নববর্ষ বয়ে আনুক সবার কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ
80

“হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,
ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,
তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল
কারে দাও ডাক-
হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ?।”
গ্রীষ্মের ধ্যান স্তব্ধ ভৈরব, নিশ্চল রুদ্র তপস্বী আমাদের জড়ত্ব থেকে রক্ষা করা ও কলুষমুক্ত করতে বছর ঘুরে আবার এলো আমাদের শ্যামল-সবুজ বাংলায়। বৈশাখ এলেই পুব আকাশের সূর্য সবাইকে ডাকে। শুভেচ্ছা জানায় নতুন বছরের। গত রাতটি বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে কালসমুদ্রের গর্ভে ডুবে গেল ১৪২৫ সালটি। এলো ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। স্বাগত জানাই বছরের নতুন দিনটিকে, নতুন বছরকে, আমাদের সর্বজনীন উৎসবকে। নতুন দিন মানে নতুন উদ্যম, নতুন সজীবতা। আহ্বান করি:
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ঐ নতুনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়।
ফেলে আসা বছরের কালবৈশাখীর ঝড় ধুয়ে মুছে দিয়ে গেছে জীর্ণ পুরাতনকে। নতুন বছরকে আবারো আহ্বান করে বলি:
এসো হে বৈশাখ এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়াইয়ে
বৎসরের আবর্জনা,
দূর হয়ে যাক্‌! যাক্‌ যাক্‌
হতাশা-গ্লানিময় অতীতকে ভুলে যাওয়ার সহজাত প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে দুয়ারে এলো চৌদ্দশ ছাব্বিশ, বাঙালির আরেকটি নতুন বছর। নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক সর্বজনীন প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। সামাজিক ও লোক উৎসবের এই দিনটি বর্তমানে একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় দিনটি নববর্ষ হিসেবে উদযাপিত হয়। নববর্ষ বাঙালির মননের প্রতীক। নববর্ষ উৎসবে রয়েছে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-চাকমা-মারমা-ত্রিপুরীসহ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অভিন্ন অধিকার। ধর্ম নিরপেক্ষতা অসাম্প্রদায়িকতা এই উৎসবের মৌল চরিত্র। প্রকৃতপক্ষে এটাই বাঙালির একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব। আর এজন্যই পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে গ্রাম-নগর-সমতল-পার্বত্য অঞ্চলসহ সবখানে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে যতগুলো উৎসব আছে, তার মধ্যে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় উৎসব বাংলা বর্ষবরণ। এই একটি দিনে বাঙালির ঘরে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। তবে আনন্দের মধ্যেও একটা খেদ থেকে যায়। আমাদের নিজস্ব সত্তা ও স্বাতন্ত্র্য ক্রমেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য গ্রামীণ মেলার সেই পুরনো জৌলুস নেই। পুতুল নাচ, যাত্রাপালা, জারি, সারি, গানের দিন অবসিত। গ্রামীণ খেলা দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ডাঙ্গুলি, হা-ডু-ডু, লাটিখেলা গ্রামীণ জনপদে তেমন একটা দেখা যায় না। নদীতে পালতোলা নৌকা এখন আর দেখাই যায় না। তার বদলে রয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গ্রাস করে নিয়েছে তথাকথিত আধুনিকতা। তারপরও আমরা উজ্জীবিত হই বর্ষবরণে পহেলা বৈশাখে। নানা বিপত্তির মধ্যেও।
এবারের নববর্ষ উৎসবের চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে প্রতিবাদী চেতনাও। জঙ্গি নির্মূল চেতনায় শানিত এবারের পহেলা বৈশাখ। সংস্কৃতিকর্মীদের বলতে হবে, ‘দুর্বৃত্তরা তো অন্ধকারের জীব, আর আমরা আলোর মানুষ। মঙ্গলবার্তা ছড়িয়ে আমাদের শোভাযাত্রা সব গ্লানি দূর করবে।’ তাই বলা যায়, এবারে নববর্ষ এসেছে একটি কথা মনে করিয়ে দেওয়ার বার্তাবহ হয়ে। সেই বার্তাটি হলো, জাতীয় জীবনে অস্থিরতা, সহিংসতাসহ সকল জঙ্গিবাদ ও ধ্বংসাত্মক কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার বার্তা। আমরা কোন ধরনের সহিংসতা চাই না, চাই না কোন অস্থিরতা। চাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন বছরের ৩৬৫ দিন যেন দেশের সকল মানুষ শান্তি ও স্বস্তিতে দিন কাটাতে পারে। এবারের নববর্ষ আসুক আমাদের বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিয়ে, রাষ্ট্রের অভিযাত্রার শুভক্ষণ রূপে। হতাশা-গ্লানিময় অতীতকে ভুলে গিয়ে নতুন দেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে আমরা সবাই যেন এগিয়ে আসি। নববর্ষে আমাদের সকল পাঠক, গ্রাহক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ী, প্রদায়ক, লেখক তথা দেশবাসীর প্রতি রইল শুভেচ্ছা। নববর্ষ সকলের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ বয়ে আনুক।

x