নারীর শক্ত রূপের নাম অভিমান, দৃঢ় রূপের নাম দুর্গা

তানভিরুল মিরাজ রিপন

মঙ্গলবার , ২২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
31

বেশ কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছিল একটি ভিডিও। ঐ ভিডিওতে ক’জন নারীকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁর বাড়ি কোনটা? যে কজনকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁরা বিভ্রান্ত হয়ে উত্তর দিচ্ছিলেন। বাবার বাড়ি না স্বামীর বাড়ি ফিরতি প্রশ্ন করছিলেন। অনেকে বলেছেন, নারীদের নিজস্ব কোনো ঘর থাকে না। চিরায়ত নিয়ম ধরে নারীরা বাড়িহীন, উদ্বাস্তু। সমাজ নারীকে বারেবারে উপস্থাপন করেছে কামের জন্য সৃষ্টি। সন্তান প্রসব তাঁর একমাত্র প্রধান কাজ। সংসার সামলানো তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য । সুপ্রতিষ্ঠিত নারীর নামও বদলে হয়ে যায় মিসেস চৌধুরী, মিসেস খান, মিসেস মুখার্জি ইত্যাদি। নারীর নামও গিলে ফেলেছে সমাজ। যে-নারী ঘুরে দাঁড়িয়েই কথা বলতে চেয়েছে, প্রতিবাদ করতে গলা উঁচু করেছে, সমাজে সে পেয়েছে মন্দ মেয়ের আখ্যা।
বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক কুন্তল বড়ুয়ার অনুবাদ করা, কাহিনী ও ভাবনা হেনরিক ইবসেন’ এর ‘the Dalls house’ থেকে নেওয়া নাটকটির কথা। দক্ষ নাট্য পরিচালক কুন্তল বড়ুয়ার নির্দেশনাতে নতুন দল ‘কথা সুন্দর’ এর ‘ খেলাঘর’ নাটকটি মঞ্চায়ন হলো চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে।
নাটকটির চরিত্রগুলোকে দেখে বিখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি কথা মনে পড়লো। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য কথা বলছিলাম, প্রসঙ্গক্রমে উনি আমাকে বলেছিলেন, ‘অভিনয়তো করি। তবে চরিত্রগুলোকে ধারণ করে, আয়ত্ত করে নিজের অভিনয়কে আরও সত্যরূপে উপস্থাপন করি। যেনো দর্শকরা বুঝতে পারেন, বিশ্বাস অকপটে করে বসবেন যে এমনটা আমাদের চারপাশে ঘটছে।’
বিকাশ চৌধুরী, সীমা চৌধুরী দুটোই নাটকের মুখ্য চরিত্র। একজন পুরুষ হলেই তাঁর পক্ষে যে-কোনো শাসনে শাসিত করা যায় নারীকে। এটা সম্ভব। ইচ্ছে করলে ছুঁড়ে ফেলে দিলে সমাজের এতে ক্ষত সৃষ্টি হয় না, ধর্মের, বিধানের, নিয়মের অস্বাভাবিক কিছুই ঘটে না। ঝমঝম বৃষ্টিতে ভালবাসার আবদার, অনিচ্ছাবশত কাম সেক্ষেত্রে নারীর সম্মতির আজও কোনো দরকার পড়ে না পুরুষের। যখন যেমন চাইবে তেমনি পুরুষের জন্য একটি বিনোদন বালা হিসেবে উপস্থিত থাকবে নারী। সমাজের এসব নিয়ম মানলে, সহ্য করলে সামাজিকভাবে সে ভাল। সীমা একজন দায়িত্ববান স্ত্রী হবার চেষ্টা করেছে বারবার, যাকে সমাজে সু-স্ত্রী বলে। তেমনই হতে চেয়েছে বাবার ঘরে সে সুকুমারী, সুকন্যা হবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু ভুলে গেছে তাঁর নিজস্বতা। সুস্ত্রী হবার লক্ষ্যে স্বামীকে বাঁচাতে চেয়ে আটকে পড়েছিল এক চক্রে। চক্রের ঘুর্ণন এতোটা বেড়েছে যে দিগ্‌বিদিক, নিশানাহীনভাবে প্রতিটা মূহুর্তে সংসারের অনিশ্চয়তা তাকে ভুগতে হয়েছে। তার মাশুল দিতে হয়েছে। এক সময় স্বামী জানতেও পারে স্ত্রীর চক্রের মধ্যে পড়ে যাওয়ার বিষয়টি। কিন্তু পুরুষ মানে ধৈব শক্তিমান জীব। বিষয়টি সমাজের নির্ধারিত ডিসকোর্স। তখন পুরুষ হয়ে যায় শাসক। হয়ে যায় নির্মম,নির্দয়বান।
ক্লিন ইমেজ না জীবন? দ্বন্দ্ব এখানে। নাটকটির সব থেকে জোরালো আঘাতের জায়গা, সংলাপ। যখন জীবন তুচ্ছ হয়ে যায় ক্লিন ইমেজের কাছে। তখন নারী আসলে আপন হয় না, নিজের অংশ হয় না। তখন নারী হয় নির্বোধ, অপদার্থ পুরুষের কাছে।
এদিকে সীমাকে রঞ্জু বলেছিলো,সব ঠিক হয়ে যাবে । ঠিক হয়ে যাবে বলা রঞ্জুর আপোষের পরিবর্তন এ-সমাজের দশ জন নারীকে উপস্থাপন করে। রঞ্জু চরিত্রটি একটি সাহসিনীর কথা বলে। সকল দুর্গম পথ পাড়ি দিতে দিতে যে হেরে যাচ্ছিল প্রায়। সে আপোষ করেছিল। কেন করেছিলো, আর কেন আপোষ নারীকে করতে হয় তার সত্যতা আমার মা, বোন সবাই জানেন ।
নারীদের শক্ত রূপের নাম অভিমান। দৃঢ় রূপের নাম দূর্গা। নারী মানেই পৃথিবীর সব থেকে জরুরি লাল রেখা। যার নিজস্বতা আছে। সৃষ্টির ক্ষমতা আছে৷
মঞ্চ সজ্জা শিল্পের প্রতি গভীর সম্পর্কের প্রকাশ করে। যা একমাত্র শিল্পের একনিষ্ঠ মানুষটির মগজ থেকেই বের হতে পারে। আলো কারসাজি একটি আবহ আনতে সক্ষম হয়েছে। আবহ সংগীতের দক্ষ কাজ আরো সুন্দর করেছে পুরো নাটকটিকে। অনুভূতির জায়গাগুলো নাড়া দিতে পেরেছে। মানুষের আচরণের চূড়ান্ত পর্যায়কে আঘাত করতে পেরেছে নাটকের সংলাপ ও দৃশ্য। যা নাটকের সফলতা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। নাটকটি অনুবাদ করা বলে মনে হয়নি। কারণ চরিত্রগুলো একেবারে আমাদের বাঙালি সমাজের সাদামাটা সাধারণ সম্পর্কগুলোর মতোনই । এতে অভিনেতা অভিনেত্রীদেরও ডেডিকেশন ভাল ছিলো বলে পুরো নাটকটির মূল বার্তাটি মানুষের কাছে পৌঁছুতে পেরেছে।
পুরো অনুষ্ঠান আলোকিত করেছে অনুপম সেনের উপস্থিতি। শিল্পী ঢালী আল মামুন, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জীর সস্ত্রীক উপস্থিতি আরো সমৃদ্ধ করেছে।
‘কথাসুন্দর’র পথ চলা সুন্দর হোক।

x