নারী কি একজন স্বাধীন মানুষ?

শিউলি শবনম

শনিবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ at ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ
30

বেনাপোল বর্ডারে আমার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রথম প্রশ্ন করলেন:
‘আপনার সাথে পুরুষ অভিভাবক কে আছে?’
‘কোনো অভিভাবক নাই।’
‘পুরুষ কে আছে, কার সাথে যাচ্ছেন?’
‘আমার টিমমেটরা আছে।’
‘আপনি দেশের বাইরে যাচ্ছেন, আপনার হাজব্যান্ড জানেন?’
তার অসভ্যতায় খুব রাগ হলেও চেপে গেলাম। এবার বললেন, ‘আপনি তো চাকরিজীবী। আইডি কার্ড দেখান।’ আইডি কার্ডে আমার সাংবাদিক পরিচয় জেনে অবশ্য তার মন নরম হয়ে যায় মুহূর্তেই। এতক্ষণ ধরে আমাকে করে চলা হ্যারাসমেন্ট পাল্টে যায়। ‘আপনাকে টেলিভিশনে দেখা যায় তাহলে?’ পাসপোর্ট এগিয়ে দিতে দিতে শেষ প্রশ্ন তার। আমি ঠোঁটে ভদ্রতার হাসি টেনে দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াই।
আমরা গত ডিসেম্বরে কোলকাতায় গিয়েছিলাম একটা রানিং ইভেন্টে অংশ নিতে। আমার ২২ বছর বয়সী টিমমেট আনিন, সাকিব কারোই কিন্তু ইমিগ্রেশন পেরুতে কোনো অভিভাবকের খোঁজ পড়েনি। কিন্তু ৩২ বছরের প্রাপ্ত বয়স্ক এক নারীর দরকার পুরুষ অভিভাবক। ঠিক কী কারণে সমাজে এ জেন্ডার রোল তৈরি হয়েছে? বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে? উত্তর সবার জানা। কোনো নারীকে স্বাধীন মানুষ হিসেবে দেখতে বা ভাবতে এ-সমাজ এখনো তৈরি হতে পারেনি।
মানুষকে শরীর চর্চায় অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি একটি অ্যাথলেট কমিউনিটি গড়ে তুলতে গত কয়েক বছর ধরে ‘ঢাকা হাফ ম্যারাথন’ একটি আন্তর্জাতিকমানের গোছানো, পরিচ্ছন্ন রানিং ইভেন্টের আয়োজন করে আসছে। ২০২০ সালের প্রতিযোগিতাকে ঘিরে এবার একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। যেখানে উইমেন হরলিকসের সৌজন্যে ২০০ নারী রানারকে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্টে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ এনে দিয়েছে।
এই ঘোষণা আসার পর থেকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করি। আমাদের অনেক রানার বন্ধু দারুণ সব রসিকতা শুরু করেছেন এই ঘোষণায়। কেউ লিখছেন, ‘নারী হলে ভালো হতো, নারী সেজে রেজিষ্ট্রেশন করবো।’ কেউ বলছেন,‘নারীদের সমান অধিকার কোথায় গেল এখন?’ আবার কেউ বলছেন, ‘এই অফারতো নারীদের নেয়া উচিত না, তাদের নারীবাদ আছে না!’ কেউ আরো কয়েক ধাপ উপরে নানান হাস্যরসে নিজের টাইমলাইন ও রানিং পেজগুলো ভরিয়ে তুলছেন।
এইসব প্রশ্ন যারা তুলেছেন, আমি ধারণা করতে পারি তারা কেউই বোঝেন না ‘সমানাধিকার’ শব্দটার ওজন কতটুকু, এর সঠিক মানেটা ঠিক কী? সমানাধিকার বলতে আমরা অধিকাংশই বুঝি, পুরুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে মূত্র বিসর্জন করতে পারে, নারী কি সেটা পারবে? কিংবা পুরুষ রাস্তায় শার্ট খুলে হাঁটতে পারে , নারী কি সেটা পারবে? এমন উদ্ভট যুক্তি।
একটা অসম সমাজ ব্যবস্থায়, আপাদমস্তক লিঙ্গ বৈষম্যের রাজনীতি, পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের ভেতর বেড়ে ওঠা যেসব নারী কঠিন পথ পেরিয়ে, সমাজের নোংরা মন্তব্য হজম করে আজ দেশের রানিং জগতে তাদের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখছেন তাদের আপনারা শেখাতে চাইছেন ‘সমান অধিকার!’ উইমেন হরলিঙ নারী রানারদের প্রণোদনা দিতেই এ-উদ্যোগ নিয়েছে নিঃসন্দেহে এবং ঢাকা হাফ অনিন্দ্য এই প্ল্যাটফর্মটা তৈরি করে দিয়েছে নারীদের।
আচ্ছা বলুন, দেশে নারীদের রানিংয়ে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস কত পুরনো? এখনোতো প্রতি ভোরে প্র্যাকটিসে বেরুলে শুনতে হয়, ‘এটা মেয়ে না ছেলে? ছি ছি লজ্জা শরম কিছু নাই। রাস্তায় রাস্তায় ছেলেদের মতো দৌড়ায়!’ এখনো দেশের বাইরে যেতে ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে অযাচিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নারীকে ‘আপনি বাইরে যাচ্ছেন, আপনার পুরুষ অভিভাবক কই?’ নারীকে সম্পূর্ণ মানুষ ভাবার দৃষ্টিভঙ্গি কি এখনো গড়ে উঠেছে এই সমাজে? তো এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ঠিক কত শতাংশ নারী রানিং কমিউনিটিতে যুক্ত হতে পারছে? কত শতাংশ নারী সমাজ ও পরিবারের চাপে, বাধার মুখে মুচড়ে না পড়ে শিরদাঁড়া সোজা রাখতে পারছে? হাতেগোনা কিছু সংখ্যক মাত্র। রানিং কমিউনিটিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ঢাকা হাফ যদি এমন চমৎকার উদ্যোগ নিয়ে আসে তাকে সাধুবাদ জানান। তাকে ঘিরে রেসিস্ট কথাবার্তা এবার অন্তত বন্ধ করুন ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কথা হলো, বর্তমানে রানিং কমিউনিটিতে এমন অনেক নারী আছেন, যারা অনেক পুরুষের চেয়ে ভালো দৌড়ান। মূল বিষয় হলো অনুশীলন। যিনি নিয়মিত অনুশীলন করবেন, লেগে থাকবেন তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছাবেন। তিনি নারী বা পুরুষ যেই হোন। এতে কোনো সন্দেহ নাই। আমার কোনো কোনো ছেলে রানার বন্ধুকেও রাস্তায় পথচারীর বাঁকা মন্তব্য শুনতে হয়, ‘কী দৌড়ায়, মেয়েদের সাথে পারে না!’ আমার খালি করুণা হয় সেসব লোকের জন্য। যারা সব যুক্তি তর্কের উর্ধ্বে গিয়ে বিশ্বাস করে এ সমাজে পুরুষের জন্মই হচ্ছে এগিয়ে থাকার জন্য, সামনে থাকার জন্য, নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। কিন্তু যারা রানিং কমিউনিটিতে আছেন তারা সেসব অসচেতন, সাধারণ লোকজনের মতো ব্যবহার করবেন, চিন্তা চেতনা ধারণ করবেন সেটা আমরা আশা করি না।
বাসে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রাখা নিয়ে এখনো নিয়ম করে নারীবাদীদের গালাগাল শুনতে হয়। যেদিন নারীরা দাঁড়িয়ে গেলে যৌন নিগ্রহের আতংক থাকবে না, এ সমাজ নারীকে যৌনবস্তু না ভেবে শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখবে, তখন সংরক্ষিত আসনের দরকার পড়বে না। একইভাবে যেদিন রানিং জগতে কোনো দ্বিধা ছাড়া, সামাজিক, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়া বিপুল সংখ্যক নারী যুক্ত হতে পারবে সেদিন এমন প্রণোদনামূলক কোনো উদ্যোগেরও দরকার পড়বে না।
যারা এমন উদ্যোগে হাস্যরস খুঁজে পেয়েছেন, তাদের জানা দরকার, সমান অধিকার মানে হলো, লিঙ্গ সমতা। মানে আপনি পুরুষ হয়ে কোনো কষ্ট ছাড়া, পরিশ্রম ছাড়া স্বাভাবিকভাবেই যা অর্জন করেন, একজন নারীরও তা একইভাবে পাওয়ার অধিকার আছে। এই যে আপনি প্রতি ভোরে দৌড়ের জন্য আরামদায়ক হাফ প্যান্ট ও পাতলা টিশার্ট বা স্পোর্টস জার্সি পরে দৌড়াতে বের হন, বিপরীতে একজন নারী রানারকে কী কী মেনটেইন করতে হয় একবার ভাবুনতো? এরপর খুব চমৎকার অনুশীলন শেষে বাসায় ফিরে পরিবারের অন্য সদস্যের তৈরি করা স্বাস্থ্যকর নাস্তা খেয়ে কর্মস্থলে যান, বিপরীতে একজন নারী রানারকে কী কী করতে হয় তা আরেকটু ভাবুন। আমি বলছি না রেডিমেড খাবার পাওয়া নারী রানারের অধিকার, আমি বলছি, নারীর জন্য সহজ পথ এখনো তৈরি হয়নি। সমতা বহুদূর। এখনো পুরোদস্তুর বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা। তাই রানিং কমিউনিটিতে নারীকে ঘিরে সব ধরনের রেসিজমের অবসান হোক। আরো বেশি নারী যুক্ত হোক এই সুন্দর পথ চলায়।
রানিং, সাইক্লিংসহ বিভিন্ন ইভেন্টে নারী-পুরুষ উভয়ই অংশ নিলেও এখনো পুরুষের ছবিযুক্ত মেডেল তৈরির ধারণা থেকে বেরুতে পারেনি অনেক আয়োজক। যেন অ্যাথলেট বলতেই কেবল সুঠাম, বলিষ্ট, পেশীবহুল, গতিসম্পন্ন কোনো পুরুষের ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে না উঠে। একই দৃশ্যপটে আমরা যেন নারীকেও দেখতে পাই।