‘না’ – কেবল একটি শব্দ নয়

অপরাজিতা আইচ

শনিবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ
42

ভারতীয় লিভিং লিজেন্ড অমিতাভ বচ্চন একবার তাঁর দুই নাতনীকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি তাঁদের যা লিখেছিলেন তার কিছুটা এইরকম – তোমরাতো নারী, তো লোকে তাদের চিন্তাভাবনা এবং একটা সীমানা তোমাদের উপর চাপিয়ে দেবে। অন্যের ছায়ায় বেঁচো না, বরং নিজের স্বাধীন চিন্তা প্রসূত পথ নিজেই তৈরি করে নাও। কাউকে সেই সুযোগ দিওনা যাতে তোমাদের স্কার্টের দৈর্ঘ্য দিয়ে তোমাদের চরিত্র পরিমাপ করতে পারে। কেউ যাতে এটা নির্ধারণ করতে না পারে যে কে তোমার বা তুমি কার বন্ধু হবে।…………… লোকে অনেক কথাই বলবে, ভয়াবহ কিছু বলবে, কিন্তু এসব নিয়ে খুব বিচলিত হবে না। কখনো কিছু করতে যেয়ে ভেব না, লোকে কি বলবে। দিনান্তে তোমার কর্মকান্ডের মুখোমুখি কেবল তোমাকেই হতে হবে, সুতরাং লোককে তোমার কোন সিদ্ধান্ত নিতে দিও না।…………এটা সত্য যে এ খুব কঠিন একটা দুনিয়া একজন নারীর জন্য, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এই তোমাদের মতন নারীরাই একে বদলে দিতে পারবে।
সমাজ যতই আধুনিকমনস্ক হোক না কেন, আজও একটা না-বলা লুকোছাপা কাজ করে। নানান উছিলায় কী সমাজ বা কী পরিবারে, কী ধর্মমেয়েদের নানা রকম নীতিবাগীশ নিয়ম শৃঙ্খলা ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাখার চেষ্টা আগেও হয়েছে। এখনও কম বেশি হয়। সেই শিশু বয়স থেকে মেয়েদের পই পই করে শেখানো হয় বা শিখে নিতে হয়, পা ফাঁক করে বসবে না, জোরে কথা বলবে না, লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবে, অযথা বায়না করবে না। পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর থেকে অনুশাসন আরও জারি হয়। ছেলেদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করবে না, সদাসতর্ক হয়ে থাকবে, গা ঢাকা পোশাক পরবে, সন্ধ্যে বা ভরদুপুরে ফাঁকা রাস্তায় একা একা হাঁটবে না, একা একা ট্যাক্সিতে না ওঠা। এ সবই মেয়েটির ধর্ষিত না হওয়ার ধর্ষণজনিত সাবধানবাণী। যে বিকার নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার অভিভাবকসুলভ তাগিদ।
ধর্ষকাম মূলত পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার অন্তর্গত অসুখ। ইদানীং এই বিকৃতি মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করেছে। যদিও পুরুষতন্ত্র ধর্ষণের স্বপক্ষে নানা কু-যুক্তি উপস্থাপন করে থাকে, ধর্ষণের কারণ হিসেবে নারীর পোশাক, আচরণ, তাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, একা থাকা, নারীদের স্বাবলম্বী হতে চাওয়া ইত্যাদির উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করে। এতো আসলে নুতন কিছু নয়, আদি গ্রন্থে নারীর পাঁচ স্বামী, বস্ত্রহরণ, নারীর সতীর্থ পরীক্ষা, বড় বড় রাজাদের বংশ রক্ষার সংকট থাকলে বিশিষ্ট ধর্মীয় গুরুর মাধ্যমে গর্ভসঞ্চার এর অসংখ্য উদাহরণ টানা যেতে পারে। আর এসবের জের ধরেইতো ২৯শে এপ্রিল ২০১৭-এ আর একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গাজীপুর শ্রীপুর রেলস্টেশনে। হযরত আলী নামে একব্যক্তি তার ৮বছর বয়সী শিশুকন্যা আয়শাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে আত্মাহুতি দেয়। হযরত আলী তার শিশুকন্যার সম্ভ্রমহানির বিচার দ্বারে দ্বারে চেয়েও পাননি। কিংবা তনু হত্যা মামলা?
নারী কেবল পাত্রপাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের মতন সুশ্রী, মৃদুভাষী, রুচিশীলা, নান্দনিক, স্নিগ্ধ, ললিত লবঙ্গলতা নয়। সংবাদপত্র খুললে, টেলিভিশন চ্যানেলের রিমোট নিউজ চ্যানেলে ঘোরালেই নারী নির্যাতনের খবর। আজ যেখানে মেয়েরা ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিক, চিকিৎসক, বৈজ্ঞানিক, ক্রীড়াবিদ, চলচ্চিত্রকার, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ফ্যাশন ডিজাইনার, বিচারক, রাজনীতিবিদ, পাইলট এমনকী মহাকাশচারী সমস্ত দিকেই নিজেদের দুর্দান্তভাবে উপস্থাপন করছেন, সেখানে সমাজের কতিপয় ধ্বজাধারী স্বঘোষিত রক্ষক নারীকে কাঁটাতারের বেড়াজালে আটকে রাখতে চায়।
উপরে উল্লেখ করা অমিতাভের সেই চিঠিটি মূলতঃ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর পিংক সিনেমাটা মুক্তির সময়কালে। পরিচালক সুজিত সরকার ছবির প্রোমোশানে এই চিঠিটি ব্যবহার করেছিলেন, সে নিয়েও সমালোচনা কম হয়নি। খোদ অমিতাভকে দিতে হয়েছিল তাঁর অতীত জীবনের নানা কর্মকান্ডের ব্যাখ্যা। কেন তিনি জঞ্জির সিনেমার পর জয়াকে নিয়ে বিদেশ ঘুরতে যাবার প্রাক্কালে পরিবারের ইচ্ছেয় বিয়ে করেছিলেন, কিংবা কেন দোষ কাটাবার জন্য ঐশ্বরিয়া রাইয়ের কলাগাছের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ইত্যাদি। সেসব ছাপিয়েও সিনেমাটা কিন্তু মুখ্য হয়ে উঠেছিল তাঁর গল্পের জোরে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ভিত্তিক কাহিনীর কারণে।

বনানীর রেইনট্রি হোটেলের সেই ঘটনাটার কথা মনে আছে? মনে না থাকলে বা ঝাপসা হলে আবারও একটু খেই ধরিয়ে দিচ্ছি – আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে ধর্ষক সাফাত, নাঈম গংরা অস্ত্রের মুখে দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ এবং বডিগার্ড কর্তৃক এর দৃশ্য ধারণ করে লাম্পট্য এবং বিকৃতির নিকৃষ্টতম উদাহরণ স্থাপন করেছিল। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় একদিকে সচেতন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ যেমন দেখা গেছে অন্যদিকে সাফাত-নাঈমদের পক্ষে সাফাই গেয়ে নির্যাতিতা শিক্ষার্থীদ্বয়কে দোষারোপ করা, তাদের ‘বেশ্যা’ অপবাদ দেয়ার মত লোকও কম ছিল না মোটেই, যেমনটা আমরা দেখেছি পিংক সিনেমায়। এই সিনেমাতেও দেখা যায় বাদি পক্ষের আইনজীবী মেয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে ইনিয়ে বিনিয়ে এসব অভিযোগ করে, একপর্যায়ে এটাও প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে তারা মূলত টাকার বিনিময়ে পার্টিতে গিয়েছিল।
সিনেমার গল্পটা সংক্ষেপে এই রকম – মৃণাল আরোরা, ফালাক আলী এবং আন্দ্রিয়া তারিয়াং তিনজন কর্মজীবী নারী দিল্লিতে একটি আ্যপার্টমেন্টে একসাথে থাকে। তারা তাদের পরিচিত কিছু ছেলে বন্ধুর আমন্ত্রণে একটি ডিনার পার্টিতে যায় এবং সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়। মৃণাল আরোরা নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তাদের ছেলে বন্ধুদের একজন রাজভীর সিংকে আহত করে। রাজভীর সিংয়ের চাচা একজন ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ এবং সে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রাজভীর গং মেয়ে তিনজনকে নানাভাবে হেনস্তা করতে থাকে, তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করতে সম্ভব সব কিছুই করে। ফালাক আলী চাকরি হারায়। এমনকি একপর্যায়ে মৃণালকে কিডন্যাপও করে। পরে মৃণাল আরোরার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হয়, বলা বাহুল্য প্রশাসনও ক্ষমতাবান রাজভীর গংয়ের পক্ষেই কাজ করে। মৃণাল আরোরাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাচক্রে মেয়েদের সাথে পরিচয় হয় দীপক সেহগাল (অমিতাভ বচ্চন) নামের একজন প্রতিথযশা অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবীর। তিনি অনেকটা স্বপ্রণোদিত হয়ে মৃণালদের হয়ে মামলাটা লড়েন। ছবিটির বাকি অংশ দু’জন আইনজীবীর মধ্যকার যুক্তিতর্কের টানটান উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।
আমাদের সামাজিকগত পরিকাঠামো সুচতুরভাবে এমনই যেখানে অলিখিতভাবে এটাই মনে করা হয়, পুরুষ মেধাবী, পুরুষ বোহেমিয়ান, পুরুষ সোনার আংটি, পুরুষের যেখানে খুশি যাবার অধিকার আছে, যা ইচ্ছে করবারও। আদিকাল থেকে আমাদের গ্রন্থগুলোও সেভাবেই পুরুষকে উপস্থাপন করেছে। অপরদিকে নারীর শুচিতার উপর দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা সড়ক নির্মাণের আলকাতরা এই পরে এই পরে এমন একটা অবস্থার পেন্ডুলামে দোদুল্যমান থাকে। এমনকী অনিচ্ছুক স্ত্রীকেও কতসময় বিপন্ন হয়ে স্বামীর কাছেই ধর্ষিতা হতে হয় বারবার। শয্যা সঙ্গী নিজের বিবাহিত স্বামীকেও হয়তো বলতে দ্বিধা করে যে আজ তার মন ও শরীর দুটোই স্বামীর ইচ্ছার সঙ্গে পাল্লা দিতে নারাজ। একটা অভিমানরূপী প্রতিবাদ চোরাগোপ্তা পথে আস্তে আস্তে ব্যবধান বাড়িয়ে তোলে দুজনের মধ্যে রঙিন করে স্বপ্ন দেখা ভবিষ্যৎ তখন আবছা হয়ে আসে।
পিংক সিনেমায় অমিতাভের একটা ডায়লগ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘না- কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য। ‘না’ বললে কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। একটি মেয়ে পরিচিত হোক বন্ধু, প্রেমিকা কিংবা যৌনকর্মী এমনকি স্ত্রীও হয়, যদি বলে ‘না’তবে থামতে হবে। ‘না’ মানে ‘না’।’

x