নবনীতা দেবসেন

লায়লা জামান

শনিবার , ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ
9

১৯৮৩ সালের ৩০ নভেম্বর রাধারানী দেবীর আশি বছরের জন্মদিনে ‘টুকরো চিঠি’ নামে একটি সংকলন বেরিয়েছিল। এতে সংগৃহীত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, শরৎ চন্দ্র, তারাশঙ্কর, অমিয় চক্রবর্তী, অন্নদাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুফিয়া কামাল প্রমুখের চিঠি। সম্পাদকের নিবেদনে ছিল আজ শ্রীমতি রাধারানী দেবীর আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে লিখিত চিঠির থলে থেকে সামান্য এক গোছা তুলে নিয়ে এখানে প্রকাশ করা গেল। নেহাৎই এক গুচ্ছ ফুলের মত, এদের কাজ দায়হীন আনন্দ বিতরণ, বিগত যুগের সাহিত্য-সংসারের সঙ্গে শ্রীমতী রাধারানীর সংযোগের সুরভিটুকু আমাদের কাছে বয়ে আনা।’ এহেন শ্রীমতী রাধারানী দেবী নবনীতা দেবসেনের মা, বাবা শ্রী যুক্ত নরেন্দ্র দেব। হিন্দুস্থান পার্কের ‘ভাল-বাসা’ বাড়িতে ওঁদের বাস, ঐ বাড়িতেই ১৯৩৮-এ তাঁদের একমাত্র সন্তান নবনীতার জন্ম। মা-বাবা দুজনেই কবি। একসময় রাধারানী অপরাজিতা দেবী ছদ্মনামে লিখে সাহিত্য জগতে আলোড়ন তুলেছিলেন। নরেন দেব কবিতা ছাড়াও ওমর খৈয়াম কালিদাস হাফিজের কাব্য অনুবাদ করে অনুবাদক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। মা সেকালে প্রগতিশীল চিন্তা লালন করতেন। তেরো বছরে বিধবা হয়ে আটাশ বছর বয়সে নিজে মন্ত্র পড়ে আত্মসম্প্রদান করে নরেন দেবকে বিয়ে করেন। সমকালীন খবরের কাগজগুলোতে বেরিয়েছিল ‘ কন্যার আত্ম সম্প্রদান’। রাধারানী কবিতা রচনা ছাড়াও ‘পাঠশালা’ নামে ছোটদের পত্রিকা বের করতেন।
এহেন পরিবারে জন্মেছিলেন বলেই বোধ হয় নবনীতা কবি, কৌতুক কাহিনীকার, ঔপন্যাসিক প্রবন্ধকার, ভ্রমণকাহিনী রচয়িতা, নাট্যকার, অনুবাদক রূপকথার কাহিনী নির্মাতা।
আমি তাঁর একজন অনুরাগী পাঠক। বিশেষ করে তাঁর আত্মজৈবনিক রচনা, ভ্রমণ কাহিনী এবং প্রবন্ধের। তাঁর রচনায় তাঁর ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য প্রকাশ পেয়েছে। ব্যক্তি জীবন ও রচনায় কোথাও তিনি মানুষকে ছোট করে দেখেননি। তাঁর রচনা রসসমৃদ্ধ, নিজেকে এবং অন্যকে নিয়েও কৌতুক করেছেন, কিন্তু কোথাও অশ্রদ্ধা ছিল না। একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমার কখনো একা লাগে না কারণ সবাইকে আমি বন্ধু ভাবি।’ অবসর কাটান কীভাবে? উত্তরে বলেছেন অবসরের কি দরকার, হয় লিখি নয় আড্ডা দি। আড্ডা আমার খুব প্রিয়।
নবনীতা দেবসেন আর নেই। মনে পড়ে গেল উনিশ’শ আশি সালে আমি তাঁকে এক আড্ডায় পেয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে আমাদের পরিচয় নিরঞ্জনদার (নিরঞ্জন হালদার) মাধ্যমে। নিরঞ্জন দা নবনীতাদির বন্ধু, অমর্ত্য সেনের সহপাঠী আনন্দবাজারের সহকারী সম্পাদক, নিরঞ্জন দা ওঁর বাড়িতে বা বাড়ির বাইরে বহু শিল্পী সাহিত্যিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। নবনীতার ‘ভাল-বাসা’ বাড়িতে অনেকবার গেছি। প্রথম দিকে ওঁর মা বেঁচে ছিলেন, অসুস্থ মার সম্পর্কে গল্প করতেন। একদিন হঠাৎ মন খারাপ করে বললেন মা তো ২০০০ সাল দেখে যেতে পারবেন না। একটা রচনায় (নাম মনে নেই) মা ও নিজের অসুস্থতা নিয়ে কৌতুক করেছিলেন। দুজনেই হাঁপানী আক্রান্ত, দুজন দুঘরে দুই বিছানায়, দুজনের শ্বাসকষ্টের আওয়াজকে বাদ্যযন্ত্রের সওয়াল-জবাবের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, কেউ যেন কাউকে হারাতে পারছে না। নবনীতাদির দু মেয়েই তখন মার সঙ্গে “ভাল-বাসা”তে থাকতো। বড়টা পিকোলা, অন্তরা দেবসেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ে। ছোটটা টুম্পা, নন্দনা দেবসেন। সে সময় মাধ্যমিকের ছাত্রী ছিল। বাবা অমর্ত্য সেন “ভাল-বাসায়’ আসতেন মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে।
প্রতি বছর ঘটা করে নবনীতার জন্ম দিন হতো। আমন্ত্রিত রম্য রচয়িতা তারাপদ রায় বলেছেন, কেকটাতে ইঁদুরের গন্ধ করছে, সঙ্গে সঙ্গে নবনীতার উত্তর, আমার বেড়ালটা সারারাত কেকের ওপর বসে পাহারা দিয়েছে। ইঁদুর আসবে কোথা থেকে? এই ধরনের স্নিগ্ধ কৌতুক পরিবেশনে নবনীতা দি সিদ্ধহস্ত।
একদিন সন্ধ্যের দিকে গেছি নবনীতাদির বাড়িতে। গল্প, আড্ডার মাঝখানে চা পান শেষে তিনি ওঁর বাড়িতে রাতে খেয়ে যেতে বললেন। একটু পরে সুবীর রায় চৌধুরী (যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক) এলেন। ওঁকেও রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানালেন। ইকবাল নানা অজুহাতে ফিরে আসতে চাইছিল। আমি ওঁর সঙ্গ লাভের ইচ্ছায় খেতে রাজি হয়েছি, মেনুও সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন। বহু বছর ধরে রাতে ওঁরা যা খান। রুটি, খাসির মাংস, সবজি আর মনে নেই। আমরা গড়িয়া হাট ঘুরে ওঁর বাড়িতে গেছিলাম, সঙ্গে শাড়ির প্যাকেট। শাড়ি কিনেছো? জিজ্ঞেস করে তিনি আর কিছু বলেননি। ইকবাল অভিভূত। তিনি যে নতুন কেনা শাড়ি দেখতে চাননি, ইকবালের মতে এই আচরণ মহিলাদের মধ্যে বিরল। আমাদের গল্পে মেয়েরাও এসে যোগ দিয়েছিল। এমন সময় তপন রায় চৌধুরী এলেন। ইতিহাসবিদ হিসেবে নাম শুনেছি। তখনও কেমব্রিজের শিক্ষক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙালনামা’ বেরোয়নি। তপন রায় চৌধুরীর পূর্বের আমন্ত্রণ ছিল সন্ধ্যে বেলায় নবনীতা দেবসেনকে বাইরে খাওয়াবেন। দেরী করে আসার নানা অজুহাত দেখালেন। নবনীতাদি রাজি হলেন না বললেন আমার বন্ধুরা এসেছে ওদের নিয়ে আমি বাড়িতে খাব। তপন রায় চৌধুরী অপ্রসন্ন চেহারায় ফিরে যাচ্ছিলেন। সুবীর দা সৌজন্য দেখিয়ে ওঁকেও আমাদের সঙ্গে খেতে বললেন। তিনি রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেলেন। সুবীরদাও রাগ করে চলে যাচ্ছিলেন। আমি আর দিদির মেয়েরা ওকে আটকালাম। নবনীতা দি এতক্ষণ নির্লিপ্ত ছিলেন। এবার বললেন, আমার বাড়ি আমি ডাকছি না তুমি কেন ডাকতে গেলে? আমি হেঁপো রোগী, তপন এই রাতে এসে বললে আমিতো ওঁর সঙ্গে বাইরে যাবো না।
অন্য একদিন “ভাল-বাসা”য় নবনীতাদির সঙ্গে গল্প করছি, ঘরের ভেতর দিয়ে যে সিঁড়ি উঠে গেছে ওখানে দাঁড়িয়ে ছোট মেয়ে টুম্পা বন্ধুর সঙ্গে ইংরেজিতে গল্প করছে। মা নবনীতা বললেন, আমরাও তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছি, কই বন্ধুদের সঙ্গে তো ইংরেজিতে গল্প করিনি। মেয়ের উত্তর: এখনতো সবাই করে।
বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার পেলে কয়েকজন কবিকে আলোচনার জন্য ডেকেছিল দূরদর্শন। নবনীতা বললেন পুরস্কার ঘোষণা হলে বন্ধুরা শক্তির বাড়িতে গেলেন, ওঁর স্ত্রী মীনাক্ষী উত্তেজনা বশত কালজিরা দিয়ে চা বানিয়ে ওদের খেতে দিয়েছিলেন।
আমরা তখন আই. সি.এস সি. আর-এর অতিথি ভবনে থাকি। বাংলাদেশ থেকে আনিস স্যার গেছেন। স্যারের বন্ধু নবীনতা, অমিয় দেব, আরো দু’একজন স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। পাশের বাড়িতে জোরে ব্যান্ডের গান বাজছিল। নবনীতা দি ঘরে ঢুকে এক পাক নেচে নিয়ে বললেন, টুকু, তোমরা যাতে নাচতে পার তাই এই ব্যবস্থা। না, দিদি ওঁরা আমাদের অতিথিদের জন্য এই ব্যবস্থা করেছে। আমার কথা শুনে হেসে আরো এক পাক নেচে নিলেন। স্যার ও ইকবাল অতিথি ভবনে নেই, বাইরে গেছেন। ওঁরা আর বিশেষ বসলেন না।
৮৫ সালের শেষের দিকে আমার পি.এইচ.ডি’র মৌখিক পরীক্ষা ছিল। ওই দিন সন্ধ্যায় কলকাতার নন্দন হলে অপর্না সেনের ‘পরমা’ ছবিটির প্রিমিয়ার শো, প্রধান অতিথি নবনীতা দেবসেন। সুবীর দা আমার পি.এইচ.ডির মৌখিক পরীক্ষা উদযাপনের জন্য ‘পরমা’ দেখার সুযোগ করে দেয়ার অনুরোধ করলেন। নবনীতা দি সঙ্গে সঙ্গে রাজি। বললেন, আমি যাব আর ছোট ভাইবোন দুটোকে নিতে পারবো না? আয়োজকদের বলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করলেন। ওঁর বাড়ি থেকে আয়োজকদের গাড়িতে আমরা তিনজন হলে গেলাম। হল ভর্তি, বিশেষ ব্যবস্থায় আমাদের দুজনের বসার ব্যবস্থা হল। হঠাৎ দিদি স্টেজে ইকবাল বলে ডেকে চুপ করে গেলেন। ইকবাল বলেছিল, আমি ভাবলাম দিদি আমাকে গাড়ি ঠিক করে দিতে বলেন কিনা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সমকালীন সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে বক্তৃতা করেন। পরে ছবিটি দেখানো হল। ‘পরমা’ নিয়ে কলকাতার পত্র পত্রিকায় দর্শকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া মুদ্রিত হয়েছিল। ‘পরমাতে ভুলের খতিয়ান’ এই শিরোনামে তিনি ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় একটি বড় সমালোচনা লিখেছিলেন। তাঁর মতে, ‘পরমার চেয়ে ঢের বেশি খোলাখুলি সেক্‌্‌সে বাঙালি দর্শক অভ্যস্ত, কিন্তু বাংলা ভাষাতে নয়। বাঙলা ভাষা মানেই প্রথাসিদ্ধ মূল্যবোধের মালা। অন্য কোন ভাষাতে ‘পরমা’ হলে বাঙালি দর্শকের এতটা কালচার শক লাগতো বলে মনে হয় না। হিন্দিতে বা মালয়লামে তৈরি হলে বাঙলার দর্শক ‘পরমা’কে আর্ট ফিল্‌্‌ম বলে ধরতেন, রীতিমতো গ্রহণযোগ্য, এমনকি উপকারী শিল্প কর্ম বলে পরিগণিত হতে পারত ‘পরমা’। ‘চিলড্রেনস কর্ণার’ নামে কিণ্ডারগার্টেন থেকে নবনীতার লেখাপড়ার শুরু, তারপর গোখলে। গোখলেতে যশোধরা বাগচী ছিলেন সহপাঠী ওই স্কুলের ম্যাাগাজিন সাধনায় সাত বছরের নবনীতার জীবনের প্রথম লেখা মুদ্রিত হয়। বাংলা ও ইংরেজি কবিতা ও একটি বাংলা গদ্য। ‘৫২ সালে চৌদ্দ বছর বয়সে স্কুল ফাইনাল পাস করে লেডি ব্রেবোর্নে পড়েন। ব্রেবোর্ন থেকে পাস করে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়েন। এম. এ. করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূূলক সাহিত্য বিভাগ থেকে। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। নবনীতা দেবসেন প্রথম ব্যাচের ছাত্রী। এই বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত, নরেশগুহ-এসব কবিরা। নবনীতা এম.এ. পাস করে হার্ভার্ডে পি.এইচ.ডি করতে গেলেন ফেলোশিপ নিয়ে। আমেরিকা যাওয়ার পথে কেমব্রিজে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে উভয় পরিবারের মত নিয়ে এনগেজমেন্ট হয়। অমর্ত্যের সঙ্গে পূর্ব-পরিচয় ছিল, যাদবপুরের ছাত্রী যখন নবনীতা, অমর্ত্য ইকোনমিক্‌্‌সের বিভাগীয় প্রধান। অমর্ত্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটির প্রধান ছিলেন, আর ছাত্রী নবনীতা ভাল ডিবেটর ছিলেন। পরের গরমের ছুটিতে দেশে এলে ওদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। নবনীতার পি.এইচ.ডির মৌখিক পরীক্ষার সময় বড় মেয়ের জন্ম আসন্ন। পরীক্ষা বোর্ডের শিক্ষক মণ্ডলী ছাত্রীর দিকে এক একটা প্রশ্ন ছোঁড়েন, আর হবু সন্তানও মার পেটে লাথি মারে। ক্রিকেট বল ধরার মত করে লাথি ধরে তিনি উত্তর করছিলেন এই ঘটনার বর্ণনা তিনি কৌতুক করে দেখিয়েছিলেন। পি.এইচ.ডি’র পর তিনি কেমব্রিজ, ইন্ডিয়ানা, বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করেন। ১৯৯৯-এ সাহিত্য অকাদমি পুরস্কার ও ২০০০ সালে পদ্মশ্রী উপাধি লাভ করেন।
নবনীতা নিজেকে নিয়ে, নিজের অসুখ বিসুখ নিয়েও কৌতুক করেছেন। তাঁর নিজের জীবন নিয়ে কৌতুকপূর্ণ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘নটী-নবনীতা’। একটা অনুষ্ঠানে দলীয় নৃত্য পরিবেশনের সময় সবাই যে ভঙ্গীতে নাচছে নবীনতা তার উল্টো, এতে বাবাও হেসেছিলেন। তাঁর প্রতিটা ভ্রমণকাহিনীও আকর্ষণীয় কৌতুক পরিবেশনের কারণে। তাঁর ‘ট্রাক বাহনে ম্যাক মাহনে,’ ‘হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে,’ ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’ ‘গ্র্যানাডা থেকে মাদ্রিদ’ ‘অপারেশন মোটর হর্ণ’, উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ কাহিনী। উপন্যাসের মধ্যে প্রথম উপন্যাস ‘আমি অনুপম’ নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা, উপন্যাসটি নকশালদের আন্দোলন নিয়ে অন্যান্য লেখকদের রচনা থেকে ভিন্ন। এখানে তিনি নায়কের অনুতাপের কথা বলেছেন যা ‘ইতিবাচক উত্তরণ।’ ‘বামা বোধিনী’ তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘ষোড়শ শতকের ময়মনসিংহের মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর জীবন এবং একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মেয়েরা-সীতা, চন্দ্রাবতী, অংশুমালা, কমলাম্মা মালিনী, মালিনী-বিভিন্ন সময়ের নারীদের জীবনকে তিনি এই উপন্যাসে একত্রিত করেছেন অদৃশ্য বন্ধনে।’ অনাবাসী ভারতীয় ও বাংলাদেশীদের নিয়েও তিনি উপন্যাস লিখেছেন।
নবনীতা দেবসেনের মতে মানুষের জীবন হবে আনন্দময়, কর্মময়, শিক্ষাময়। তাঁর পারিপার্শ্বিক জীবন ও জগত সম্পর্কে নিজের বিবেচনাবোধ দিয়ে চিন্তা করেছেন। তাঁর একটি কবিতা ‘আরণ্যক’ সেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে লোকদের মনের মধ্যে, বুকের মধ্যে, পাঁজরের মধ্যে ঢুকে যায় হিংস্রতা। সেই হিংস্রতা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় অনুতাপ।
এক সাক্ষাৎকারে পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে ধর্ষণের কথা বলেছেন। ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে, তিনি গ্যাংরেপের কথাও বলেছেন। ‘যত মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে, কাজে কর্মে বাইরে বেরোচ্ছে, তত যেন অসহায় হয়ে পড়ছে। শিক্ষার আত্মপ্রত্যয় মেয়েদেরতো বাহুবল বৃদ্ধি করে না। আমাদের ছেলেরা কি তবে লেখাপড়া শিখছে না? তাদের কি বাধা দেবার শক্তি নেই’। এই মোক্ষম কথাটি প্রতিদিনই আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে কীভাবে মিলবে এই ভয়ংকর অপশক্তির বিনাশ। শিশু থেকে সব বয়সী মহিলাদের এ থেকে পরিত্রাণ।
গত ৭ নভেম্বরে নবনীতাদির প্রয়াণ কেবল আমার ব্যক্তিগত শোকের নয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্য অনেকটা রিক্ত তাঁর অনুপস্থিতিতে।

x