নারী-সায়র

জায়েদ ফরিদ

মঙ্গলবার , ১০ মার্চ, ২০২০ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
70


ঢলে পড়া দুপুরে দোতলার ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন নীলিমা চৌধুরী, গাঁয়ের মানুষ এখন যাকে দীঘিমা বলে ডাকে। যতদূর চোখ যায়, বিস্তৃত ধানক্ষেত, ধানক্ষেত পার হলে ক্ষীণতনু আত্রাই নদী। ঢেউ তোলা ধানক্ষেতের উপর থেকে ভেসে আসছে সোঁদা সবুজ হাওয়া। দূর থেকে মেঠো পথ ধরে মন্থর পায়ে হেঁটে আসছে দুটি গ্রাম্য যুবতী, সোঁদা হাওয়া তাদের আঁচল ওড়াতে পারছে না। একজনের পরনে হলুদ শাড়ি। পরপর ক’দিন ধরেই নদীর ঘাট থেকে ফিরতে দেখা যাচ্ছে এদের। নীলিমা আজ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন, কারা এই দূরাগত মেয়ে!
ভেজা কাপড় টেনেটুনে বেশ কষ্ট করে হাঁটছে মেয়েরা। কাপড় সামলানো যেন এক টানাপোড়েনের সংসার, একদিক টানলে আরেকদিক খালি হয়ে যায়। খানিকটা কাছে এলে বোঝা গেল, নদীতে গোসল করতে গিয়েছিল এ পাড়ার কলেজে পড়া মেয়ে ঝুমকি। সারা গাঁয়ে এই একটিমাত্র মেয়েকেই ঘন ঘন হলুদ শাড়ি পরতে দেখেন তিনি। ঝুমকির জীবনে আর কোনো ঋতু বুঝি নেই, সব ঋতু উপেক্ষা করে মন তার কেবলই বসন্ত হৃদয়ে হাঁটে, সংসারে যতই আসুক চৈত্র-খরা। সদা লাস্যময় চঞ্চল সরলাকে নানা কাজে কাছে ডাকেন নীলিমা, কলেজে তার বি-এ পড়ার খরচ বহন করেন, সংসারের খবর নেন।
শহরের চাকুরি-জীবন থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে গ্রামে থাকাই মনস্থ করেছেন নীলিমা। এ তল্লাটে একটিই ইঁটের দালান, বাদবাকি অধিকাংশই কুঁড়ে ঘর। বাড়ির পাঁজর ঘেঁষে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ চলে গেছে আত্রাই ঘাটে। শীতকালে জল থাকে না নদীতে, ফসল ফলানো দায় আবার বর্ষায় ভরে গেলে সইতে হয় ভাঙনের যন্ত্রণা। জমিজিরাত বাড়িঘর অনেকেরই অবশিষ্ট নেই। গত কয়েক বছরে শুকিয়ে বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছে নদী। মহাভারতে উল্লিখিত আত্রেয়ি এক পুন্যতোয়া নদী, এখনও যার তীরে অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র বারুণী-স্নান। আত্রাই নদীতে স্নানের পর কেউ কেউ কাঁখে করে একঘড়া পুন্য-জল ঘরে নিয়ে আসে।
সেবাই পরম ধর্ম, এই উপলব্ধি নিয়ে দরিদ্রের সেবায় জীবনকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছেন নীলিমা চৌধুরী। কংক্রিটের থামের উপর বানানো তেতলা দালান, নিচের দিকটা খোলা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে অনেক মানুষ এখানে আশ্রয় নেয়। নিচতলায় একটি বয়স্ক শিক্ষার আসর চালু করেছেন তিনি। নিরক্ষর মানুষ যেন কিছুটা আলো পেয়ে চলার পথ সহজ করে নিতে পারে।
মেয়েদুটো এগিয়ে এলে ঝুমকিকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন নীলিমা। দেহটা উজ্জ্বল হলেও চোখে তার কষ্টের নীল ছাপ। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে গায়ের শাড়িটা প্রায় শুকিয়ে গেছে, ওপরটা উজ্জ্বল, নিচের দিকটা ধূলিমলিন। এতদূরে নদীতে যাওয়ার কারণটা এবার জানতে চাইলেন নীলিমা, ‘এই এলাকায় বেশ কয়েকটি পুকুর আছে কিন্তু রোজ রোজ তোমাকে নদীতে কেন যেতে হয় ঝুমকি?’ ঝুমকি মাথা নুইয়ে রাখে, জবাব দেয় সঙ্গিনী গাঁয়ের মেয়ে।
– ‘খালি আমরা না আম্মা, অনেক মানুষই এখন গাঙে গোসল করব্যার যায়, আর না করে কোনো উপায়ও নাই আমাগের।’
– ‘উপায় নেই মানে, বুঝলাম না।’
– ‘সে-অনেক কথা আম্মা, পুষ্কুনিতি গোসল করব্যার গেলি ব্যাটা মান্‌িষ খুব উৎপাত করে। ম্যায়ারা কেউ কেউ পুষ্কুনি থুয়্যা পাছকুনা মাইঠেলে গোসল কইরতো, এখন পানি শুক্যা নেতি পড়ে গিছে, গাঙ ছাড়া আর কুনো উপায় নাই।’
– ‘কী রকম উৎপাত, খুলে বলো তো আমাকে।’
– ‘হগল কথা কওয়ার মতো না আম্মা। আমরা ধুল্যাবালুর মধ্যি সারাদিন ঘর-গেরস্তের কাম করি, ধান উড়্যাই, কাঁড়ালি দেই, খ্যাড়ের পালা উঁচ্যা করি, ডুয়া লেপি, তারপর হুইল্যা মাথায় ডুব দিব্যার যাই। ব্যাটারা থাকে আরেক ঘাটে। বস্যা বস্যা বিড়ি-সিগারেট খায়, মোবাইল টেপে, নিচ্চিত ছবিও তোলে। ঘাটে কারো একলা পালি ডুব দিয়ে আইসে পাও ধরে টান দেয়। কিছু না বলতি বলতি সাহস বাড়্যা গিছে তাগের, একদিন একজনের শাড়ি ধর্যা টান দিছে। কেউ লজ্জায় কিছু কব্যার পারে না, খালি কয়, এক পওর হাঁইটে গাঙে যাব তাও ভাল। আমরা তো জানি পানিতি থাকে খোয়াজ খিজির কিন্তুক এই পুষ্কুনির মদ্যি খিজির নাই আম্মা, আছে যক্ষ, কখুন যে কার পায় শিকল দেয়!’
– ‘কি সাংঘাতিক কথা, পা ধরে টান দেয়! কিছু পুরুষ মানুষ আছে যারা অবলাকে হাত ধরে উপরে টেনে তোলে না, পা ধরে টেনে নামাতে চায়, চুল ধরে, মারধোর করে। তা তোমরা কুয়াতে গোসল করো না ক্যান?’
– ‘ফাল্‌গুন মাস থিক্যা কুয়ায় পানি নাই আম্মা, বালতি ঠেকে পড়ে। আর বেড়া-টেড়া নাই, থাকলিও ফাঁসা ফাঁসা নাড়ার বেড়া, পাট তো আর তেমুন লাগায় না মানুষ যে ফাটকুড়ির বেড়া দিবি। তাই একরকম বেপর্দা হয়াই গোসল করা লাগে।’
– ‘তুমি এক কাজ করো ঝুমকি, সবাইকে দালানের নিচে আসতে বলে দাও আগামি শুক্রবার বিকেলে, বয়স্কদের আসরে। যারা নদীতে গোসল করতে যায় তাদের অভিযোগগুলো আমি নিজ কানে শুনতে চাই। আর আমার সঙ্গে থেকো একটু, কিছু কাপড়চোপড়ও বিলি করতে হবে।’


শুক্রবার বিকেলবেলা। দালানের নিচে অনেক মানুষ জমায়েত হয়েছে, ঝুমকি এসে খবর দিলো উপর তলায়। নীলিমা চৌধুরী নামতেই সবাই উঠে দাঁড়ালো। ঝুমকিকে বললেন, ‘তোমার জন্য একটা বাসন্তি শাড়ি আছে বাণ্ডিলের নিচে, বাকিগুলো বয়স্কদের দিয়ে দাও, যারা গত সপ্তাহে নিয়েছে তাদের বাদ দিয়ে।’
আসরের কোনায় বয়স্ক-শিক্ষার মাস্টারনীর জন্য টেবিল-চেয়ার পাতা, বাকিরা হোগলা পাটিতে উপবিষ্ট। একজন একজন করে ডেকে সবার কথা শুনতে লাগলেন নীলিমা। দারিদ্র্য আর হতাশা নিয়ে নৈমিত্তিক কিছু অনুযোগ থাকলেও অধিকাংশ অভিযোগই পুকুরে মেয়েদের গোসল করার বিপত্তি নিয়ে। টেবিলে ডাক পড়ল ঝুমকির সাথে কলেজে পড়া ছাত্রী ফাতিমার। তার অভিযোগ একটু ভিন্ন। খুব ফিসফিস করে বললো সে, ‘ম্যাডাম, আপনে আমার লেখাপড়া আর পরিবারের অনেক দেখভাল করেন এর জন্য আমরা খুব কৃতজ্ঞ, কিন্তু কিছু মনে না করলে একটা কথা আমি খোলাসা করতে চাই।’
– ‘তুমি স্বচ্ছন্দে বলো ফাতিমা, সব কথাই শুনতে চাই আমি।’
– ‘ম্যাডাম, আপনে যখন বাড়ি থাকেন না, আবার হঠাৎ হঠাৎ ঢাকায় চলে যান তখন একজন মানুষ আপনের দালানের দক্ষিণ দিকের বারান্দায় এসে বসে, তার হাতে থাকে লম্বা ঝুম-ক্যামেরা। উনি কী করেন তা কেউ বোঝে না কিন্তু আমি মোলুবির ঝি, আমার গোসল করতে অস্বস্তি লাগে। চিন্ত্যা করতিছি, আমিও গাঙে যাওয়া শুরু করব ঝুমকি-বুর সাথে।’
– ‘কিন্তু পুকুর তো আমার বারান্দা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, এত দূর থেকেও তোমার লজ্জা!’
– ‘জী, আমার লজ্জা লাগে, কারণ উনার সঙ্গে ঝুম-ক্যামেরা থাকে। গাঙে গোসল করার সময় মহাজনী নৌকা যখন উজান-ভাটি করে তখন গ্রামের মেয়েরা বুকে কাপড় দেয়, নিচু হয়ে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকে। লজ্জার মাত্রা সবার সমান না ম্যাডাম, কিছু গেরস্থ বউ ঘরের চালে কাক বসলিও কাপড় ঠিক করে, পানির কিনারে একটা গাংচিল বসলেও অস্বস্তিতে থাকে। উনি সারা গ্রামে ছবি তুলে বেড়ান, নদীর ঘাটেও ছবি তোলেন, বিষয়টা আমার ভাল লাগে না। ঝুমকি-বু বলে, ওসব কিছু না, উনি ভাল মানুষ, আপনার নাকি আত্মীয় হয়, ফটোগ্রাফার।’
নীলিমা চৌধুরী মৃদু চিন্তিত হয়ে পড়েন কিন্তু সাবলীলভাবে উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ ফাতিমা, উনি আমার আত্মীয়, অঞ্জন চৌধুরী, নামকরা ফটোগ্রাফার। এসব নিয়ে তোমরা ভেব না, আমিই ওনাকে বলেছি পুকুরে গোসল করার সময় তোমাদের একটু খেয়াল রাখতে। তবে যাই হোক সবকিছুই তোমরা আমাকে জানাবে, লজ্জা নারীর ভূষণ। আমি তোমাদের অভিযোগগুলো ভাল করে ভেবে দেখব।’
আসর শেষে ঝুমকিকে ডেকে বললেন, ‘আগামি সপ্তাহে আবার সবাইকে আসতে বলে দাও ঝুমকি, আর আত্রাই ঘাটে যাওয়ার সময় ফাতিমাকে সঙ্গে নিয়ে যেও।’

ঢাকা থেকে বাংলোতে চলে এসেছেন নীলিমা চৌধুরী। চিরকাল একলা তিনি। কিন্তু একাকীত্ব তাকে কষ্ট দেয় না, গ্রামের মানুষের ভালোবাসায় মন তার ভরে থাকে সারাক্ষণ। পড়াশোনা শেষ হলো, কিন্তু আর্ট ইনস্টিটিউটের চাকুরিতে মন টিকলো না তার, ফিরে এসে নির্মাণ করলেন এই বাংলো বাড়ি। দূর সম্পর্কের আত্মীয় ফটোগ্রাফার অঞ্জনকে চিলেকোঠায় জায়গা করে দিয়েছেন তিনি। মেধাবি ফটোগ্রাফার, দারুণ প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ। গ্রামবাংলার জীবন নিয়ে প্রদর্শনী করবে সে, আলোকচিত্রের উপাদান সংগ্রহ করার জন্য এসেছে শহর থেকে। কয়েকমাস ধরে একনাগাড়ে কাজ করতে হবে তাকে। নীলিমা শিল্প সমঝদার, অবসরে ছবি আঁকেন, ভাস্কর্য করেন, আলোচনা করেন অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে।
অঞ্জন চৌধুরীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন নীলিমা, ‘অঞ্জন, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি যে পুকুরে গোসল করা মেয়েদের ছবি তুলছ, তা কি ওরা বুঝতে পারে?’
– ‘তা তো আমি জানি না, দূর থেকে ছবি তুলি জুম-লেন্স দিয়ে, গ্রামের মেয়ে আর কতটুকু বুঝবে। কিছু ছবি চমৎকার এসেছে। ঢাকা থেকে প্রিন্টার নিয়ে আসব এবার, যাতে প্রদর্শনীর জন্য তৈরি হতে পারি।’
– ‘কিছু পুরুষ মানুষ মেয়েদের গোসলের সময় বেশ বিরক্ত করে, ঘাটে বসে থাকে, ডুবসাঁতার দিয়ে মেয়েদের খোঁচাখুচি করে। তারা গোসল করতে ভয় পায়, তুমি কি এসব কিছু জানো?’
– ‘না তা জানি না, তবে গোসলের সময়কার কিছু ভীতবিহ্বল ছবি এসেছে ক্যামেরায়। তুমি না দেখলে তা বুঝবে না।’
ক্যামেরা থেকে কেবল্‌ দিয়ে বড় স্ক্রিনে ডিসপ্লে নিয়ে আসে অঞ্জন। স্নানের ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দ্যাখে দুজন। ছবি দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন নীলিমা, যা তারা বলেছে তার কিছুই অমূলক নয়। মানুষ এতটা অসভ্য হতে পারে, ভাবতে পারেন না তিনি। এদের নাগপাশ থেকে রক্ষা করা চাই মেয়েদের। সারারাত অস্থিরভাবে পায়চারি করেন নীলিমা চৌধুরী, বারবার দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ান। বেলে জোছনায় অন্ধকার পুকুরের দিকে তাকান আর প্রতিবারই ফাতিমার বিবৃত কাহিনীর বিভীষিকা ঘিরে ধরে তাকে।

শুক্রবার বিকালবেলা। বাংলোর নিচে অধীরভাবে অপেক্ষা করছে গ্রামবাসী মহিলারা। ঝুমকি তাদের সংখ্যা গুনে দ্যাখে, তারপর উপরে গিয়ে খবর দেয়, ‘আর মানুষ বসার জায়গা নাই ম্যাডাম, সত্তুর জনের মতো হইছে। আপনে এখুন নিচে নামলে ভাল হয়। আমি রুটি-জিলাপি আর চা-র কেটলি নিয়ে আসি।’
নীলিমা চৌধুরী নিচে নেমে আসেন অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে। স্পষ্ট গলায় ধীরে ধীরে বলতে থাকেন, ‘গ্রামটা আমাদের সকলের, এর ভালমন্দ দেখাশোনা করার দায়িত্বটাও গ্রামবাসীদের। যেমন পুরুষদের তেমন মেয়েদের। পুকুরে গোসল করার সময় মহিলাদের অসম্মান করা কাণ্ডবাণ্ড সবই আমি শুনেছি এবং বুঝতে পেরেছি। আমি মনে করি, শুধুমাত্র নারীদের জন্য আলাদাভাবে একটা পুকুর থাকা একান্ত দরকার। আপনারা কি একমত আমার কথার সঙ্গে?’
– ‘কথা তো খুব ভাল, এমন মানুষ নাই যে এই কথায় সায় দিবি না, কিন্তুক এরকম পুকুর কিডা বানায়া দিবি আমাগের জন্যি?’ এক বৃদ্ধা গ্রামবাসীর প্রশ্ন।
– ‘কাকীমা, এই পুকুর বানিয়ে দেবে পুরুষরা, তাদেরে দিয়েই এটা তৈরি করে নিতে চাই আমি। কীভাবে তা সম্ভব হতে পারে সে দায়িত্ব আমি নিতে চাই।’ বৃদ্ধা আবার বলে, ‘দয়াময় ভগমান তুমারে সে খ্যমোতা দিছেন তা মানি, কিন্তুক ছোটোমোটো পুষ্কুনি হলি তো চলবি না, সারা গাঁয়ে পাঁচ-সাতটা পুষ্কুনি আছে, তার সুমান সুমান একটা পুষ্কুনি দরকার, তা’লি হগল মানুষ নাওয়া- ধোয়া করব্যার পারবি।’
– ‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি কাকীমা, ছোট পুকুর হলে আমাদের চলবে না, দীঘিই বানাতে হবে। আমি দীঘি বানাতেই মনস্থির করেছি।’
দীঘি খননের কথা শুনে হৈচৈ পড়ে গেল আসরে। উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেল লাঠি গুটিয়ে বসে থাকা ক’জন বয়স্ক মহিলাও। কিন্তু হতাশা এসে ভিড় করল বৃদ্ধার মনে, ‘কবে তুমি দীঘি বানায়া দিব্যা আর সেই দীঘিতি গাও ভাসায়া গোসল করব আমরা?, ততদিন আমি থাকপো না দুনিয়ায়, অনেক ভুক্তভোগীই মরে যাবি।’
– ‘এমন কথা বলবেন না কাকীমা, এর জন্য সবাই সহযোগিতা করলে তাড়াতাড়ি দীঘি কাটা শেষ হবে। গ্রামে যত মানুষ অবসর আছে, যত বেকার পুরুষ মানুষ আছে সব এক সঙ্গে দীঘি কাটবে। কাজ শেষ করে সন্ধ্যার সময় রোজকার পয়সা রোজ নিয়ে যাবে দালানের নিচে ঝুমকির কাছ থেকে।’
– ‘সিটা ভাল হবি, কাজকাম কর্যা খাড়াব্যার পারবি সারা গাঁর গরীব মানুষ।’
– ‘ঝুমকি, তুমি কি লেবার পেমেন্টের দায়িত্বটা নিতে পারবে?’
– ‘জী ম্যাডাম পারব, তবে অঞ্জন আংকেল সঙ্গে থাকলে খুব ভাল হয়, কাজটা ছোট নয়।’

আজকাল কেউ আর সহজে দীঘি খনন করতে চায় না। জলের ভেতর সম্পত্তি রাখা মানে অর্থের জলাঞ্জলি দেয়া। দীঘির কাজ শুরু করেছে গাঁয়ের লোকজন। বড় কাজের সন্ধান পেয়ে দূর গাঁয়ের মানুষও এসেছে ঝুড়ি-কোদাল হাতে। দিন কয়েক পর দীঘির ধারে দাঁড়িয়ে অঞ্জন বলল, ‘দীঘিটা তো অনেক বড়, এত বড় দীঘির মাঝখানে একট দ্বীপ হলে কেমন হয়? ওখানে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা প্রকৃতি থাকতে পারে। যা খুশি জন্মাক আপন ইচ্ছামতো, সেগুলোকে যত্ন করলেই হবে।’
নীলিমার খুব পছন্দ হলো প্রস্তাবটা, ‘বাহ, চমৎকার প্রস্তাব, দ্বীপ করা যাবে, তুমি ওখানে বসে নেচারের ফটোগ্রাফিও করতে পারবে। তবে কেউ যেন না বলে, মেয়েদের ছবি তুলছ তুমি, তাতে আমাদের কারোই মান-সম্মান থাকবে না। যে অসুবিধার কারণে দীঘি খনন করা হচ্ছে সেটাই যদি দূর না হয় তাহলে আর সাত গাঁয়ের মানুষ মিলে এত কাণ্ড কেন।’
– ‘হ্যাঁ তা তো অবশ্যই দেখতে হবে, দ্বীপের মাঝখানে একটা ছোটখাট টংঘর বানালে কেমন হয়?’
– ‘না ওখানে কিছুই থাকবে না, শুধু আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা প্রকৃতি থাকবে। টং তৈরি হলে তুমি ঐ টংঘরে গিয়ে উঠবে। মেয়েরা গোসল করতে পারবে না, বিচার দেবে আমার কাছে এসে।’
– ‘না না, এমন হবে না, তোমার সম্মান রক্ষা করা এবং তোমাকে সাহায্য করা আমার কর্তব্য বলেই মনে করি। এত শত লেবারদের পেমেন্ট করা একাকী ঝুমকির পক্ষে খুব কষ্টকর, দিন দিন লেবারের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।’
– ‘হ্যাঁ, লেবার বাড়লে তাড়াতাড়ি দীঘি কাটা শেষ হয়ে যাবে, সেটা ভাল। তবে ঝুমকিকে জিজ্ঞেস করে নিও একবার।’
– ‘তোমার প্রস্তাবের পাশাপাশি আমি আরেকটা বিষয় নিয়েও ভাবছি অঞ্জন, মাছের কথা। স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেয়া পাঁচমিশালি মাছ দিয়েই দীঘি ভরাট হতে পারে। পানি হলেই মাছ হবে জলাশয়ে, তারপর সেগুলোকেই যত্ন করা, রক্ষা করা।’
– ‘পানি হলেই মাছ হবে না কি জলাশয়ে, সেগুলো আসবে কোত্থেকে?’
– ‘হ্যাঁ হবে, মাছের ডিম বহু বছর মাটির নিচে থাকতে পারে, বৃষ্টি হলে সেসব ডিম ফুটেই মাছের জন্ম হয়।’
– ‘খুবই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে আমার।’
– ‘আফ্রিকার মরুভূমিতে পরী-চিংড়ি মাছের ডিম ১০০ বছরের বেশি টিকে থাকে অঞ্জন, বাংলার পরিবেশে মাছের ডিম টিকে থাকার কোনো সমস্যাই দেখি না। রাক্ষুসে তিলাপিয়া, গ্রাস কার্প আর গজার মাছ রাখতে চাই না আমি দীঘিতে। দীঘির একপাশ সামান্য খুলে রাখলে বর্ষায় মাছ এসে দীঘিতে আশ্রয় নেবে, তারপর নিরাপদে বংশ বিস্তার করতে পারবে।’
– ‘কিন্তু দীঘিতে সাবান দিয়ে গোসল করলে কিছু মাছ একদম টিকবে না।’
– ‘হ্যাঁ তা ঠিক, এখানকার গ্রামের মেয়েদের অনেকেই প্রাকৃতিক এঁটেল মাটি দিয়ে চুল শ্যাম্পু করে, তাতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সাবান দিলে দীঘির বাইরে, জল তুলে নিতে হবে উপরে।’
– ‘দীঘির পাড় দিয়ে হেঁটে যাবে অনেক মানুষ, তারা জলে না নামলেও কিন্তু মেয়েদের দেখতে পাবে।’
– ‘না না, সে সুযোগ থাকবে না, কারণ দীঘির চারদিকে বিশফুট চওড়া করে বেড়া হিসাবে লাগানো হবে হাজার কয়েক কলাগাছ, যেখান থেকে গ্রামবাসীদের কিছু খাবার জুটবে, শুধু দীঘি কাটলেই তো আর তাদের মূল সমস্যার সমাধান হলো না।’

বছর দুয়েকের মধ্যেই জমে উঠেছে দীঘির প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট স্নান-পর্ব। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে দীঘি দেখতে কিন্তু বাইরে থেকেই যতটা দেখতে পায়। দীঘির প্রবেশপথে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে- ‘নারী সায়র’ যা কেবল নারী ও শিশুদের জন্য ব্যবহার্য। এই মহতী কাজের জন্য নীলিমা চৌধুরীকে এলাকার সবাই এখন ‘দীঘিমা’ বলে ডাকে। আমিও তাকে সম্মান করে দীঘিমা ডাকতে চেয়েছি কিন্তু তিনি ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বলেছেন, ‘আমি সবার মা হতে চাই না জয়নুল।’
নারী সায়র ও দীঘিমার গল্প এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু আরেকটু বিস্তার না করলে কিছু বিষয় উহ্য থেকে যায়, কাহিনীর কিনারা হয় না। আমার সঙ্গে দীঘির সম্পর্ক ক্ষীণ হলেও দীঘিমার সঙ্গে আমার পরিচয় লেখক হিসেবে। ঢাকার কোনো এক চিত্রশালা থেকে আমাদের নৈকট্য। নারী সায়রের মাটি কাটার জন্য একজন ঠিকাদার ঠিক করে দিয়েছিলাম আমি, যিনি আমার এক নিকট গ্রামীণ বন্ধু। দীঘি নির্মাণ শেষে সেই বন্ধুর সঙ্গে আমি একবার নারী সায়র দেখতে গিয়েছিলাম, দীঘিমা তখন ছিলেন না। সময়টা ছিল গড়ানো দুপুর, মেয়েদের স্নানের সময়। চারদিকে কলাগাছ ঘেরা দীঘির মাঝখানের দ্বীপটা তখন ঘন সবুজ হয়ে উঠেছে। ধুপধাপ পায়ের আঘাতে রঙধনু তুলে সেই দ্বীপের দিকে সাঁতরে যাচ্ছে মেয়েরা। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আমাদের পাশ কাটিয়ে স্নানের জন্য নিচে নেমে গেলো দুজন বয়স্ক গ্রামের মহিলা। আমার চোখ পড়লো একটি সাদাকালো সাইনবোর্ডের উপর, ‘পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ।’ এরপর আর বেশিদূর ভেতরে প্রবেশ করতে ইচ্ছে হয়নি আমার, কৌতূহল-ক্লিষ্ট মন নিয়ে দীঘির গেইট থেকেই ফিরে এসেছি সেদিন।
ঢাকা ধানমণ্ডির এক আর্ট গ্যালারিতে দীঘিমার সঙ্গে গিয়েছি আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখতে। প্রাকৃতিক পরিবেশের অসাধারণ চিত্রসংবলিত গ্যালারিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি সব। মনে মনে তৈরি হচ্ছি চিত্র-সমালোচনা লেখার জন্য। দেয়ালের শেষপ্রান্তে দর্শকের দারুণ ভিড়। ভিড়ের মধ্যে একটু ঠাঁই করে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল বিরাট ক্যাপশন ‘স্নান-পর্ব।’ বাঙালি মেয়েদের খোলামেলা স্নানের ছবি দেখতেই ভিড় করেছে মানুষ। কিন্তু এসব ছবি ফটোগ্রাফার তুললো কীভাবে, সেটা নিয়ে ভাবছি আমি। একটি ছবি দেখিয়ে দীঘিমা আমাকে বললেন, এই মেয়েটি সম্ভবত আমাদের গ্রামের মেয়ের। দীঘিমা চিন্তাক্লিষ্ট, অঞ্জন কি তাহলে দ্বীপের ভেতরে লুকিয়ে থেকে এসব ছবি তুলেছে!
দীঘিমার দিকে তাকাতেই উনি বললেন, এসব নারী সায়রের ছবি। ছবি দেখা শেষ করে উনি শিল্পীর সন্ধানে আমাকে নিয়ে চলে গেলেন ইনফরমেশন ডেস্কের কাছে। সেখানে অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত আলোকচিত্রী অঞ্জন চৌধুরী, তার পাশেই উপবিষ্ট বাসন্তি শাড়ি পরা ঝুমকি নামের মেয়েটি।