নবনীতার প্রয়াণ

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ
9

এই বাংলায় কিংবা ঐ বাংলায় নারীর ভাগ্য একই রকম। এমন কি সারাবিশ্বেও নারী মানে নারী। পুরুষের অবারিত পৃথিবীতে নারীর জন্য নিয়ন্ত্রিত সীমানা প্রাচীর! মাঝে মাঝে সবাইকে সচকিত করে কোন কোন নারী নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বের হয়ে আসতে পারে নিজ ক্ষমতায়, নিজ যোগ্যতায় নিজ শক্তি, সামর্থ্যে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ও আগে একজন নারী লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারাটা ছিল খুবই কঠিন এবং একজন হিন্দু বিধবা মহিলার বিবাহ ছিল অভাবনীয় ও অকল্পনীয়। রাধা রানী নামে এক অসাধারণ বালিকার বিয়ে হয়েছিল ১৩ বছর বয়সে এক প্রকৌশলীর সাথে। দুর্ভাগ্যক্রমে কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি শাশুড়ির আশ্রয়ে থাকেন এবং শাশুড়ির উৎসাহে তিনি লেখাপড়া ও লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর কবিতা ছাপা হতে থাকে বিভিন্ন পত্রিকায়। নানা সমালোচনার কারণে তিনি অপরাজিতা নামেই লেখা পাঠাতেন পত্রিকায়। তাঁর লেখার তীক্ষ্ণতা দেখে অনেকে মনে করতেন কোন পুরুষ লেখক নারীর নামে লিখছেন। তাঁর লেখা লেখি ও সৃজনশীলতার কারণে তিনি কবিগুরুর সান্নিধ্য পান। শুধু কবিগুরু নন তখনকার সব নামি দামি সাহিত্যিকদের সংস্পর্শেও আসেন। এক পর্যায়ে কবি নরেন্দ্র দেবের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। এই পরিচয় ও সম্পর্কের পরিণতি দেওয়ার সম্মতি ও সহযোগিতা দেন স্বয়ং কবিগুরু, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী এবং স্বয়ং তাঁর প্রয়াত স্বামীর মা। তিনি মেয়ের মত তাঁকে নরেন্দ্র দেবের সাথে বিয়ে দেন। তৎকালীন সময়ে এটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার! বিশেষ করে বিধবা বিবাহ! নরেন্দ্র দেব ও রাধা রানীর প্রথম সন্তান মারা গেলে তাঁদের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয় সোনার চামচ মুখে নিয়ে তাদের ভালোবাসার ঘরে। ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি কলকাতায় হিন্দু স্থান পার্কে। তিনি আমৃত্যু এই ভালোবাসার ঘরেই ছিলেন। শরৎচন্দ্র এই নবজাতকের নাম দেন অনুরাধা আর কবিগুরু নাম দিলেন নবনীতা, কবিগুরুর সেই নবনীতাই আজকের বাংলা সাহিত্যের অনন্য নক্ষত্র নবনীতা দেব সেন। তিনি এক বিশেষ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। বিভিন্ন ভাষায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। বাংলা ইংরেজি ছাড়া তিনি ওড়িয়া, অসমীয়া, ফরাসি, জার্মান, সংস্কৃত এবং হিব্রু ভাষা জানতেন। গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস, লেডি ব্রেবোর্ন ও প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর, হাভার্ড, ইন্ডিয়ানা ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন। ১৯৭৫-২০০২ সাল পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন এবং বেশ কিছুকাল বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কবি বুদ্ধদেব বসু ও সুধীন্দ্র নাথ দত্তের স্নেহধন্য ছাত্রী ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পান তাঁর আত্মজীবনীমূলক রম্য রচনা ‘নটি নবনীতা’ গ্রন্থের জন্য। ২০০০ সালে পদ্মশ্রী ও ২০০৪ সালে কমল কুমার জাতীয় পুরস্কার পান। ১৯৫৯ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম প্রত্যয়’ প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাস ‘আমি অনুপম’ ১৯৭৬ সালে। কবিতা, প্রবন্ধ, রম্য রচনা, ভ্রমণ কাহিনী ও উপন্যাস মিলে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৩৮টি। তাছাড়া মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি লিখেছেন। তাঁর শেষ লেখা ছিল মৃত্যু নিয়ে রসিকতা করে! তিনি নিজেকে নারীবাদী লেখক মনে করতেন। নারীদের নিয়ে তিনি প্রচুর কাজ করেছেন। তিনি নারী লেখকদের জন্য ‘সই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নারী লেখক ও প্রকাশকদের নিয়ে ‘সই মেলা’ নামে বই মেলাও করেন। মানব বিদ্যা চর্চাকে তিনি সময়োপযোগী করে তুলেছেন। তৈরি করেছেন ওয়েবসাইট ও নারী লেখকদের জন্য ব্লগ। বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতীকে রামায়ণ রচনা নিয়ে গবেষণার কাজেই যেমন খুঁজে পেয়েছিলেন তেমনি তিনি মোল্লা নামের সাধারণ পরিবারের থেকে উঠে আসা তেলেগু ভাষার ঐ নারী কবির সাহিত্য কীর্তিও খুঁজে বের করেছিলেন। তিনি মনে করতেন নারীবাদ মানে নারীকে সম্মান করা সেটা পুুরুষকে অসম্মান করে নয়। নারীর জীবনে সুযোগের অভাব রয়েছে। নারীকে এগুতে হবে নিজ ক্ষমতায়। অনেক পুরুষও আছেন নারীবাদী। শরৎচন্দ্র ছিলেন, রবীন্দ্রনাথও ছিলেন অন্তত লেখায়। ব্যক্তি জীবনে হয়তো নয়।
খেয়ালি এই সাহিত্যিক সাহিত্যের সব ধারায় সমান সাফল্য দেখিয়েছেন। কল্যাণময় জীবনে বিশ্বাসী তিনি বলতেন, ‘এমন কিছু লিখব না যাতে সমাজের ক্ষতি হয়। এমন কোন লেখাও লিখে লাভ নেই যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কোন উপকার না হয়। আমার লেখা থেকে কোথাও অকল্যাণ যেন না হয়। পাঠক তাঁর ভালোবাসার পাঠক ও বন্ধু। অসাধারণ প্রাণশক্তির অধিকারী এই লেখক ৮১ বছর বয়সেও তাঁর ভেতর উঁকি দিত এক উৎফুল্ল তরুণ। ক্যান্সার ধরা পড়ার আগেই তাঁর শারীরিক কিছু প্রতিবন্ধকতা এসে গিয়েছিল। কিন্তু সচল ছিল তাঁর কলম আর ছিল ভ্রমণের নেশা। হুইল চেয়ারকে সাথে করে বের হয়ে পড়তেন। ১৯৬০ সালে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ (পরবর্তীকালে নোবেল বিজয়ী) অমর্ত্য সেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয় এবং তাদের দুই কন্যা। অন্তরা সাংবাদিক ও সম্পাদক। কনিষ্ঠ কন্যা নন্দনা অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী। অমর্ত্য সেনের সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ১৯৭৬ সালে।
গত ৭ নভেম্বর (২০১৯) সেই ‘ভালোবাসা’র ঘরেই তিনি চিরনিদ্রায় চলে যান। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে বাংলা একাডেমিতে শেষবারের মত বাংলাদেশে এসেছিলেন এই নন্দিত লেখক।

x