নির্ভার : ভালোবাসার অপর পিঠে কেবল থাকে ভালোবাসা

ফারহানা আনন্দময়ী

শুক্রবার , ৫ জুলাই, ২০১৯ at ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ
228

নাট্যজন শান্তনু বিশ্বাসকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চিনেছি, জেনেছি ‘গানের ফেরিওয়ালা’ হিসেবে। অভিনেতা শান্তনু বিশ্বাসকে চাক্ষুষ করার সুযোগ হয়নি এই সময়ের মধ্যে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন নাটক নিয়ে মঞ্চে হাজির হননি। তবে তার নাটক পাঠ করেছি, নাট্যপ্রেমিদের মুখে মুখে তার দুর্দান্ত অভিনয়ের গল্প শুনেছি। মঞ্চে তার অভিনয় দেখার আগ্রহ অনেকদিন ধরেই জমা ছিল। ইচ্ছে পূরণ হলো। ‘কালপুরুষ’ গত ২৮, ২৯, ৩০ জুন চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্যোৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে দলের প্রযোজনার আরো চারটি নাটকের সাথে এদের সর্বশেষ প্রযোজনা, শান্তনু বিশ্বাসের রচনা, নির্দেশনায়, তার আর শুভ্রা বিশ্বাসের অভিনয়সমৃদ্ধ ‘নির্ভার’ নাটকের সফল মঞ্চায়ন করলো। সেদিন সন্ধ্যায় পুরো মিলনায়তন ভর্তি দর্শকের আমিও একজন ছিলাম। এটা কোনো নাটক পর্যালোচনা নয়, একে বিদগ্ধ দর্শকের পুঙ্খানুপুঙ্খ নাট্য-সমালোচনা ভেবে ভুল করবেন না। এ হলো একজন মুগ্ধ অনুরাগী দর্শকের নাটক উপভোগ শেষে নিজস্ব ভাবনাটুকুই ভাগ করে নেয়া। নাটকবিষয়ে আমার বিদ্যেবুদ্ধির দৌড় জেনে নিয়েই মন খুলেছি, দর্শক-অনুভূতি জানাতে। আপনারা নিশ্চয়ই একে ক্ষমাসুন্দর নয়, স্বাভাবিক-সুন্দর বলেই মেনে নেবেন আশা করি।
‘নির্ভার’ নাটকটি এমন এক দাম্পত্যের গল্প যেখানে দ্বন্দ্ব আছে, দহন আছে, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ঘাটতি আছে; একইসঙ্গে পরস্পরের আকাঙ্ক্ষার অনুভবের, শ্রদ্ধার আর ভালোবাসার সুশীতল এক ছায়াও আছে। যেন, “তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে…”। গল্পটি মূলত এক সন্তানহীন দম্পতির আনন্দ-বেদনার; শাহীন নামের নারী চরিত্রটির মাতৃত্বের হাহাকার এবং শিশির নামের পুরুষ চরিত্রটির এক নিরন্তর চেষ্টা, ভালোবাসার সকল উপকরণ দিয়ে সেই হাহাকারকে ভরাট করা। নাট্যকার শিশিরকে দিয়ে অনায়াসে পড়িয়ে নিয়েছেন শাহীনের ভেতরটাকে। অথচ কাজটি খুব সহজ নয়, আমাদের অর্থাৎ নারীদের অন্তর্গত ভাবনা ছুঁয়ে যাওয়া। নাট্যকারের কলম শাহিনের অন্তরমহলের গোপন-আপন বেদনাটুকুতে পরম যত্নে আলো ফেলেছে। শিশিরের এই সমর্পিত ভালোবাসা দর্শকের ভাবনায় শাহীনের প্রতি সমব্যথী হওয়ার সাথে সাথে শিশিরের জন্যেও সমানমাত্রার সহমর্মিতা পেয়েছে। দর্শকের মানসচোখে দুজনের কেউ কারোর বিরুদ্ধপক্ষ বা প্রতিযোগী হয়ে ওঠেনি নাটকের একটি দৃশ্যেও।
তবে নাটক-দেখা শেষে আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছিল, ভালোবাসায় ভরাট একটি দাম্পত্যে শিশির সন্তানহীনতার অভাবকে, মাতৃত্বকে সবকিছু ছাপিয়ে যতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, শাহীন কি ঠিক ততটাই বিষাদী হয়ে উঠতো মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষায়! সে তার অন্তর্গত বেদনাকে শিশিরের ভালোবাসা দিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে, শিশিরের ‘কেয়ারিং’ দিয়ে ভরিয়ে রাখতেই বেশি সচেষ্ট ছিল। সে তো তার সংসার, দাম্পত্য এবং কর্মজীবন নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চেয়েছে। তার একাকীত্বটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্যই তো শাহীন বারংবার একটি চাকরির খোঁজ করেছে। মাতৃত্বই যদি একজন নারীর নারীজন্মের পূর্ণতা হয়, তাহলে পুরুষের পূর্ণতা কীসে! মানবজন্মের তবে পূর্ণতা কোথায়? আমার এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর অবশ্য নাটকের শেষ দৃশ্যে আমি পেয়ে গিয়েছি।
এ তো গেল নাটকের গল্প। এবার একটি নাটকের যা প্রাণ, অর্থাৎ অভিনয়ের কথা কিছু বলি। ‘নির্ভার’ নাটকের মঞ্চায়ন দেখে ফিরে প্রথমেই আমার ভাবনায় যেটা এসেছে, তা হলো, শিল্পচর্চা আসলে কোনো মৌসুমী চর্চার বিষয় নয়, কোনোভাবেই নয়। নাটকও তো এই শিল্পেরই একটি অন্যতম অঙ্গ, তো, নাটকের বেলায়ও সেই একই কথা। এটা রক্তে প্রবাহিত হতে হয়, নাটককে জীবনের অঙ্গ এবং যাপনের অংশ করে তুলতে হয়। “এই আমি একটু নাটক-টাটক করি আর কী!” নাটকচর্চা বিষয়টি তা নয়। এ এক কঠিন সাধনার বিষয়। ‘নির্ভার’ ঠিক এই কথাটি এই সাধারণ দর্শককে আবারো মনে করিয়ে দিলো। ‘নির্ভার’ মানে নির্ভারের প্রধান দুই কুশীলবের কথা বলছি। শুভ্রা বিশ্বাস এবং শান্তনু বিশ্বাস।
শুভ্রা বিশ্বাসের অভিনয় আমরা দেখে আসছি দীর্ঘদিন ধ’রে, ধারাবাহিকভাবে। ‘মৃণালের চিঠি’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘বিনোদ’ এবং বিশেষভাবে তার অভিনীত যে নাটকটি ভুলবার নয়, সেটি হলো ‘রাক্ষুসী’। মঞ্চে ওঠার পরে একজন অভিনেত্রী বা অভিনেতার অভিনয় যখন আর অভিনয় মনে হয় না দর্শকের চোখে, তখনই তা সত্যিকার অভিনয় হয়ে ওঠে। শুভ্রা বিশ্বাস তার অভিনয় নিয়ে মঞ্চে ওঠার পরে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটে। শান্তনু বিশ্বাস প্রায় দেড়যুগ পরে তার অভিনয় নিয়ে মঞ্চে এলেন এবং দর্শকচিত্ত জয় করে নিলেন আবারো। তাঁকে মঞ্চে দেখার পরে মাত্র একটি শব্দে যে বিশেষণটা তার নামের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মানায়, তা হলো, ‘জাত অভিনেতা’। আমরা, দর্শকেরা যারা উচ্চলয়ের অভিনয় দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি, তাদের কাছে ‘নির্ভার’এর শান্তনু বিশ্বাসের অভিনয় দর্শকের জন্য কানের আরাম আর ভাবনার বিরাম নেয়ার জায়গা হয়ে উঠেছিল যেন। একেবারেই উচ্চকিত অভিনয় নয়, কিন্তু তার রেশম-মসৃণ অভিনয় দর্শক হৃদয়ের খুব গহীনে গিয়ে কড়া নেড়েছে।
আর শেষে যে কথাটি না বললেই নয়, শিশির এবং শাহিন… এই দুটো চরিত্রের জন্য শান্তনু বিশ্বাসের বিপরীতে শুভ্রা বিশ্বাস ছাড়া আর কোনো অভিনেত্রীর কথা দর্শক ভাবনাতেই আনতে পারেনি; এমনই অনুপম তাঁদের রসায়ন। হতে পারে বাস্তবজীবনে দম্পতি হিসেবে জীবনে, যাপনে, শিল্পে, কর্মে দীর্ঘদিন একত্রে বসবাসের ফলে এই নির্ভুল ছন্দের বোঝাপড়া তাঁদের দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছে। এতে লাভ হলো আমাদেরই, সফল শিল্পীদম্পতি হওয়ার সুফল তাই দর্শকেরা মঞ্চের সামনে বসে উপভোগ করেছেন। এই দুজন দুর্দান্ত অভিনয়শিল্পীর সাথে ‘নির্ভার’এ আরো একটি চরিত্র, যাকে আমরা ‘ভেতর-শিশির’ নাম দিতে পারি, তিনি, বাহাউদ্দিন মিরনও তার সর্বোচ্চ সাধ্যে অভিনয় করে তাল মিলিয়েছেন। মঞ্চসজ্জায় ছিলেন পীযূষ দস্তিদার; অসাধারণ ‘সাধারণ’ একটি মঞ্চ তিনি সাজিয়েছেন, রুচিস্নিগ্ধ, মেদহীন সুন্দর। মঞ্চের আলো, আবহের কারিগরেরাও তাঁদের মেধা আর চেষ্টার প্রকাশে কার্পণ্য করেননি। কারিগরি সাময়িক সমস্যার জন্য নাটকের প্রথম পাঁচ-সাত মিনিট সংলাপ সামান্য কম শোনা গেলেও, একঘন্টা ব্যাপ্তির নাটকের বাকি পঞ্চান্ন মিনিট কিন্তু পিনপতন নীরবতায় দর্শকেরা অভিনয়মুগ্ধ হয়েই ‘নির্ভার’ উপভোগ করেছেন।
‘নির্ভার’ সামাজিক সম্পর্কের ভাঙাগড়ার এক অস্থির সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা শুনিয়ে গেল। আমরা, দর্শকেরা খোলা হাওয়ার মত এক নির্ভার ভাবনা ভাবতে ভাবতেই মিলনায়তন থেকে ফিরেছি। কারণ, নাটকের শেষ দৃশ্যটা দেখে কেবল এটিই মনে এলো, ভালোবাসার অপর পিঠে কেবল ভালোবাসাই থাকে। এভাবেই অনন্ত জাগে।

x