নির্জলা কবি ওহীদুল আলম

সৈয়দ কামরুল হাবীব

শুক্রবার , ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ
116

ঠিক দুপুর। কাজীর দেউড়ির নারিকেল গাছের ছায়ায় ইজি চেয়ারে বসে প্রতিদিনের মত লিখছেন কবি ওহীদুল আলম। হঠাৎ এক ব্যক্তি টিনের দরজা ঠেলে নি:শব্দে কবি ওহীদের চরণ দুটি পরম মমতায় ধরে সালাম করছেন। লেখায় নিমগ্ন কবি ওহীদ পায়ে কারো হাতের স্পর্শে চকিত ফিরে বলেন, কে তুমি? কবি ওহীদের পা ছুঁয়ে বসে আগুন্তুক উত্তর দিলেন, স্যার আমি হুমায়ূন। মাথায় হাত রেখে আড়ষ্ট চোখে দেখে বললেন, কোন হুমায়ূন তুমি। হুমায়ূন বললেন, স্যার আমি হুমায়ূন আহমেদ। এবার ইজি চেয়ারে বসা কবি ওহীদুল আলম লেখা ছেড়ে বললেনওরে বাবা তুমিতো মস্ত বড় সাহিত্যিক। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, আমি তো স্যার আপনার ছাত্র।

দীর্ঘদিন পর ছাত্রকে দেখে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন কবি ওহীদ। পরে দু’জনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছিল। কবি ওহীদুল আলম হুমায়ূন আহমেদকে চট্টগ্রাম আগমনের কারণ জানতে চাইলে তিনি (হুায়ূন) বললেন, স্যার কলেজিয়েট স্কুলে আমার এক বন্ধু শুনেছি আলমাস সিনেমায় টিকেট ব্ল্যাক করে। ওই বন্ধুকে খুঁজতে এসেছি এবার।

হুমায়ূনের শিক্ষক কবি ওহীদ জিজ্ঞেস করলেন তাকে পেলে তুমি কী করবে। উত্তরে বললেন, কিছু না স্যার। বুকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদবো।

কবি ওহীদুল আলমের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য কীর্তিমান ছাত্রের উন্মেষ ঘটেছিল। বিশেষ করে কলেজিয়েট স্কুলের তৎকালীন ছাত্ররা দেশেবিদেশে কৃতিত্বের অবদান রেখেছেন।

কবি ওহীদুল আলম কে ছিলেন, কী তার কর্ম পরিধি ছিল, সমাজে তার অবদান কী এসব আজ প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। তার নির্জলা, আত্মকাহিনী ‘পৃথিবীর পথিক’, কাব্যগ্রন্থ ‘কর্ণফুলীর মাঝি’ কিংবা শিক্ষক জীবনের ‘স্কুল কলেজ চৌত্রিশ বছর’ অন্তত নতুন প্রজন্মের জন্য যথেষ্ট তথ্যবহুল ও উপভোগ্য গ্রন্থ। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৪ হলেও অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি অনেক।

কবি ওহীদুল আলম একাধারে বরেণ্য শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী এবং যন্ত্র শিল্পী। তিনি এক সময় সেতার বাজাতেন। বাঁশীতে তুলতেন সুমধুর সুর। হারমনিয়াম দেখলে তিনি স্থির থাকতে পারতেন না। প্রতিদিনকার মত একদিন পদব্রজে দেয়ানজি পকুর পাড় দিয়ে যেতে এক বাড়ি থেকে সকাল বেলায় হারমনিয়াম নিয়ে রেওয়াজের সুর শুনে তিনি ক্ষণিক থমকে দাঁড়ালেন। পুকুর পাড়েই এক দো’তলা বাড়িতে কিশোরী মেয়ে ভোর বেলা রেওয়াজ করছে। কবি ওহীদ সিঁড়ি বেয়ে অচেনা সনাতন ধর্মের বাড়িতে কড়া নাড়লেন। বাড়ির গৃহকর্তা দরজা খুলে দেখলেন সফেদ পায়জামাপাঞ্জাবি পরা মাথায় টুপি মুখে শুভ্র দাড়ি, হাতে কাঠের ছাতা এক বৃদ্ধ মুচকি হেসে বললেন, কে গান করছে এখানে? ভদ্রলোক বললেন আমার মেয়ে। ততক্ষণে গৃহকর্তা ও কন্যা এসে হাজির। তারা নমস্কার করে অচেনা কবিকে বসতে বললেন। হারমনিয়াম দেখে আর তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। অনুমতি নিয়ে শুরু করলেন গান। ওই পরিবার সেদিন বিস্মিত হয়েছিল এমন পোশাকের একজন এত সুমধুর সুরে নজরুলরবীন্দ্রনাথ গাইতে পারে। মানুষ কতটা সরল ও কাব্যিক হলে এমন ঘটনার জন্ম দিতে পারে তা আজ ভাবতেই অবাক লাগে।

কবি ওহীদুল আলম ছিলেন চলমান শিক্ষক। তিনি সাহিত্যের রস দিয়ে মানুষকে শেখানোর চেষ্টা করেছেন। বাংলাইংরেজি, আরবী, ফার্সিতে সমান দক্ষ ছিলেন তিনি। জ্ঞানের আঁধার হলেও তিনি কোনদিন দাম্ভিকতা প্রকাশ করেননি। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের প্রতি ছিল তার মায়ামমতা। নিজের দর্শন বা চিন্তা চেতনা তিনি কোনদিন চাপিয়ে দিতেন না। প্রতিদিন অত্যন্ত ভোরে উঠে ফজরের নামাজ দিয়ে দিন শুরু করে পবিত্র কোরানের তরজমা করতেন। ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকলেও তিনি ধর্মান্ধ ছিলেন না। ফলে তার প্রিয় বন্ধু প্রফেসর আসহাব উদ্দিন মার্কসবাদের দর্শন নিয়ে রাজনীতি করলেও দুই বন্ধুর মধ্যে কোনদিন তিক্ততার জন্ম হয়নি। প্রফেসর আসহাব উদ্দিন হুলিয়া নিয়ে পলাতক জীবনে মাঝে মধ্যে রাতের অন্ধকারে আসতেন বন্ধু কবি ওহীদুল আলমের বাসায়। তখন ওহীদুল আলমের স্ত্রী জেরিনা খানম আগ্রহ নিয়ে বিশেষ খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করতেন। বিপ্লবী বন্ধু প্রফেসর আসহাব উদ্দিন ও বন্ধু ওহীদের জীবন দর্শনে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বন্ধুত্বের এমন নিদর্শন আজ খুব বেশি দেখা যায় না।

চট্টগ্রাম শহরে কবি ওহীদুল আলম ঘুরে বেড়াতেন পদব্রজে সফেদ পাঞ্জাবির সদা হাস্যোজ্জ্বল এই কবিকে সকলে সম্মান করতেন। রাস্তার ভিখেরি থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চ বিত্তের মানুষের প্রিয় মুখ ছিলেন কবি ওহীদুল আলম। দিনের অর্ধভাগে তিনি হেঁটে বেড়াতেন নিকট আত্মীয়দের বাসায়। স্মৃতি রোমন্থন করতেন অকাল প্রয়াত আরেক ভাই কবি দিদারুল আলমের শেষ জীবনের কথা। বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের চট্টগ্রাম আগমনের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে জুড়ি ছিল না কবি ওহীদের। ফতেয়াবাদে নজরুলের আগমন, কবিতা লেখা ও গানের আসরের কাহিনী কতবার কবি ওহীদুল আলমের বয়ানে শুনেছি হিসেব নেই। দিদারের সাথে নজরুলের বন্ধুত্ব ছিল গভীর। সেই টানে ফতেয়াবাদে কবি নজরুল এসেছেন দু’বার।

১৯৯৮ সালের ২৪ জানু। তখন রমজান মাস। আমি অফিস থেকে বাসায় ফিরে খবর পাই নানা ওহীদুল আলম সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। আমি তৎক্ষণাৎ কাজির দেউড়ি নানার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিই। জানতে পারি তিনি মেট্রোপলিটন হাসপাতালে আছেন। আমি রিক্সা নিয়ে হাজির হই ওই হাসপাতালে। তখন ইফতারের সময় অতি নিকটে। আমি ক্যাবিনে গিয়ে দেখি নানা ওহীদুল আলম ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তিনি শুধু পানি পানি বলে চিৎকার করছেন। তখন ওই ক্যাবিনে কোন ডাক্তারনার্স নেই দেখে আমি দৌড়ে ডক্টরস্‌ রুমে যাই। তাদের আকুতি করি শেষ চেষ্টার জন্য। কিন্তু সেই সময় কোন ডাক্তার সাড়া দেননি। বরং একজন ডাক্তার জানান স্যালাইন গেলে রোগী ভালো হয়ে যাবে।

ডাক্তারের সেই আশ্বাস নিয়ে যখন আমি দৌড়ঝাঁপ করছি তখন কবি ওহীদের আকুতি আরো তীব্র হচ্ছে। আমাকে ডেকে বললেন ‘নাতি আমাকে একটু পানি দে’। অনেক পরে এক ডাক্তার এসে বললেন এবার আপনি পানি দিতে পারেন। আমি কম্পন হাতে দু’চামচ পানি মুখে দিলে তিনি তা গ্রহণ করে চির বিদায় নিলেন। দেশের একজন প্রবীণ শিক্ষকের এমন অপ্রত্যাশিত বিদায়ে আমার অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। তিনি যে আদর্শ রেখে গেছেন তার কতটুকু পরবর্তী প্রজন্ম ধারণ করতে পেরেছি তা আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা বাস্তবায়ন হলে তিনি বেঁচে থাকতেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কবি ওহীদের আদর্শ অনুসৃত হয়নি দু:খজনকভাবে। তিনি যে জীবনের গান গেয়েছেন, তিনি যে সহজ সরল জীবনাচারে স্রষ্টার নান্দনিকতা খুঁজেছেন, প্রকৃতি ও প্রাণীকুলকে পরম যত্নে ভালবেসে ঈশ্বরের সন্তুষ্টি বিধান করেছেন তা আজ পর্যালোচনার দাবি রাখে। আমরা যারা কাছ থেকে কবি ওহীদুল আলমকে দেখেছি তারা নিশ্চয় প্রতিদিন না হোক কোন এক অলস মুহূর্তে ভাবি একজন নির্জলা নিষ্পাপ মানুষ ছিলেন কবি ওহীদ। আজ ১০৮তম জন্মদিনে এই মানুষটিকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

x