নারী নিজেই আগে নিজেকে মানুষ ভাবুক

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
45

নতুন বছরের শুরুটা দেশের বাইরে কাটিয়ে ফেরার পর আভ্যন্তরীন রুটের বিমানে উঠে ঠিকঠাক মতো বসার আগেই তৃষ্ণার্তের মতো তুলে নিলাম দুটো বাংলা দৈনিক। খুলতেই চোখে পড়লো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের ও প্রতিবাদের ছবি। ছবির খবরটা দ্রুত জানা হয়ে গেল। এতো নতুন কিছু নয়। নিত্যদিনের খবর। তবুও মনটা বিষাদে ভরে গেল। ভেবেছিলাম ধর্ষণ নামে এই বীভৎস শব্দটি আর উচ্চারণ করব না। লিখবও না। কিছুদিন বন্ধ রাখলাম লেখালেখি।
লিখতে বসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েটির কথাই মনে আসলো। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে দেশ। সেই উন্নয়নের সাথে নৈতিক অধঃপতনের ব্যারোমিটার নীচের দিকে নামছে তো নামছেই! অন্য সব বাদ দিয়ে যদি শুধু নারীশিশুর নির্যাতনের ব্যাপারটা সামনে আনি তাহলে বলতে হবে ভয়াবহ অবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে রেপ করা হয়েছে পরিস্থিতি বোঝার জন্য এ খবরটাই যথেষ্ট। মজনু নামের রাস্তার এই কীটটা ধর্ষণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে, ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি আসে। বেশ কিছুদিন আগে একজন মায়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলাম পাঠকদের সাথে। চিকিৎসক মায়ের চিকিৎসক মেয়ে। বিসিএস করে সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তিত মা। মেয়ের পছন্দ না থাকায় মা পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলেন পত্রিকায়। তিনি ভেবেছিলেন উপযুক্ত পাত্র পাওয়ার জন্য এটাই সহজ পদ্ধতি। কিন্তু পাত্র হিসেবে একজনের পরিচিতি পেয়ে তিনি আঁতকে উঠলেন। তারপরেও পরম ধৈর্য ধরে তাকে প্রশ্ন করলেন একজন সেলসম্যান হয়ে একজন চিকিৎসক পাত্রীর জন্য সে কীভাবে নিজেকে উপযুক্ত মনে করলো। তার উত্তর ছিল সে পুরুষ। আর পুরুষ বলেই সে সব সীমানা অতিক্রম করার যোগ্যতা রাখে। তার পৃথিবী অবারিত। মজনুও পুরুষ।
নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মূলে রয়েছে পুরুষের ক্ষমতা ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক সময় দেখা যায় নারীরা নিজেরাই তাদের অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিকটিম মেয়েটি সাহস করে ঘুরে দাঁড়ালেই মজনু নামের কীটটা এতটা দুঃসাহসী হয়ে উঠতো না। মেয়েদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। তার ভেতরের শক্তিকে অনুভব করতে হবে। প্রতিরোধে সামর্থ্য অর্জনের বিকল্প নেই। মজনু ভবঘুরে। সে সহজে ধরাও পড়েছে। ক্ষমতাধর কীটগুলো ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। বিত্ত বৈভবের আড়ালে চলে যায় তাদের পাপ কার্যগুলো। আইনের রক্ষকেরাও তাদের সুরক্ষা দিয়ে থাকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে আর কতদিন ধর্ষিতার আর্তনাদে বাতাস ভাবী হয়ে থাকবে? কি করণীয়? মোটা দাগে যে কথাটি মানুষ বিশ্বাস করে এবং বাস্তবতা সেটা হচ্ছে আইন-কানুন যাই থাকুক অপরাধীর বিচার হয় না। কঠোর আইন, প্রচার-প্রচারণা ও উচ্চ আদালতের নানা ধরনের নির্দেশনার পরও নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো যাচ্ছে না। ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটে তার বিরাট একটা অংশ মিডিয়াতে আসে না। মামলা তো দূরের কথা। আর যেগুলোর মামলা হয় তার শতকরা হিসেবে মাত্র তিনভাগ অপরাধী শাস্তি পায়। তাছাড়া আমাদের সমাজে অনেক উপাদান বিদ্যমান যা ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতাকে উসকে দেয়।
শুধু আইন থাকলেই হবে না, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনা প্রয়োজন। এছাড়া সাইবার স্পেসে নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নারীকে মানুষ ভাবতে হবে। আমাদের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও পরিবারে সমান অধিকারের ব্যাপারটা মানা হয় না। তাছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতার এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে আমাদের সমাজে। এটা অস্বীকার করার জো নেই। শতকরা ৮৪ জন স্বামী বিশ্বাস করে স্ত্রীকে শাসন করার অধিকার স্বামীর রয়েছে। প্রায় নারীরাও তা বিশ্বাস করে।
অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা, পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করা ও পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার বিকল্প নেই।
এছাড়া সমাজ ব্যবস্থায় বা পরিবারের কারণে এমন মানসিকতায় বেড়ে ওঠে যে নারীরা দুর্বল এবং তাদের ওপর অত্যাচার করা যায়। এটা বাংলাদেশে বাস্তবতায় নতুন কিছু নয়, আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পুরুষকে শক্তিশালী আর নারীকে দুর্বল হিসেবেই দেখা হয়। কিছুদিন আগে একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়। এদের ৭২ শতাংশ সেটি প্রকাশ করে না।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বা মূল্যবোধের অভাবের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট ও চিলড্রেন্স চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষে দায়ের করা এক রীটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট অ্যান্টি রেপ ডিভাইস ব্যবহার একই সঙ্গে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের হাত থেকে নারীদের রক্ষা করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে সরকারের উপর রুল জারি করেছে আদালত। নারীদের জন্য স্বয়ংক্রিয় অ্যান্টি রেপ ডিভাইস সহজলভ্য করার নির্দেশও দিয়েছে হাইকোর্ট। সম্মিলিত উদ্যোগ ও ব্যাপক সচেতনতা ছাড়া এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না।
সবচেয়ে বড় কথা দুর্বলতা নয়, কান্না নয় নারীর ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। নারী নিজেই আগে নিজেকে মানুষ ভাবুক। তার ভেতরের শক্তিকে অনুভব করুক।