নতুন সড়ক আইন প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ অনেক

ঋত্বিক নয়ন

শনিবার , ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ
428

এর মধ্যে পনের দিন পার হয়ে গেছে। এখনো সড়কে নতুন আইনের প্রয়োগ নেই। এক সপ্তাহ করে দুবার সময় বাড়ানো হয়েছে। আইন প্রয়োগে নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশ বলছে, প্রয়োগের আগে বর্তমানে তারা পরিবহন মালিক, চালক ও যাত্রী সাধারণকে সচেতন করছেন। পরিবহন মালিক-চালকরা বলছেন, আইনের এমন কিছু ধারা আছে, যা মানা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চালকদের মতে, ফাঁসির দড়ি মাথার উপর ঝুলন্ত রেখে গাড়ি চালানো কিছুতেই সম্ভব নয়। এর চেয়ে পেশা পরিবর্তন করতে প্রস্তুত তারা। অনেকেই ইতোমধ্যে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
মালিকদের মতে, এত টাকা জরিমানা দিয়ে গাড়ির ব্যবসায় বিনিয়োগ করার দরকার নেই। অন্য ব্যবসায় এ টাকা বিনিয়োগ করলে ক্ষতি কী? পরিবহন নেতৃবৃন্দও তাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলছেন, সড়কে শৃঙ্ক্ষলা ফেরাতে আইন কঠোর করাই সমাধান নয়। অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন এই আইন সড়কে শৃঙ্ক্ষলা ফেরাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। তবে আইনটি আরো যাত্রীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা, যানজটসহ পরিবহন নৈরাজ্য ঠেকাতে হলে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশন, এনফোর্সমেন্ট এবং এনভায়রনমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইন সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে, সচেতন করতে হবে। আইন না মানলে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্তা করতে হবে। নতুন সড়ক আইন নিয়ে ভয়ের কিছু নেই।
তিনি বলেন, নভেম্বরের ১ তারিখ থেকে নতুন আইন কার্যকর করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ আইনে একটি মামলাও আমরা দিইনি। এর কারণ হচ্ছে, আমরা সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ, ড্রাইভার এবং মালিকদের সচেতন করছি। কারণ সচেতনতা সৃষ্টি না হলে এ আইনের অপব্যবহার হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেনের পূর্বাঞ্চলীয় সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, সড়কে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, বিআরটিএ, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে, ট্রাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে কয়েকটি পক্ষ আছে। একটি পক্ষকে দায়ী করে নিরাপদ সড়ক পাওয়া কঠিন। নতুন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনার মামলায় শাস্তি বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। এসব মামলা হবে জামিন অযোগ্য। এছাড়া আইনে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলায় হত্যাকাণ্ডের ধারা যোগ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
আইনের বিভিন্ন ধারাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যদি বলি, অষ্টম শ্রেণি পাস যারা করেনি তারা রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারবে না। তাহলে ধর্মঘট হয়ে যাবে। আমি যদি বলি, পঞ্চম শ্রেণি পাস যারা করেনি, লাইসেন্স যাদের নেই, তারা হেলপার হিসেবে গাড়িতে উঠবে না। তাহলে এমনিতে ধর্মঘট শুরু হয়ে যাবে। যে ধর্মঘট হবে সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। সড়কে শৃক্সখলা ফেরাতে আইন কঠোর করাই সমাধান নয় বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক আজাদীকে বলেন, অন্য আইন প্রয়োগ আর এ আইন প্রয়োগে যে পার্থক্য রয়েছে তা বুঝতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। গত ১৪ মাস ধরে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। এরই মধ্যে আইনটি সম্পর্কে সকলকে সচেতন করার কাজটি সরকার করতে পারত। পাশাপাশি আইনটি যারা প্রয়োগ করবে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটিও এরই মধ্যে করতে পারত। তা না করে ১ নভেম্বর আইনটি কার্যকর করার পর এ কাজগুলো করতে গিয়ে সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে।
প্রায় ৮০ বছরের অচলায়তন ভেঙে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এক নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন আইন কার্যকর হলেও এখনো সেটি প্রয়োগে সক্ষম হননি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত। মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত না হওয়ায় নতুন আইনে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ট্রাফিক পুলিশের সফটওয়্যার আপডেট না করায় নতুন হারে জরিমানা আদায় করা যাচ্ছে না। তৈরি হয়নি আইনের প্রয়োজনীয় বিধিমালাও।
নতুন আইনে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য জরিমানার পরিমাণ পাঁচ থেকে ৫০ গুণ বাড়ানো হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগের আইনে যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। এখন তা করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয়, এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। চালককে সংকেত মানতে হবে। পথচারীকেও সড়ক-মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডার পাস ব্যবহার করতে হবে। যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। কিন্তু সড়কে নেই জেব্রা ক্রসিং, নেই সিগন্যাল লাইট। পার্কিং স্পটও নেই।
যাত্রী, পথচারী, চালক, মালিক সবাই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সব আইনের সঙ্গে জনসাধারণ সরাসরি সম্পৃক্ত নন। তাই আইনটির বিধিমালা ছাড়া এর কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে এর কিছু লক্ষণ দেখা দিয়েছে। পুলিশ আপাতত মামলা করতে পারছে না দুটি কারণে। এক আইনের সর্বনিম্ন সাজা কত নির্ধারণ করবে এ সংক্রান্ত একটি খসড়া ট্রাফিক বিভাগ থেকে সরবরাহ করা হলেও বিস্তারিত বলা নেই সেখানে। যেমন, আইনে ব্যক্তিগত গাড়ির বাণিজ্যিক ব্যবহারে শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। অথচ রাইডশেয়ারিং চলছে দেদার। এদের অনেকে ইতোমধ্যে এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট পেয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী তা বলা হয়নি। এ রকম নির্দেশনা দেননি বিআরটিএর কর্মকর্তারাও। ফলে মাঠ পর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশকে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির কথা বলা হয়েছে বেশিরভাগ ধারায়। সর্বনিম্ন শাস্তির তথ্য রয়েছে কয়েকটি ধারায়। এখন শাস্তির মাত্রা কত নির্ধারণ করবে পুলিশ সেজন্য দুটি স্তর দেখিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। যদিও এ স্তর নির্ধারণে জটিলতা আছে। কারণ বলা হয়েছে, প্রথমবার অপরাধ করলে একরকম আর দ্বিতীয়বার করলে শাস্তি বেশি। দ্বিতীয়বারের বিষয়টি জানা সব ক্ষেত্রে সম্ভব না-ও হতে পারে।
নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, আইনটি পাশ হওয়ার পর থেকে সড়কে শৃক্সখলা ফিরতে শুরু করেছে। দৃশ্যপটও অনেকটা পাল্টে গেছে। অনেক চালকের মনে জেল-জরিমানার আতংক দেখা গিয়েছে। আবার পরিবহন মালিকরা কাগজপত্র ঠিক করতে বিআরটিএতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। বাকিরা কাগজপত্র ঠিক করে নিয়ম মেনে সড়কে চলাচল করছেন।
এরই মধ্যে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমছে। পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে দফায় দফায় সভা করে আইন মেনে চলার কথা বলছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। কিন্তু আইন প্রয়োগের আগে দীর্ঘদিনের প্রচলিত সিস্টেমের পরিবর্তন সম্পর্কে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় পরিবহন মালিক চালকদের পাশাপাশি যাত্রীদের মাঝেও নতুন আইনটি নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
সিএনজি টেক্সি চালক মো. আলমগীর বলেন, আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, তা সবারই কম-বেশি জানা। আইনে ৫ বছরের জেল আর ৫ লাখ টাকা জরিমানার কথা বেশি আলোচিত হচ্ছে ড্রাইভারদের মধ্যে। এই ভয় নিয়ে গাড়ি চালানো যায়? ৫ লাখ টাকা জরিমানা দেয়ার ক্ষমতা থাকলে আমি গাড়ি চালাব কেন? আর ৫ লাখ টাকা দিতেই যদি হয়, তবে গাড়ি চালিয়ে জরিমানা না দিয়ে মুদি দোকান দিলে তো লাভ আরো বেশি হবে।
বর্তমানে নগরীতে যানবাহন সংশ্লিষ্ট কোনো মামলা কিংবা জরিমানা আদায় হচ্ছে না জানিয়ে সিএমপির ট্রাফিক (উত্তর) প্রসিকিউশন ইনচার্জ জাহিদুর রহমান আজাদীকে বলেন, যেহেতু নতুন সড়ক আইন কার্যকর হয়ে গেছে, সেহেতু পুরনো আইন বাতিল হয়ে গেছে। নতুন আইনের প্রয়োগে আমরা এখন পর্যন্ত যাইনি। আইনটি সম্পর্কে মালিক-চালকদের পাশাপাশি যাত্রী সাধারণকে সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এরপর সিনিয়র স্যাররা যখন নির্দেশ দেবেন তখন থেকে মামলা ও জরিমানা আদায় শুরু হবে। তবে এর মধ্যে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে স্যারদের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

x