নারীর মুক্তিযুদ্ধ

শনিবার , ২৬ অক্টোবর, ২০১৯ at ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
26

মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, নৃশংসতা আমরা যারা সরাসরি দেখিনি তাদের সেই তীব্রতা হয়তো ততটা স্পর্শ করেনি আর যারা দেখেছেন তাদের স্মৃতিও ধূসর হয়ে আসছে ক্রমশ বয়সের ভারে। আরও নানা কারণে, মুক্তিযুদ্ধকে আমরা রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক অর্থেই বেশি ব্যবহার করেছি। মুক্তিযুদ্ধের যে তাৎপর্য, মুক্তিযুদ্ধের যে গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল তা হয়নি এমন একটি অসাধারণ গণজাগরণ গণযুদ্ধ যেভাবে আমাদের উত্তরসূরিকে প্রাণিত করার কথা, যেভাবে উজ্জীবিত করার কথা সেটা হয়ে উঠেনি ইতিহাসে, সাহিত্যে, সিনেমায় কিংবা নাটকেও। বিভাজিত রাজনীতিই হয়তো এর প্রধান কারণ। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নাম আমরা তাৎক্ষণিক বলে দিতে পারি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লক্ষ শহীদদের মধ্যে ১০০ জনের নাম আমরা সহজে বলতে পারব না। বহুল উচ্চারিত মুক্তিযুদ্ধ অনেকভাবেই উপেক্ষিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অখণ্ড এবং নিরপেক্ষভাবে আমরা কখনোই পাইনি। ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে প্রতিটি অলিতে-গলিতে শহীদদের স্মৃতির মিনার গড়ে তোলা উচিত ছিল। দেশের জন্য তাদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করা উচিৎ ছিল। সেসব আসলে কিছুই হয়নি। বিভাজন তো শুধু রাজনীতিতে নয়, নারী-পুরুষেরও বিভাজন হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসে নারীকে মুক্তিযুদ্ধে বারবার ধর্ষিতার পরিচয়ে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। নারীর বীরত্ব গাথাগুলো উন্মুক্ত হয়ে আসেনি।
আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম জেনে এসেছে নারী তার সম্ভ্রম হারিয়েছে, সে বীরঙ্গনা হয়েছে এসব। নারীর ভূমিকাই মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে। কোথায় ছিল না নারী সে যুদ্ধে ছিল, সেবায় ছিল, আশ্রয়ে ছিল, রান্নায় ছিল, সুরক্ষায় ছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্তরে নারী ছিল। আন্দোলন থেকে যুদ্ধ শুরু ও শেষ পর্যন্ত নারী তার যথার্থই ভূমিকা পালন করেছে। প্রথম নারী শহীদ মেহেরুননেসার নামও হয়তো অনেকেই শুনেনি।
শহীদ কবি মেহেরুননেসা। ২০ আগস্ট ১৯৪২ সালে কলকাতার খিদিরপুরে তাঁর জন্ম। পিতা আব্দুর রাজ্জাক মা নুরুন্নেসা। চার সন্তানের মধ্যে মেহেরুননেসা ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর তার পুরো পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ‘পাকিস্তান খবরে’র মহিলা মহল সম্পাদনা করতেন।
বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরেই তাঁরা থাকতেন। ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের উদ্যোগে ‘অ্যাকশন’ কমিটি গঠিত হলে তিনি মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে এই কমিটির সভা মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন। তখন বিভিন্ন পত্রিকায় তার জ্বালাময়ী কবিতাও ছাপা হচ্ছিল। ২৩ মার্চ ১৯৭১ সালে তিনি তাঁর দুই ভাইকে নিয়ে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে নিজ বাড়ির ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এসব কারণে মেহেরুন্নেসাসহ তাঁর দুই ভাই ও মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘাতক দালাল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে। তাঁর ভাইদের খণ্ডিত মাথা নিয়ে ফুটবল খেলে বিহারীরা। আর কবি মেহেরুন্নেসার খণ্ডিত মাথা চুল দিয়ে ফ্যানের সাথে আটকিয়ে রাখা হয়। এমন নৃশংসতা মধ্যযুগেও হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরবগাথা। প্রতিটি শহীদের জীবনের বিনিময়ে আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি। তাঁদের ত্যাগের দ্যুতি আলো ছড়াক প্রজন্মের পর প্রজন্মে। প্রতিটি মানুষের ভেতর দেশপ্রেম জাগুক। ভালবাসা জাগুক।

x