নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিতে সরকারকে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে

শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

গবেষণার তথ্য বলছে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় নবম ও দশম শ্রেণির প্রায় ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থীই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকছে। এক পর্যায়ে তারা ঝরেও পড়ছে। যদিও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়াতে উপবৃত্তি ও মিড ডে মিলের মতো কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের নিয়ে মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে পরিচালনা করে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। জরিপ কার্যক্রমে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের ভিত্তিতে মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ। জরিপের ফলাফল বলছে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতির হার মাত্র ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ। এ হিসেবে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনুপস্থিত থাকছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুসারে সাক্ষরতার হার ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেও এদের একটা বড় অংশ মাধ্যমিক পর্যায় পেরোতে পারছে না। এসএসসি বা সমমানের শিক্ষা অর্জন করার আগেই তাদের শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটছে। একই সঙ্গে আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে আরেকটি বিষয়; তাহলো, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। নবম ও দশম শ্রেণিতে ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। এটা ঠিক যে, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার মূল কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক। মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মেয়ে, যারা বাল্যবিবাহ ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারছে না। আর ছেলেরা যোগ দিচ্ছে কাজে। কারণ লেখাপড়ার চেয়ে কাজের মাধ্যমে আয় করাই পরিবারের কাছে লাভজনক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওড় ও পাহাড়ি এলাকার চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। দুর্গম এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বেশি হওয়ায় অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিচ্ছে। প্রাথমিকে উপবৃত্তি ও দুপুরে খাবার দেওয়ার কারণে সকলে ওখানে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে এটা চালু না থাকায় অনেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। স্কুলে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি শৃঙ্খলার দিক থেকেও চিন্তার বিষয়। কেন শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত থাকছে সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। যদি এর কারণ বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে না হয়, তাহলে সেটা দূর করা অত্যাবশ্যক। এছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব, শিক্ষক স্বল্পতা, বিদ্যালয়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ও বিবেচনায় আনা দরকার। শিক্ষকদের অনিয়মিত পাঠ দানও বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ কারণেও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যেতে পারে। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির বিষয়টি আগে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করা হত। কিন্তু নানা কারণে বিষয়টি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতির কারণ বিবিধ। প্রথমত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় ও পরিবার এজন্য দায়ী। এরপর শিক্ষা ব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি। মাধ্যমিক শিক্ষায় যতটা উন্নয়ন প্রয়োজন ছিল, ততটা করা সম্ভব হয় নি। দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব বিদ্যালয় আর্থিক সংকটের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করতে পারে না। তবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে নানা সহযোগিতা বিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার নিয়ন্ত্রণে আসার ফলে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টি ও শূন্য পদে নিয়োগ না করায় শিক্ষকের সংখ্যা শিক্ষার্থীর অনুপাতে বাড়ছে না। স্বীকার করতেই হবে, বই, লেখাপড়া ও শ্রেণিকক্ষ বিমুখ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা আজকাল পরীক্ষায় অনেক ভালো ফল করছে। তবে এ নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, সর্বস্তরেই যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত হয়ে উঠুক। ধাপে ধাপে অর্জন করা সার্টিফিকেটগুলো যেন কোনক্রমেই শিক্ষার্থী বা তার পরিবারের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা শিক্ষার হারে এগিয়ে রয়েছে। দেশটির দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই, শিক্ষা উপকরণ ছাড়াও স্কুলের পোশাক দেওয়াসহ শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে নানা তহবিল ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও শিক্ষার হারের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম রয়েছে।
প্রাথমিকে সব শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমের আওতায় থাকলেও মাধ্যমিক ও উপরের স্তরে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে এ সুবিধা কম। প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের ফলে এ খাতে ঝরে পড়া রোধ, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিসহ নানা ক্ষেত্রে অনেক ফলপ্রসূ পরিবর্তন এসেছে। মাধ্যমিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা। এসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিটি উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা। সেই সঙ্গে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখন যে পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে আসছে। তা আগের চেয়ে বেশি। কিন্তু সে অনুপাতে মানসম্পন্ন শিক্ষক যোগান নিশ্চিত করা যায় নি। এসডিজি লক্ষ্য মাত্রানুসারে প্রাথমিক শিক্ষায় শত ভাগ নিবন্ধন করা যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলেমেয়ে নিবন্ধনের অনুপাতের সমতার হারেও সফলতা আসে। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি। সেখানে সুষ্ঠুভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে শিক্ষার ওই সূচকগুলোয় উন্নতি করতে হবে। তাই প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক গণ্ডি পেরোনো শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা অপরিহার্য। তা না হলে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা কতটা সফল হব তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে উদাহরণে পরিণত হয়েছে। তাই এবার সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যক্রম গ্রহণ করার বিকল্প নেই। এজন্য ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করতেই হবে।

x