নারী আবিষ্কারকের সংখ্যা কেন কম

শুক্রবার , ৪ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ

প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহৃত কিছু পণ্য যা নারীরা আবিষ্কার করেছে এবং তাদের নামেই পেটেন্ট রয়েছে। সেগুলোকে সহজেই তালিকাবদ্ধ করা যায়। যেমন বাসনপত্র পরিষ্কারক বা ডিসওয়াশার, গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপার, বোর্ড গেম মনোপলির মতো কয়েকটি জিনিস।
কিন্তু এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্ব নারীদের আবিষ্কারক চিন্তার পুরোপুরি এখনো ব্যবহার করতে পারছে না। যুক্তরাজ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বিষয়ক দপ্তরের (আইপিও) এক গবেষণা বলছে, সারা বিশ্বে পেটেন্ট আবেদনের মাত্র ১৩% আসে নারীদের কাছ থেকে। কিন্তু একসময় প্রতি সাতজন আবিষ্কারকের মধ্যে একজন ছিলেন নারী। যদিও এখন পেটেন্ট আবেদনে নারীদের হার বাড়ছে, তবু এই বিষয়ে লিঙ্গ সমতা আনা ২০৭০ সালের আগে সম্ভব নয়। খবর বিবিসি বাংলার।
আবিষ্কারের দুনিয়ায় নারীদের সংখ্যা এত কম কেন? গবেষকরা বলছেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতে, যা একত্রে সংক্ষেপে স্টেম নামে পরিচিত। তাতে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ফাঁক থাকাটাই এর জন্য দায়ী। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বিষয়ক আইনি প্রতিষ্ঠান পাওয়েল অ্যান্ড গিলবার্টের অংশীদার পেনি গিলবার্টের মতে, এটা একটি পাইপলাইন ইস্যু মাত্র। আমরা যদি নারীদের পেটেন্ট আবেদন বাড়াতে চাই, তাহলে আরো বেশি নারীকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্টেম বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশুনা করতে হবে এবং তাদেরকে গবেষণাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের স্টেম শিল্পের কর্মীদের মধ্যে মাত্র এক তৃতীয়াংশ নারী। এছাড়া মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খুব কম সংখ্যক মেয়ে এবং নারীরা এ ধরনের বিষয়ে পড়াশুনা করে। যদিও এই বৈষম্য দূর করে ভারসাম্যের চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্টেমের দুই-তৃতীয়াংশ এখনো পুরুষ : সাধারণত কোনো কিছুর আবিষ্কারককেই সেই পণ্যের পেটেন্ট দেয়া হয়, যা ওই পণ্যের আবিষ্কারক বা মালিকদের তাদের পণ্য অন্যদের ব্যবহার করতে দেয়ার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ দেয়। একটি আবিষ্কারের পেটেন্ট পাওয়ার যোগ্য হতে হলে নতুন একটি ব্যবহারযোগ্য চিন্তা থাকতে হবে, যা ওই ক্ষেত্রে একজন দক্ষ মানুষের জানা থাকবে না। কোনো একক ব্যক্তি বা আবিষ্কারকের একটি দল এই আবেদন করতে পারবে।
আবিষ্কারকদের মধ্যে লিঙ্গ সমতার পার্থক্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন নারীদের আবিষ্কারের বিষয়টি একটি পুরুষ-শাসিত দলে একমাত্র সদস্য হিসেবে কোনো নারী থাকে। পেটেন্টের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই পুরুষদের দল কিংবা কোনো একক পুরুষ আবিষ্কারকের দখলে। আর সেখানে মাত্র ৬% একক নারী আবিষ্কারক থাকেন।
আবিষ্কারক কোনো দলের সব সদস্য নারী-এমনটা দেখা যায় না বললেই চলে। আইপিওর মতে, নারীদের দলের আবিষ্কারক হিসেবে পেটেন্টের জন্য আবেদন করার হার মাত্র ০.৩%। তবে পেটেন্টের জন্য আবেদন করলেই যে নারীরা পেটেন্টের অনুমোদন পায় তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা পেটেন্ট আবেদন নিয়ে চালানো এক গবেষণায় বলেন, কোনো আবেদনে নারীর নাম থাকলে পেটেন্টের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে তার সম্ভাবনা কম থাকে। আবিষ্কারের সাথে জড়িত সবাইকে তো আর পেটেন্ট দেয়া হয় না।
বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বিষয়ক একটি সংস্থার আগের পরিচালিত একটি গবেষণা বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের গবেষণার জন্য পেটেন্টের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের সম্ভাবনা পুরুষের তুলনায় অর্ধেক কম। এতে বলা হয়, নারীরা পুরুষের মতো তার পণ্যকে বাণিজ্যিক করার বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়।
বায়োটেক বা জৈবপ্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি লিঙ্গ সমতা রয়েছে ১৯৯১ সালে, আন সুকামোতো স্টেম সেলগুলি আলাদা করার একটি উপায় তৈরি করেন। তার উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্যান্সারের রোগীদের রক্ত-ব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন ঘটেছিল। এটি রোগের প্রতিকার খুঁজে বের করাটাকে সম্ভব করতে যাচ্ছিল। ডা. সুকামোতো বর্তমানে স্টেম সেল বৃদ্ধির বিষয়ে আরো গবেষণা করছেন। এছাড়া তিনি আরো সাতটি আবিষ্কারের সহ-পেটেন্টি ছিলেন।
জৈবপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং খাবারের মতো দরকারি পণ্য তৈরিতে জীবিত প্রাণীর ব্যবহারের গবেষণার খাতটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী আবিষ্কারক জড়িত। প্রায় ৫৩% জৈবপ্রযুক্তি সম্পর্কিত পেটেন্টগুলিতে কমপক্ষে একজন নারী উদ্ভাবক রয়েছেন।
দ্বিতীয় স্থানে ফার্মাসিউটিক্যাল সম্পর্কিত পেটেন্টগুলির ৫২% এর মধ্যে কমপক্ষে একজন মহিলা উদ্ভাবক রয়েছে। এই তালিকার সবচেয়ে নিচে ছিল বৈদ্যুতিক প্রকৌশল বিষয়টি। প্রতি ১০টি পেটেন্ট আবেদনের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী আবিষ্কারক ছিল।
গত ২০ বছরে নারী আবিষ্কারকদের পেটেন্ট গ্রহণের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আইপিও বলছে, ১৯৯৮ সালে এই হার ৬.৮% থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে দাঁড়ায় ১২.৭% এ। একই সময়ের মধ্যে কোনো পেটেন্ট আবেদন অন্তত একজন নারী আবিষ্কারক রয়েছেন, এমন আবেদনের সংখ্যা ১২% থেকে বেড়ে হয় ২১%।
গিলবার্ট বলেন, নারীদের শিক্ষাগত এবং পেশাগত পছন্দ নিয়ে যে সাধারণীকরণ প্রচলিত আছে তা দূর করতে হলে নারীদের স্টেম বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করতে উৎসাহিত করতে হবে। এ বিষয়ে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে এবং নারী রোল মডেল তৈরি হলে তার যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।

x