নারী জাগরণের অগ্রদূত

শামীম আরা লুসি

সোমবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ

মুসলিম সমাজের নারীবাদী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের সাথে মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার নাম গভীরভাবে জড়িত। তিনি তাঁর প্রায় সবটুকু সময় উৎসর্গ করেছেন নারী শিক্ষা ও নারী মুক্তি সাধনায়।
আজ ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবস। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবস। অসাধারণ প্রতিভা এবং ব্যক্তিত্ববলে নিপীড়িত বাঙালি মুসলিম নারী সমাজকে তিনি দিয়েছিলেন আলোর সন্ধান। সামাজিক কুপ্রথা, কুসংস্কার ছিন্ন করে মুসলমান নারীর মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রেখেছেন বেগম রোকেয়া। বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্যায়ে নারী মুক্তি কামনা করে লেখনীর মাধ্যমে সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করে তুলেন। সমাজ ও জাতির কল্যাণের নিমিত্তে নারীর শিক্ষিত ও সচেতন হওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা রযেছে। নারীর মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হওয়া আবশ্যক। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির অপরিহার্যতা এবং নারীর মানসিক দাসত্বের অবসান যে একান্তভাবে কাম্য তার চিন্তা চেতনার মধ্যে এসব কথা প্রতিফলিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে বেগম রোকেয়া সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তিনি তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর ভাগলপুরে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে তিনি সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন নারীমুক্তির লক্ষ্যে। কিন্তু তাঁর পারিবারিক সদস্যদের ছিল বিলাসিতা ও অপব্যয়, বহু বিবাহ উর্দু ভাষার প্রতি অনুরাগ। মাতৃভাষার প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব এবং নারী শিক্ষার প্রতি বিরোধীতা।
বেগম রোকেয়া চার সমকালীন সময়ে অত্যন্ত বেদনা ভরা মন নিয়ে জীবন ও প্রতিপক্ষের সঙ্গে আপোষ করেছেন। নির্যাতিত, নিগৃহীত, উপেক্ষিত নারী সমাজের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সাধনই ছিল বেগম রোকেয়ার জীবনের ব্রত। এ উদ্দেশ্যকেই সামনে রেখেই তিনি লেখনীর সাহায্যে তাঁর চিন্তা চেতনাকে সমাজে তুলে ধরেছেন। বিচিত্র জীবনের ঘটনা বহুল সংঘাতে বেগম রোকেয়া নিরন্তর সাহসী যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা ও বিপর্যয়কে তিনি মেনে নিয়েছিলেন। আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা ও প্রগতি চিন্তার সাথে তাঁর নিবিড় যোগসূত্র ছিল। মানব প্রকৃতি ও চিন্তাসূত্রে তিনি নবজাগরণের মর্মবাণীকে আত্মস্থ করেছিলেন। ধৈর্য্য, সহানুভূতি, কল্যাণ, প্রেম এবং মানবতা দিয়ে তিনি যাবতীয় কঠিন পরীক্ষায় মোকাবেলা করেছিলেন। এসব কারণে যুগ যুগ ধরে এ বিদূষী নারী অমর হয়ে থাকবেন। শত বছর আগে পর্দার আড়ালে থেকেও বেগম রোকেয়া যে কথা বলে গেছেন আজ শত বছর পরেও এদেশের নারী আন্দোলন একই পথে চলছে। তিনি চেয়েছিলেন সঠিক নির্দেশনা দিয়ে অধিকার বঞ্চিত নারী সমাজকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে আলোকিত জীবনে ফিরিয়ে আনতে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর থেকে প্রায় দ্বিগুণ বয়সী পাত্র সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সমকালীন সময়ের তুলনায় তাঁর বিয়ে হয়েছিল বেশি বয়সেই। দাম্পত্য জীবনে বেগম রোকেয়া নিতান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রবঞ্চিত হলেও স্বামী প্রদত্ত দশ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি অবরোধবাসিনী মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন শিক্ষার পথকে। ১৯৯০ সালে স্বামীর মৃত্যু হলে নিঃসন্তান রোকেয়ার সকল সাংসারিক বন্ধনের পরিসমাপ্তি ঘটে। মূলতঃ স্বামীর সান্নিধ্যে বেগম রোকেয়া হয়তো পৈত্রিক পরিবারের সংকীর্ণতা থেকে কিঞ্চিৎ মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুতে সর্বাত্মক নারী মুক্তি সাধনায় সামজিক কুসংস্কারের উচ্ছেদ সাধনে এবং নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে তিনি পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন। পুুরুষের কাছে দয়া বা করুণা ভিক্ষা করে নয়; পুরুষের আধিপত্য ও দুঃশাসনের প্রতিবাদ করে অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা প্রকাশিত হয়েছে বেগম রোকেয়ার সাহিত্য কর্মে। আজকের এই দিনে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায়। নারী সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার নাম।
লেখক : সাংবাদিক; সহ সম্পাদক, দৈনিক আজাদী

x