নভেম্বরেই ভয়াল সব ঘূর্ণিঝড়

হাসান আকবর

রবিবার , ১০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:০০ পূর্বাহ্ণ
315

আতংকের নভেম্বর। নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় মানেই ভয়াবহ। তীব্র শক্তি নিয়ে আঘাত করে একেকটি ঝড়, লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু। বিগত সময়ের নভেম্বরের ঝড়গুলোই দেশের উপকূলীয় এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ঝড়ের কথা বাদ দিলে দেশে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা তছনছ করে দেয়া প্রায় সবগুলো ঝড়ই আঘাত হেনেছে ভয়াল নভেম্বরে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ইতোমধ্যে আঘাত হেনেছে। ক্ষয়ক্ষতির অবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও এই ঝড় নিয়ে মানুষের মাঝে চরম আতংক ছিল। চট্টগ্রামে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেয়া এই ঝড় বাংলাদেশের নয়টি উপকূলীয় জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করবে বলে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মানুষ দিনভর বিষয়টি খুব একটা আমলে না আনলেও

গতকাল বিকেলের আগে আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে ছুটে যায় । বিশেষ করে উপকুলীয় এলাকা ও পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলো আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
নভেম্বর মাসের এই ঝড় নিয়ে সকলের মাঝেই কমবেশি আতংক বিরাজ করছে। দিনভর গুমোট আবহাওয়া ও দিনভর গুড়িগুড়ি বৃষ্টি মানুষের আতংক আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। দিনের পরিস্থিতিকে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের দিনের সাথে তুলনা করা হলেও সব ভয় নভেম্বর নিয়ে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর। উপকূলীয় এলাকা লন্ডভন্ড করে দেয়া ওই ঝড়ে ছয় লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। অসংখ্য গবাদি পশু মারা পড়েছিল ভয়াল ওই গোর্কিতে। ১৯৭০ সালের ওই ঝড়কে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বলেও বিবেচনা করা হয়। এরপর ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বরের ঝড়ও বেশ ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে উঠে। নভেম্বর মাসের ওই ঝড়ে প্রায় আট হাজার মানুষ ও বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু মারা পড়ে। সুন্দরবনের উপর দিয়ে যাওয়া ভয়াবহ ওই ঝড়ে ১৫ হাজারের মতো হরিণ মারা পড়ে। অনেক বাঘও ওই ঝড়ে প্রাণ হারায়।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আরেকটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের নাম সিডর। লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল বিস্তৃত জনপদ। ২৬০ কিলোমিটার বেগে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা ওই ঝড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ঝড়ের সাথে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে তছনছ হয়ে যায় বেড়িবাঁধ। ভেসে যায় প্রায় ৭০ হাজার বাড়িঘর। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। ওই ঝড়েও বিপুল সংখ্যক গবাদি পশুর পাশাপাশি সুন্দরবনের অনেক বণ্যপ্রাণীও মারা যায়।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রামসহ উপকুলীয় এলাকায় আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়টি ছিলো অন্যতম ভয়াল একটি ঝড়। ২৫০ কিলোমিটার বেগের এই ঝড়ে উপকুলীয় এলাকায় ২০ থেকে ৩০ ফুট উচু জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ১০ লাখ মানুষ হয় গৃহহারা। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক কোটি মানুষ।
আইলা ঘূর্ণিঝড়টির গতি ছিলো সিডর থেকেও বেশি। ২০০৯ সালের ২১ মে আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে ভয়াল তান্ডব চালায়। প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূলীয় এলাকায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তাতে ১৯৩ জন মানুষ প্রাণ হারায়। মারা যায় ২ লাখ গবাদি পশু।
২০০৮ সালের অক্টোবরে ঘণ্টায় ৮৫ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রেশমিতেও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’-এ প্রাণ হারায় ১৭ জন। ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র আঘাতে মারা যায় ২৬ জন।
চট্টগ্রামের উপকুলীয় এলাকায় বিভিন্ন সময় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও নভেম্বরের ঝড়গুলোর শক্তি বেশী পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে ১৯৯১ সালের ভয়াল ঝড়ের পর মানুষের মাঝে যে ভয় তৈরি হয়েছে তা-ই কার্যত বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছে। এক সময় ঝড়ের মাঝেও মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে না গিয়ে বাড়ি ঘরে থেকে যেতো। ঝড়কে আমল না দেয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যেতো। ১৯৯১ সালের ঝড়ের পর থেকে মানুষের মাঝে ঝড়কে পাত্তা দেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। এতে করে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে আসছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কারণে দুর্যোগ মোকাবেলা সহজ এবং প্রানহানির ঘটনা কমছে বলেও বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম আবহাওয়া বিভাগের কর্মকর্তা শেখ ফরিদ আহমদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে দুইটি বিশেষ সময়ে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। একটি মৌসুমী বায়ু আসার সময় অপরটি মৌসুমী বায়ু চলে গেলে। অক্টোবর নভেম্বর মাসে মৌসুমী বায়ু চলে গেলে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে। এগুলোর প্রেক্ষিতে যেই ঝড় তৈরি হয় সেগুলো বেশ শক্তি নিয়ে উপকুলীয় এলাকায় আঘাত হানে।
অপর একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ঝড় একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এখানে মানুষের কিছু করার থাকে না। তবে ঝড় মোকাবেলায় মানুষের অনেক কিছু করার রয়েছে। এবিষয়ে যত বেশী প্রস্তুতি নেয়া যাবে, ক্ষয়ক্ষতি ততই কমে আসবে। তিনি ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতির উপর জোর দেন।

x