নদী সুরক্ষায় বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে নদী খনন

মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২০ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ
96

আমাদের দেশকে বলা হয় নদীমাতৃক বাংলাদেশ। এক সময় বাংলাদেশে আটশয়েরও বেশি নদী ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সংস্কার ও খনন ইত্যাদি নদী রক্ষার কোন প্রয়াস না থাকায় বর্তমানে কোন রকমে টিকে রয়েছে ৭১০টি। এর মধ্যে ৩শ বড় নদী এবং ৪শ শাখা নদী-উপনদী। ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক হিসেবে পরিচিত। এই ৫৭টি নদীর মধ্যে ৫৩টি ভারত থেকে প্রবাহিত, মিয়ানমার থেকে ৩টি এবং বাংলাদেশ ভারতে প্রবাহিত ১টি নদী। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এতগুলো নদীর মধ্যে একটি নদীরও অবস্থা ভাল নয়। ফারাক্কা-গজলডোবাসহ নানা বাঁধ ও ব্যারেজে স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় অবরুদ্ধ। তার ওপর দেশে ও বিদেশে সমানভাবে ভূমিদস্যু ও জনমানুষেরা হামেশাই চালাচ্ছে দখল ও দূষণ। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে নদীর প্রবাহ সচল রাখার অপরিহার্যতা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে কোন সচেতনতা নেই বললেই চলে। আর এ কারণে ইতোমধ্যেই শতাধিক নদী বিলীন হয়ে গেছে। যেগুলো রয়েছে সেগুলোরও যায় যায় অবস্থা। এমনকি দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত ৪০৫টি নদী অবৈধ দখলদারদের কবলিত হওয়াই মানচিত্রে সেগুলোর অবস্থান প্রায় বিলীন হওয়ার উপক্রম। নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি ও পরিবেশে। মরে যাচ্ছে গাছপালা, হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ নিসর্গ প্রকৃতি। হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে মৎস্য প্রজাতি, প্রাণিকূল ও জীব বৈচিত্র্য। বাংলাদেশ ও ভারত মোটামুটি দুটি দেশের চিত্র একইরকম। আশার কথা দুই দেশের সরকার তথা নীতিনির্ধারকেরা এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। দুটো দেশ যৌথভাবে অন্তত দুটি নৌরুট খননে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের গণমাধ্যমে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
খবরে আরো বলা হয় এনিয়ে দেশ দুটির যৌথ মনিটরিং কমিটিও গঠিত হয়েছে। মনিটরিং কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে খনন উপযোগী নৌ-পথ পরিদর্শন করেছেন। এই দুটো নৌপথ হলো যমুনার সিরাজগঞ্জ থেকে দুই খাওয়া পর্যন্ত ২৯২ কিলোমিটার এবং আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ২৮৫ কিলোমিটার নৌপথ। নদী খননের ব্যয় দুই দেশ যৌথভাবে বহন করবে। বাংলাদেশ বহন করবে কর ও ভ্যাটসহ ৩৫ শতাংশ, ভারত বহন করবে ৬৫ শতাংশ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গত বছর ডিসেম্বরে দুই দেশের নৌ-সচিব পর্যায়ের বৈঠক রাজশাহী থেকে পাকশী পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার নদী যৌথভাবে খননের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এই খননে ব্যয়ের ৮০ শতাংশ বহন করবে ভারত এবং ২০ শতাংশ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। যৌথভাবে নদী খননের মাধ্যমে নাব্য রক্ষাসহ দুইদেশের মধ্যে পরিবহন ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানো, সর্বোপরি পারস্পরিক পর্যটনের পথ প্রশস্ত করার জন্যও এর প্রয়োজনীয়তা ও আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ রাজধানীর চারপাশের নদ-নদী, সর্বোপরি সারাদেশের নদ-নদী ও শাখা নদীকে দখল-দূষণমুক্ত করে সারা বছর ধরে নাব্য রাখার জন্য সরকার একটি মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতে একদিকে যেমন নদীমাতৃক আবহমান বাংলাদেশের চিরায়ত প্রকৃতি ও রূপ ফিরে আসবে, তেমনি নৌযান চলাচলের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও মানুষের যাতায়াতের পথ সুগম ও সুলভ হবে, সহজ হয়ে যাবে যাতায়াত। সরকার যে দেশের নদ নদীকে সারা বছর ধরে নাব্য বজায় রেখে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে সচেষ্ট ও আন্তরিক সেটা ইতিমধ্যেই নানা কার্যক্রমের মধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নদ-নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। এই মহাপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে নৌ পথ সচল হবে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে সারা বছর নদীর নাব্য রক্ষা হবে এবং এর ফলে সেচ সুবিধা ও চাষাবাদ আরো সহজ এবং সম্প্রসারিত হবে। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন বাড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে নদী না বাঁচলে বাঁচবে না বাংলাদেশ ও ভারত। এমনিতর অবস্থায় নদ-নদীর সুরক্ষায় দুই দেশেরই যৌথভাবে এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির সুষম বন্টনও জরুরি।