নারীর উন্নয়নে সৃষ্টি করতে হবে সক্রিয় পরিবেশ

রবিবার , ৮ মার্চ, ২০২০ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
78

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে এ দিবস। নারীদের ওপর সমস্ত নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হওয়া এবং বৈষম্য দূর করা ও সমতা আনয়নই এ দিবস পালনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে নারীদের জাগ্রত করার মধ্যে রয়েছে এ দিবস পালনের সার্থকতা। নারী দিবস পালনের পটভূমি হচ্ছে এই দিনে আমেরিকায় ঘটে যাওয়া এক আন্দোলন। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারীশ্রমিকরা সড়কে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। সেদিন বেতন বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা আর কাজের বৈরি পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নারীরা একজোট হলে তাদের ওপর কারখানা মালিকেরা আর মদদপুষ্ট প্রশাসন দমন-পীড়ন চালায়। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ১৯০৮ সালে জার্মানিতে এ দিনটি স্মরণে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে প্রায় ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছিলেন। এ সম্মেলনেই প্রথমবারের মত প্রতি বছরের ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সাল থেকেই ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আহবান করলে এরপর থেকে সারা বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
আমাদের আর্থসামাজিক নানা ধাপে নারী অনেকখানি এগিয়েছে। তবে নারী নিজেকে অনেক সীমা ভেঙে ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করলেও আমরা এখনও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি না। নারীর অগ্রসরতার তুলনায় তাদের নিরাপত্তা প্রদান ও সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সামগ্রিক অবস্থা তেমন আশাপ্রদ নয় বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন। তাঁরা বলেন, রাষ্ট্র বলেন, সমাজ বলেন, ব্যক্তি বলেন, আমরা সবাই কিন্তু একটি পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি। এখানে হঠাৎ করে সবার মন মানসিকতা পাল্টে যাবে না। হঠাৎ করে সমাজও নারীবান্ধব হয়ে যাবে না। যতটা এগিয়েছে, তা অনেকগুলো কারণে হয়েছে। বিশেষ করে নারী আন্দোলনের ফলে এদেশের নারীরা আজ এতদূর অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলেই আমরা কতগুলো নারীবান্ধব আইন ও নীতি পেয়েছি। নারীর শিক্ষা, কর্মজীবন, চলাফেরা, নানা ক্ষেত্রেই সুবিধা এসেছে। আমাদের নারীরা পাহাড়চূড়া জয় করে ফিরছে। এগুলো এমনিতেই হয়ে যায়নি। নারীর এই অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নানা প্রণোদনারও বিরাট ভূমিকা আছে। সামগ্রিকভাবে সমাজস্থ সকল সূচকের উন্নতি ব্যতিরেকে রাষ্ট্র এগুতে পারে না। সমাজের নানা ক্ষেত্রে যতদিন আমরা পরিবর্তন না আনতে পারব, ততদিন আমাদের ভুগতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা পেরিয়ে ব্যক্তির আচরণ ও সংস্কৃতি সমেত পরিবর্তন আসতে হবে। নারী যখন মানুষ হিসেবে গণ্য হবে, মর্যাদা পাবে, অবদানের স্বীকৃতি পাবে, স্বাধীনতা পাবে, তখন আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছি বলতে পারব। এই পর্যায়ে এখনও আমরা পৌঁছাতে পারিনি।
নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের প্রয়োজনমাত্র। নারীর অধিকারের দাবি তোলা কোনো বাড়তি চাহিদা বা সুযোগ চাওয়া নয়। নারীর অধিকার আদায়ের দাবি মানে সে পুরুষের প্রতিপক্ষ হওয়ার দাবি নয়, বরং নারী একজন মানুষ হিসাবে মৌলিক দাবিগুলো যেমন, সামাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের দাবির কথা বলছে। সে অন্যের অধীনে যেমন নিষ্পেষিত জীবন চায় না, তেমনি নারী হওয়ার কারণে তার ওপর অর্পিত ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন স্তরের বৈষম্যগুলো ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চায়, বলা চলে; এটাই নারীর আত্মোপলব্ধি।
নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম আর নারী-পুরুষের সমতার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার উপরে। দেশে ২৮ বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন নারীরা। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে আমরা অনেক দেশের আগে। নারী উন্নয়ন আর অগ্রগতিতে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। বর্তমান সরকার অনেক কাজ করে যাচ্ছে নারীর উন্নয়নে, ফলও দেখতে পাচ্ছি সর্বক্ষেত্রে। নারী-উন্নয়ন সংক্রান্ত ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে সব মন্ত্রণালয়ে। জাতীয় পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে নারীর সার্বিক উন্নয়নের ওপর। অনেক কৌশল ঠিক করা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়। এগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উন্নীত হবে ক্ষমতায়ন আর জেন্ডার সমতা অর্জনের লক্ষ্যে নারীর সামর্থ্য, বৃদ্ধি পাবে নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি, সমপ্রসারিত হবে নারীর মতপ্রকাশের মাধ্যম আর সৃষ্টি হবে নারীর উন্নয়নে একটি সক্রিয় পরিবেশ।