি মানসের একটি কল্পিত রূপ। কল্পনায় জীবনের রঙিন দিনলিপি স্মরণের পাতায় লেপন করার মাধ্যমে কবি বিদ্যুৎ কুমার দাশ রচনা করেছেন চমৎকার কবিতা গুচ্ছ। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার চরন “নিশি এক অসাধারণ, চাঁদ তারা লিপি, কর্ণফুলী-সাগর-পথঘাটের নিশি/বাস্তুহারা টোকাই এর পাওয়া না পাওয়ার কবির দ্বিতীয় কবিতায় কবি লিখেছেন-অভয়মিত্রের ঘাটে নিশি নেমে পড়ে, চাঁদ-তারা মূলে যাকে মাথার উপরে/এই কবিতায় কবি প্রকৃতি প্রেমের বিরসরূপ অতি বৈচিত্র্যে, অতি সাবলিল ভাষায় প্রকাশ করেছেন। যা স্বপ্ন দেখতে দেখায়, স্বপ্নের ঘর সাজানোর স্বপ্ন দেখায়।
আমার বাঁচার ঘর নেই/মরার ঘর কি আছে? / দুই ঘর খুঁজে বেড়াই/ জীবন সুতোয় ঝুলছে/ সুতো ছিঁড়লে হবে কি বিদায় ? কবিতাগুলো ৬ষ্ঠ কবিতা এটি। এতে মানব জীবনের শাশ্বত রূপ বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। সত্যিইতো আমাদের জীবনখানি ঝুলে আছে নাটাই বাঁধা সুতোর মতো। যা কখনো-কখনো উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়। এই বাঁধন ছিঁড়ে গেলে মানুষেরা হয়ে যায় নিশ্চিহ্ন। এইখনো খালিদ হাসান মিলুর গানের মতো “আমার মতোন এতো সুখী, নয়তো কারো জীবন/বুকে ধরে যতো ফুল ফোঁটালাম, সে’ফুলের কাঁটা ছাড়া কী পেলাম/ভাগ্যের পরিহাস এরই নাম/“গুমরে কান্নার জলে নদী ভরে যায়-/তুমি কি মানবতার আকাশ ছেড়ে হিংস্র জল রোদ ফেটে চোখে ফোটে হাহাকার/কবিতার লাইনগুলিতে কবি নিশি কল্পকথার ফুলঝুড়ি ছড়িয়েছেন অবলিলায়।
এযাবৎকাল আমরা যতোগুলি কাব্যগ্রন্থ পড়েছি তার সবকটিতে রয়েছে ভিন্নরূপতা, ভিন্নরসের সমাহার, অথচ কবি বিদ্যুৎ কুমার দাশ নিশি নামে একটি মানসকন্যাকে নিয়ে লিখে গেছেন একনাগারে একটি কবিতা। যার প্রত্যেকটি কবিতার স্বরলিপি রচিত হয়েছে ওই মানসকন্যাকে নিয়ে। “সেদিনের নিশি রাত পাল্টেছে/সেদিনের নিশি তারায় সেজেছে/সেদিনের নিশি মায়াবী সততায়/সেদিনের নিশি সুন্দরের মেধায়…/কবিতাময় নিশি। এমনি অগণিত উপমা, অজস্র জয়গীতি রচিত হয়েছে কবিতায়। এইখনো একই অঙ্গে এতো রূপ।” কতো স্বপ্ন দেখেছি, কতো ছবি এঁকেছি। কতো গান লিখেছি, শুধু তোমার নিয়ে ….। আধুনিক গানের প্রাণে ঝর্ণা ধারা মেশানো কবিতা রচনা করেন কবি। বইটি উৎসর্গ করা হয় কবি বিদ্যুৎ কুমার দাশ এর দাদুমনি শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ডা. অশ্বিনী সেন এর সকল সন্তানদের। উল্লেখ্য বিদ্যুৎ এর মান লক্ষ্ণী সেনও উৎসর্গের তালিকায় আছে।
শোল মাছের বড়শির মতো লোভিয়ে -লোভিয়ে/তলে-তলে অশিক্ষার যুবকের/শরীরে সাঁতার দেওয়ার লোভে../কবিতায় কবি আমাদের দেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষের লোভে চরিত্রের প্রকাশ ঘটান। ‘নিশি সাধারণ-অসাধারণ-৫১’ নং কবিতায় কবি লিখেছেন-” তারপর লক্ষ ঘণ্টা গড়িয়ে পার হয়/তারার আলো পরে না ফেইসবুকে/অমাবস্যা রঙের বীভৎস কুৎসিত/শরীর খায় নীলমনির তারাগুলোকে …..। আবার লিখেছেন “নিশিতে ভুত পেহনী বেশ্যার খেলায় ব্যবহৃত হয়-/নিশির ঘরে অশিক্ষিত লোভীর মেলা হয়../কবির নিশি রাতের আঁধারে আরো ছড়ানোর নেশায় উন্মুক্ত। আবার কখনো সময়ের সাথে হাত মিলিয়ে কেবল ভেসে গেছে দূর-দূরান্তে। পথে যেতে যেতে যেমনি করে হারালে স্মৃতি খুঁজি দিবি পথের ধুলোয়, কালসিটে রাস্তায়, আকাশের মেঘে মেঘের ঘুড়িতে। নিশির আবেশ জড়ানো কবিতার খাতায় ঠাঁই হয়েছে। নিশি। অতি সাধারণ আবেশ জড়িয়ে আবেগের আপ্লুত আশ্রয়ে অসাধারণ হয়ে উঠেছে কবিতার রূপ-বৈচিত্র্য।

মাঝে মাঝে নির্জন জায়গায় চলে যাব/এতো বড় শহরের কান্না হাসির জায়গা নেই/ তোমাকে হারানো মানে আহত মুক্তিযোদ্ধার মতো ছটফটো একটা জীবন। এমন আরো আনিত কবিতায় সাজিয়েছেন ‘নিশি সাধারণ-অসাধারণ’ গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়। একাত্তরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা একটি পরিবারের সন্তানদের। সে মুক্তিযোদ্ধা কবির দাদা কবি বিদ্যুৎ কুমার দাশ বয়ে চয়ে যান ধীর গতিতে।
দিনের শেষে গোধূলী আলোর রূপালী আবেশে যেমন করে দ্বীপ সাজিয়ে পেলেন মায়াবী আকাশ, তেমনি করে নিশি সাধারণ অসাধারণ রূপের আলোকে এই পৃথিবীর আলোমাখা মায়াবী মনের বিচিত্রতা ফুটিয়ে তুলেছেন কবি তার কবিতায় নিশি সাথে এক জীবনের কাব্যকথায় জীবনের স্বরলিপি। যাতে সুর মিশিয়ে, ছন্দ মিশিয়ে রচনা করা যায় জীবনের গান। যে গানের মানে বোঝার নিজস্ব ভাষা রচনা করেছেন কবি তার নিশি সাধারণ অসাধারণ কবিতায় বইতে। সময়চিত্র প্রকাশ হতে মোমিন উদ্দীন খালেদ এর প্রচ্ছদে অসাধারণ হয়ে উঠেছে।

x