নারীবাদ বিপণনের সরঞ্জাম হিসাবে ব্যবহৃত হলেও বিক্রি হয়নি

শনিবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
41

নারীবাদ নিয়ে সামপ্রতিক অভিযোগ ও ধ্যান ধারণা অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নারীবাদকে বানিজ্যিক ভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কি না এবং কিভাবে নারীবাদী আন্দোলনগুলো নতুন উপায়ে সংঘবদ্ধ হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা জানতে পারবো নিম্নোক্ত বর্ণনায়। এই প্রসঙ্গে লেখাটি অনুবাদ করেছেন নীলাঞ্জনা অদিতি।

মানুষ ঘোষণা করতে ভালবাসে যে নারীবাদের সমাপ্তি ঘটেছে। কিছু সামপ্রতিক অভিযোগ হল নারীবাদ বিক্রি হয়ে গেছে, কর্পোরেশন দ্বারা উপনিবেশ স্থাপন করেছে এবং এর বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যগুলোর সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমরা বলি: আন্দোলনে সক্রিয় নারীবাদ ও নারীবাদীরা এর থেকেও চালাক। তারা লিঙ্গবৈষম্যকে দূরে ঠেলে নিরাপদ পৃথিবী গড়তে মানুষকে একত্র করার জন্য নতুন যৌথ জায়গা ও বিষয় ব্যবহার করছে।
হ্যাঁ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নারীবাদকে বাণিজ্যিকভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সেইসাথে প্রশ্ন ওঠে কীভাবে সরবরাহকৃত বৈশ্বিক শেকল দ্বারা নারী শ্রমিকেরা শোষিত হচ্ছে যারা গোলাপের মত পণ্য উৎপাদন করে, ভালবাসা দিবসে প্রধানত নারীদের মধ্যেই বিক্রি করে সেই সম্পর্কে। সত্যিকার অর্থে নারী শ্রমিকদের অল্প বেতন দিয়ে তাদের শ্রমকে ব্যবসায়িক সুবিধার্থে কাজে লাগানো হয়েছে।
এর অর্থ হল কর্পোরেশনগুলো নারীবাদীদের থেকে সমালোচনায় পরিপক্ক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, নারীবাদী শিক্ষাবিদ ন্যান্সি ফ্রাসের নারীবাদকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেন যে নারীবাদ পুঁজিবাদের দাস হয়ে গেছে।
আমাদের নতুন কিছু গবেষণায় আমরা দেখিয়েছি কীভাবে নব্য মুক্ত সময়ে আমাদের সক্রিয় নারীবাদীরা লড়াই করছে এবং সক্রিয় থাকার নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করছে। প্রকৃত ঘটনা হল গত ২০ বছরে, সরকার কর্পোরেশনের কাছে অনেকটা ক্ষমতা সমর্পণ করেছে। তার অর্থ নারীবাদীদের বাজারের উপর কর্তৃত্ব পরিচালনা করতে হবে এবং রাজনৈতিক পালাবদলের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে কাজ করা

যেখানে কর্পোরেশনগুলো ও সরকার নিয়ম তৈরি করছে সেখানে নারীবাদী দলগুলো রাজনৈতিক জায়গাগুলোতে অনুপ্রবেশ করছে। উদাহরণস্বরূপ- নারীবাদী এনজিও এবং তৃণমূল দলগুলো অবিশ্রান্তভাবে লিঙ্গ বিষয়ক সহিংসতা ও হয়রানিগুলো চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইউনাইটেড নেশনের অন্তর্গত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে প্রচারাভিযান করেছিল। জুন মাসে এ ধরনের কাজে প্রথম আন্তর্জাতিক মান সৃষ্টিতে তারা সফল হয়।
কীভাবে মহিলা ও মেয়েরা অসামঞ্জস্য উপায়ে কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয় সেটা বিবেচনায় রেখে তারা ইউ এন এর ব্যবসা ও মানবাধিকারের নতুন উন্মোচিত পথপ্রদর্শনকে উন্নত করতে সাহায্য করে। বিশ্বজুড়ে চারপাশের ব্যবসায়িক আচরণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রত্যাশার দাবিতে এই নিয়মগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে- এবং নারীবাদীরা সেগুলোকে আকার দেয়ার জন্য সেখানে ছিলেন।
অন্য যে উপায়ে নারীবাদীরা বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতার সাথে কাজ করছে তা হল ‘অভিজাততন্ত্র’। দ্য বডি শপ এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান অনিতা রডিক এর কথা ভাবা যেতে পারে, যিনি মহিলাদের সাহায্যকারী কল্যাণ সংস্থা চালানোর পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। সহিংসতার শিকার মহিলাদের জন্য প্রতুল পরিমাণ টাকা তোলার সাথে সাথে এই বিষয়ে তিনি সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। লৈঙ্গিক সম অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীবাদীরা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজের মধ্যে থেকেই তাদের নীতিগুলোকে আকার দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
একইরকমভাবে, শহুরে নারীবাদী কর্মীরা ‘দা ফসেট সোসাইটি’ নামক দলে যুক্ত হয়েছে, যাতে তাদের কর্মজীবনে অনধিকার বলে ঢুকে পড়া সেক্স ইন্ডাস্ট্রির সাথে লড়াই করতে পারে, এই দলটি লৈঙ্গিক সম অধিকারের পক্ষে প্রচারাভিযান চালায়। এখানে, শহুরে নারীবাদী কর্মীরা তাদের ইন্ডাস্ট্রির প্রথা হিসেবে বিদ্যমান যৌনবৈষম্যের অন্তর্গত অনেক বিষয় নিয়ে লড়াই করতে দলবদ্ধ হয়। এই সাফল্যের মূলে রয়েছে শহুরে অভিজাততন্ত্র।
নারীবাদী আন্দোলনগুলো নতুন উপায়ে সংঘবদ্ধ হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহার ও একে অপরকে সমর্থনের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ছোট্ট এনজিও ‘ওম্যান ওয়ার্কিং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড’ (িি)ি কাজ করার অবস্থা সংশোধনে সাহায্য করতে মহিলাদের নেটওয়ার্ক এর সাথে মুখ্য আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া জুড়ে কাজ করেছেন। কেনিয়ান মহিলাদের দুর্দশার কথার প্রতিবেদন যুক্তরাজ্যের ক্রেতাদের কাছে দেয়ার জন্য যাতে িি িসমর্থ হয় তার জন্য মহিলাদের এনজিওগুলোর মধ্যে সহযোগিতা কাজে লেগেছে। যখন আমাদের জীবনের অঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত নতুনভাবে উন্মোচিত মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বৈশ্বিক শেকল দ্বারা বিভিন্ন কোম্পানি পরিচালনা করে তখন তা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘নো মোর পেজ থ্রি’ এর মত সক্রিয় দলগুলো, যারা মিডিয়াতে মেয়েদের যৌনতার রূপ হিসেবে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল তারা সমর্থকদের সংহত করছিল সুপার মার্কেটের উদ্দেশ্যে টুইট ও মেসেজ করার জন্য যার ফলে তারা ‘দ্য সান’ নামক সংবাদপত্রের প্রতি লক্ষ্য রাখা অব্যাহত রেখেছিল যতক্ষণ অব্দি তারা টপলেস মডেলের উপর নিবন্ধ সরিয়ে না ফেলেছে। নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে ও কার্যক্রমের তড়িৎ প্রভাব সৃষ্টিতে সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে, নারীবাদীরা নতুন ও আন্তর্জাতিক উপায়ে ব্যবসায় নিজের জায়গা তৈরির জন্য কৌশলী হয়ে অন্তর্জাল ব্যবহার করছে।

ব্যবসায়িক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া

পরিণামে দেখা যায়, নারীবাদী আন্দোলনগুলোর উপর ব্যবসায়িক স্বার্থকে গুরুত্ব দেবার অভিযোগ উঠেছে। তবুও আমরা কিছু উপায়ের প্রমাণ পেয়েছি যেখানে নারীবাদীরা লৈঙ্গিক সমতা বজায় রাখতে ব্যবসায়িক স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে সুস্পষ্ট নারীবাদী বিষয়গুলোকে এগিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে।
বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর নিশ্চিত করছে তা খেয়াল করলেও বিষয়টি বোঝা যায়। কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে এই সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যবহার করে তাদের সমালোচনার পথ বন্ধ করছে, কিন্তু আমরা এমন অনেক নারীবাদী সংঘ পেয়েছি যারা এই সিএসআর ব্যবহার করে নিজেদের দাবী আদায়ের পথ তৈরি করে নিচ্ছেন, কারণ সামাজিক দায়বদ্ধতাজনিত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই লিঙ্গ সাম্যতা নিশ্চিতের বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছে।
নারীবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তর্কবিতর্ক তুঙ্গে উঠবে। কিন্তু আমরা এখন যে বিশ্বে থাকি সেখানে ব্যস্ত থাকার জন্য আমরা সমালোচকদের আমন্ত্রণ জানাই। বৈশ্বিক ক্ষমতা ও প্রভাবের মধ্যে অবস্থান ঠিক রেখে নারীবাদী আন্দোলনগুলোর তাদের লৈঙ্গিক ন্যয় বিষয়ক প্রসঙ্গগুলেকে সামনে আনতে নতুন নতুন কৌশল খুঁজতেই হবে।

x