নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

শপথ নিল মন্ত্রিসভা ।। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

আজাদী ডেস্ক

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মত সরকার গঠনের শপথ নিল আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা এই শপথ গ্রহণ করে। বিকাল সাড়ে ৩টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছ থেকে সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন ও গোপনীয়তার শপথ নেন। এরপর নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম। রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অভিযাত্রায় এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গী হচ্ছেন ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রী। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় জয়ের পর শেখ হাসিনা তাঁর নতুন সরকার সাজিয়েছেন মূলত নতুনদের নিয়ে। শপথ গ্রহণকালে বঙ্গভবনের জনাকীর্ণ দরবার হলে প্রধানমন্ত্রীর ছোটবোন শেখ রেহানাসহ তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সিইসি কে এম নূরুল হুদা, সাবেক রাষ্ট্রপতিগণ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ, জাতীয় সংসদ সদস্যগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, তিনবাহিনীর প্রধানগণ, কূটনৈতিক কোরের সদস্যবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দ, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল তিনটা তিন মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরবার হলে প্রবেশ করার সময় সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। এর কিছু সময় পরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দরবার হলে প্রবেশ করেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে পদের জন্য শপথ গ্রহণ করেন এবং পরে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নেন। এরপরই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা শপথ নেন। নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবন থেকে ফেরার সময় রাস্তার দু’পাশে সমবেত জনতা তাঁকে একনজর দেখার জন্য রাজধানীর রাজউক এভিনিউ ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল।
কে কোন মন্ত্রণালয়ে:
২৪ জন মন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষি মন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্য মন্ত্রী ড. মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থ মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান, শিল্প মন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।
১৯ জন প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন- শিল্প মন্ত্রণালয়ে কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ইমরান আহমেদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জাহিদ আহসান রাসেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে মো. আশরাফ আলী খান খসরু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মো. জাকির হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মো. শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে জুনাইদ আহমেদ পলক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ফরহাদ হোসেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে স্বপন ভট্টাচার্য, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জাহিদ ফারুক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মো. মুরাদ হাসান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে শরীফ আহমেদ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কে এম খালিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ডা. মো. এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে মো. মাহবুব আলী এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।
৩ জন উপমন্ত্রী হচ্ছেন- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বেগম হাবিবুন নাহার, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ কে এম এনামুল হক শামীম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মহিবুল হাসান চৌধুরী।
এদিকে নতুনদের সঙ্গে নিয়ে চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া শেখ হাসিনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, ‘এবার আওয়ামী লীগ ২১টি বিশেষ অঙ্গীকার নিয়ে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। এই ইশতেহারে উন্নয়ন-সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার দৃঢ়প্রত্যয় করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবারও ক্ষমতায় যেতে পারলে তিনি সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার ইশতিহারে তরুণ যুব সমাজকে দক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। এছাড়া তিনি সুশাসন নিশ্চিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন তিনি পুনরায় সরকার গঠন করলেন। এবার তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা।’
তবে শপথ গ্রহণের পর শেখ হাসিনার নতুন সরকারকে সফল করতে সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা। গতকাল গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারা।
নতুন মন্ত্রিসভার তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘দীর্ঘ ছয় বছর প্রচার সম্পাদক হিসেবে দলের দায়িত্ব পালন করেছি। এখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে রাষ্ট্রের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছেন, তা আমি যথাযথভাবে পালন করব।’ তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ আমাদের আবারও ক্ষমতায় এনেছেন। মানুষকে আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এখন সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই আমাদের লক্ষ্য।’
প্রতিক্রিয়ায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। এজন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এলাকার ভোটাররা আমাকে আবারও বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন বলেই এই সম্মান প্রাপ্তি। বিগত ৫ বছর এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। তাই বঙ্গবন্ধুকন্যা পদোন্নতি দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই, দেশবাসীর দোয়া চাই।’
এবার প্রথম সংসদ সদস্য হয়েই শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের উপর অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। আমাদের কাছে মানুষের আশা এবং প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমরা সেটা পূরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি মন্ত্রিত্বটাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখছি, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিজের সর্বোচ্চটাই দেব।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে নিজের আগ্রহ ছিল বলেও জানান এই আইনজীবী। তাঁর অগ্রজ দীপু মনিকে মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে পেয়ে নওফেল বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যিনি দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ, উনার সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগবে।’

x