নিজেদের লুট হওয়া বন্দুকের গুলিতেই খুন হন খোকা!

নেপথ্যে আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থিতা

চৌধুরী শহীদ, চন্দনাইশ

সোমবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৮ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
215

চন্দনাইশ উপজেলা শ্রমিক লীগের সহঅর্থ বিষয়ক সম্পাদক হাজী নুরুল ইসলাম খোকা তাদের নিজেদের লাইসেন্স করা বন্দুকের গুলিতেই খুন হয়েছেন বলে দাবি তার পরিবারের। তারা বলছেন, ২০১৬ সালে তাদের ঘরে হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন তার (খোকার) পিতা হাজী আমিনুল ইসলামের নামে লাইসেন্স করা বন্দুকটি লুট করে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা করা হলেও পুলিশ বন্দুকটি উদ্ধার করতে পারেনি। এছাড়া নিহত খোকার স্বজনরা আরো দাবি করেন, এলাকায় খোকার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং এর সুবাদে আগামী ইউপি নির্বাচনে ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় তা মেনে নিতে পারেনি প্রতিপক্ষের লোকজন। ফলে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের তদন্তেও এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এদিকে গত ১১ এপ্রিল সকালে ধোপাছড়ির চিড়িংঘাটা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ধোপাছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা গ্রামটিতে টহল দিচ্ছেন। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশের টহল চলছে বলে জানা যায়। এসময় পুরো এলাকা ঘুরে খোকার পরিবার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত বছরতিনেক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা করা খোকা এলাকার মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন। কয়েকমাস অন্তর অন্তর তিনি বিদেশ থেকে এসে ধোপাছড়ির অসহায় লোকজনকে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছিলেন। ফলে এখানকার মানুষের মাঝে তার জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। এছাড়া গত ইউপি নির্বাচনে খোকা এই ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান পদে লড়তে আ.লীগের মনোনয়নের জন্য দৌঁড়ঝাপ শুরু করেন এবং দলের নীতি নির্ধারকদের নজর কাড়েন। যদিও সেইবার তিনি মনোনয়ন পান নি, তবুও তিনি আগামী নির্বাচনের জন্য হাইকমান্ডের সুনজরে ছিলেন। ফলে বিষয়টি সহ্য করতে পারে নি তার প্রতিপক্ষরা। যে কারণে তারা খোকাকে সরিয়ে দেয়ার একটা চেষ্টায় ছিল বলে দাবি পরিবারের।

এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ মে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচন শেষে প্রতিপক্ষ গ্রুপটি তার ও তারপক্ষের কয়েকটি ঘরে হামলা চালায়। এতে তার চাচাজেঠার ঘরসহ কমপক্ষে ১০টি বসতঘরে ভাংচুর করা হয়। এরপর ওই বছরের ২৪ জুলাই দুপুরে পুনরায় প্রতিপক্ষ গ্রুপটি হামলে পড়ে তার পরিবারের ওপর। সে সময় তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে খোকাদের মালিকানাধীন ৪টি পুকুরের মাছ এবং তাদের ঘরে হামলা চালিয়ে মূল্যবান মালামালসহ তার বাবার নামে লাইসেন্স করা ‘সেকান্দর’ বন্দুকটি লুট করে। ওই ঘটনায় আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে সিএমএম আদালতে একটি মামলা (নংসি আর ১৮০/২০১৬) দায়ের করেন। ওই মামলায় আসামি করা হয় খোকা হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি জামাল উদ্দীনসহ অন্যান্যদের। এর চারমাস পর ২১ নভেম্বর সকালে খোকার পরিবারের ওপর আবারো হামলা চালায় প্রতিপক্ষ গ্রুপটি। ঐদিন খোকার চাচা সুলতান আহমদের পুত্র মোহাম্মদ ফোরকান (৩৫) ও ছোটভাই ফরিদ আহমদকে (৪৫) বেধড়ক মারধর করে এবং ফোরকানের পায়ের রগ কেটে দিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় সুলতান আহমদ বাদী হয়ে চন্দনাইশ থানায় একটি মামলা (নং২৫২১/১১/২০১৬) দায়ের করেন। সেখানেও খোকা হত্যার সাথে জড়িত অনেককেই আসামি করা হয়। ভাইপো ফোরকানকে হত্যা চেষ্টার ঘটনার তিনদিন পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে খোকার পিতা হাজী আমিনুল ইসলাম মারা যান। মাছ ও বন্দুক লুট এবং ফোরকানফরিদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য খোকাদের পরিবারের ওপর প্রতিপক্ষের লোকজন প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই খোকা পরিবার নিয়ে বেশিরভাগ সময় চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করতেন বলে জানা যায়। এরপর গত ২৬ মার্চ পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে গত ৩ এপ্রিল এলাকার লোকজনের সাথে দেখা করতে ধোপাছড়ি আসলে ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রতিপক্ষের লোকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে খোকাকে।

খোকার চাচাতো ভাই ফোরকান ও ফরিদ জানান, গত কয়েক বছর ধরে জামাল উদ্দীনের লোকজন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল। যারাই জামাল উদ্দীনের বিরোধীতা করতো, তাদের উপরে নেমে আসতো নির্যাতন। এসব নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় এবং আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় জামাল উদ্দীনসহ তার লোকজন খোকাকে হত্যা করে। নিহত খোকার সৎভাই বর্তমান ইউপি মেম্বার আবদুল করিম বলেন, যেদিন ইউপি সদস্য হিসাবে আমার শপথ নেয়ার দিনক্ষণ ঠিক ছিল সেদিনও জামাল উদ্দীনের নেতৃত্বে শতাধিক লোকজনসহ এসে আমাদের ৪টি মৎস্য প্রজেক্ট থেকে দিনেদুপুরে মাছ এবং ঘরের দরজা জানালা ভেঙে বাড়ির মালামালসহ আমার পিতার নামে লাইসেন্স করা বন্দুকটি লুট করে নিয়ে যায়। সেসময় বন্দুক লুটের ঘটনায় মামলা করা হলেও অদ্যাবধি বন্দুকটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। আর সে বন্দুকটি দিয়েই আমার ভাই খোকাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছি। নিহত খোকার মা সখিনা বেগম তার ছেলে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

এদিকে নুরুল ইসলাম খোকা হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দোহাজারী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ বিদ্যুৎ কুমার বড়ুয়া বলেন, আমরা ধারণা করছি ২০১৬ সালে লুট হওয়া বন্দুকটি খোকা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বন্দুকটি উদ্ধার করা গেলেই সে ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ইতোমধ্যে ৫ আসামি গ্রেফতারসহ হত্যাকাণ্ডের অনেক ক্লু পুলিশের হাতে এসেছে বলেও জানান এই তদন্ত কর্মকর্তা।

চন্দনাইশ থানার ওসি আবদুলাহ আল মামুন ভূইয়া আজাদীকে জানান, এলাকায় জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ও স্থানীয় নির্বাচনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠাই খোকার জন্য কাল হয়েছে। এজন্যই প্রতিপক্ষ গ্রুপটি তাকে হত্যা করেছে। পাশাপাশি জায়গাজমির বিরোধও এই হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে উল্লেখ্য বলে মন্তব্য করেন ওসি।

x