নারী ও পুরুষে সমতা

শনিবার , ১৪ মার্চ, ২০২০ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
125

‘ঊধপয ভড়ৎ বয়ঁধষ্থ এ-প্রতিপাদ্যে ছিল এবারের ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। ১৯৭৫ সাল থেকে প্রতি বছরে একেকটি’ প্রতিপাদ্যে জাগরণের বার্তা নিয়ে আসে এ দিবস- পেছনে আছে সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয় মহীয়সী নারী কল রাজেটকিনসহ সব সংগ্রামী নারীদের। তবে এ দিবস পালনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একটিই- ‘সমতার পৃথিবী’-সভ্যতার শুরু থেকে নারী ও পুরুষের যৌথ প্রয়াসে সমাজ ও রাষ্ট্রের যে বিকাশ সেখানে নারী ও পুরুষের সমতাই আনবে সার্বিক উন্নয়ন ও শান্তি। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের এর ৫ নম্বর লক্ষ্য হচ্ছে চষধহবঃ- ৫০-৫০। কিন্তু আমরা কতোটুকু এগিয়ে যাচ্ছি এ লক্ষ্যে!
ইতিহাসের আলোকে ফরাসী বিপ্লবের আদর্শ ছিল সাম্য মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে নারীরা ১৭৮০ এর দশকের শেষ দিকে সমনাধিকারের দাবি করেছিলেন পরবর্তীতে ধাপে ধাপে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি সামনে চলে এল। দেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি জাতক স্বাধীন, নারী ও পুরুষে নেই কোন ভিন্নতা। কিন্তু একুশ শতকে এসেও অর্জিত হয়েছে কি নারী ও পুরুষে সমতা! শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের কোনও দেশেই শান্তিতে সহাবস্থানে নিরাপদে এবং সার্বিকভাবে এখনো নারীর পরিপূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন রূপ প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় নারী ও মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের সংবাদ, যৌতুকের কারণে হত্যা বা আত্ম হত্যায় প্ররোচিত করা শুধু তাই নয়- সহিংসতা যেমন পরিবারে তেমনি কলকারখানায় মাইনোপিস সংযোজন করতে গিয়ে অকালে চোখের দৃষ্টি হারানো বা বৈদেশিক মুদ্রার অর্জনে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত নারীর যৌন দাসত্ব বা তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ভূমি মালিকানায় অধিকার হারানোসহ নানাভাবে নিপীড়িত নারীর আর্তনাদ দেশের অনাচে-কানাচে।
মনে করিয়ে দিতে হয়- সমাজে একদিন নারীদেরই আধিপত্য ছিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হল পুরুষের আধিপত্য এবং চাপিয়ে দেওয়া হল কিছু নিয়মের অনুশাসন-বিধিনিষেধ আর সংস্কারের শেকলে বন্দী হল নারীর জীবন। যে কারণে এখনো নানা প্রকার বৈষম্য ঘরে, নগর-গ্রাম-বিভাজনে, শিক্ষায় ও চাকরি ক্ষেত্রে সমান সুযোগ লাভে সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর দারিদ্র, বিনামূল্যে গার্হস্থ্য শ্রম একই সাথে নিরাপত্তার অভাবে সর্বক্ষণ তাদের ওপর অদৃশ্য এক ভয়াল থাবা। বিশ্ব ব্যাংকের সম্প্রতি ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে নারী বৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের স্কোর ৪৯.৩৮ শতাংশ যা হতাশাব্যঞ্জক। যদিও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীর অবদান অনেক।
বিবিসির এক জরিপে বলছে- “নারী ও পুরুষে মজুরি বৈষম্য কমলেই বাঁচবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার। অপরদিকে ভূমি ব্যবহার ও মূলধন প্রাপ্তিতেও তাদের প্রবেশাধিকার নেই যেমন তেমনি নারীর সস্তা শ্রমকেও শোষণ করা হচ্ছে।
নারী ও পুরুষে সমানাধিকার থাকা উচিত সবাই মানেন কারণ সমাজ গঠনের দায়-নারী ও পুরুষের উভয়ের সমাজ যদি কোনও পাখির শরীর হয় তবে নারী-পুরুষ তার দুই ডানা। তাহলে সংকট কোথায়! মানতে দ্বিধা কেন? তবে একটি ভাবনা ঘুরপাক খায় সেটি হল চিন্তার সংকট। তথা চিন্তাবদ্ধতা। বিপরীতে বলি চিন্তার স্বাধীনতা। “চিন্তার স্বাধীনতা হল- যাকে বিবেকের স্বাধীনতা ও বলা হয় তথা একজন ব্যক্তির অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা করে কোনও সত্য, দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তাভাবনা ধারণ বা বিবেচনা করার স্বাধীনতা।
চিন্তার মুক্তি না ঘটলে সমতা বা মুক্তি আসাটা সহজ হবে না। যদিও জানি অতি বেশি চিন্তার স্বাধীনতার কারণে খনার জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছিল এবং আরো আছেন অনেক মহীয়সি নারী আবার অবরোধবাসিনী হয়েও বেগম রোকেয়ার চিন্তার স্বাধীনতা খুলে দিয়েছে নারীশিক্ষা তথা জাগরণের দুয়ার। স্বীকার করতেই হবে শিক্ষায় উন্নয়নে বা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জিং পেশাসহ সার্বিকভাবে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে দৃপ্ত পায়ে। তবুও চিন্তার স্বাধীনতায় এখনো অনেকে নিজেকে মানুষ না ভেবে ভাবি নারী- অতএব সমস্যাও কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে ‘একটি’ শব্দে’ হচ্ছে না ব্যক্তিক আমরা জানি- পারিবারিক-সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী নানা কারণে নির্ভরশীল কিন্তু নির্ভরতা ও স্বাধীনতা শব্দ দু’টি ভিন্নার্থক দুই সমান্তরালে অবস্থিত কারণ স্বাধীনতার অপর নাম স্বনির্ভর। ‘স্বনির্ভর’ হওয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও মননে পরাধীন তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতামত প্রদানে এখনো পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শৃঙ্খলিত। এক্ষেত্রে অনেকে নিজের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিষয়ে সঠিক উপলদ্ধির ক্ষেত্রেও রয়েছে। সীমাবদ্ধতা হয়তোবা নিজেদের অজান্তে আমাদের মনমানসিকতায়। যেমন সামাজিকভাবেও অনেকে কেন যেন নিজেকে অন্যের ক্রীড়নক করে ফেলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে নিজেদের ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এখানে বলতেই হয় সৃষ্টিগতভাবে নারীর ভেতরে একটা বন্ধন থেকেই যায়-চিরকালীন সংস্কারের বন্ধন, প্রকৃতিদত্ত মমতার বন্ধন, হৃদয়গত দুর্বলতার বন্ধন-আর মহিমান্বিত হয়ে থাকার ভাবমূর্তি তো আছেই- সেটি ধরে রাখার জন্য ত্যাগের পরিশ্রমের ও অভিনয়ের অন্ত নেই। স্ব-নির্ভর মেয়ে অনেক থাকলেও স্বয়ংসম্পূর্ণ মেয়ে দুর্লভ। এক্ষেত্রে আত্মিক মুক্তির কথা যদি বলি তাহলে তা আদায়ের চাইতে বেশি অর্জনের। ‘অধিকার ও মর্যাদাবোধ’ গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই যে চিন্তার স্বাধীনতার কথা এল এটি নারীকে অর্জন করতে হবে নিজস্ব মেধায়ত্ত যোগ্যতায়। কোনভাবেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে নিজেকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে নয়। একই সাথে চিন্তার স্বাধীনতার সমতা থাকতে হবে নারী ও পুরুষের উভয়ের।
নারীর রয়েছে অসীম ক্ষমতা শারীরিকভাবে দুর্বলতার কথা বলা হলেও আসলে কি তাই! শুধু মাতৃত্বের কথাই বলি। অপরিসীম সহ্য ক্ষমতা। মাতৃত্বের সব কষ্ট নিয়েও ঘরে ও বাইরে শ্রম-মেধা সময় দেওয়া আর সন্তান লালনপালনসহ গৃহ ব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রাখছে নারীই। সংগ্রামে আন্দোলনে নারী তো দু’হাতে সামলিয়েছে একদিকে পরিবার অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার কিন্তু একই সাথে পুরুষের সহযোগী হয়ে সমানভাবে থাকায় বারে বারে উপেক্ষিত। নারী ও পুরুষে সমতা অর্জনে প্রথমত পরিবারের ভূমিকা সবচাইতে বেশি। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার উর্ধ্বে মানবিকতার আলোকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে নারী ও মেয়ে সন্তানকে। নারীর প্রতি থাকতে হবে শ্রদ্ধাবোধ একই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রকে হতে হবে নারীবান্ধব একসময় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বলা হতো নারীর সমতা অর্জনের অন্যতম উপায় এখন এক্ষেত্রে শুধু এটি একমাত্র নয় বরং মানব মর্যাদা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে জেন্ডার বৈষম্য দূর করতে হবে এক্ষেত্রে জাপান ও চীনে তথ্য প্রযুক্তির বৈপ্লবিক উন্নয়ন হলেও এখনো নারীদের নেতৃত্বের বিকাশের চাইতে সনাতন ভূমিকা পালন করার মূল্যবোধেই বিশ্বাসী। চাকরিজীবী নারীদের ঐ দেশে গৃহকাজে এগিয়ে আসতে হয়।
নারীর আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, বাজার তথ্য অবহিতকরণ বাজার সংযোগ স্থাপন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার। নারীর প্রতি বৈষম্য কিন্তু বৈশ্বিক সমস্যা যেটির কারণে জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্ধ লক্ষ্যমাত্রার আটটি লক্ষ্যের মধ্যে দু’টিই ছিল নারীর উন্নয়ন সক্রান্ত । আর তৃতীয় লক্ষ্যটি লিঙ্গ সমতার উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের পঞ্চম লক্ষ্য লিঙ্গ সমতার সাথে সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন যেটি করবে রাষ্ট্র ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসকিতার ইতিবাচক পরিবর্তন। নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত অর্জন পরিকাঠামো গঠন করা। নারী-পুরুষে সমতার লক্ষ্যে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপূর্ণ সক্ষমতা অর্জনের বিকল্প নেই। যদিও সক্ষমতা অর্জন একটি বহুমাত্রিক ও তাত্ত্বিক শব্দ- যখন ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞান উপযুক্ত পরিবেশে প্রয়োগ করা যায়। শুধু তখনই সক্ষমতা বিকশিত হতে পারে।
পরিশেষে বলতে হয়- সমতার পৃথিবী অর্জনের দায়িত্ব সবার সামগ্রিক কল্যাণে একে অপরের সহযোগী হওয়া দরকার কারণ সমতা শুধু নারীর নয় সবার উন্নয়নের মুখ্য উপাদান। আমাদের প্রত্যাশা সমতাভিত্তিক ও নারী বান্ধব সরকার, মিডিয়া কভারেজ, কর্মপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র, সামগ্রিকভাবে নারী ও পুরুষের একে অপরের- অতএব সমতার জন্য কেন সবাই এক হতে পারি না?