নতুন বারতা ছিল ম্যাসেজ-এর গানে

আহসানুল কবির

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ
3

সময়টা ১৯৮৪ সাল। দেশে তখন ভারতীয় বাংলা গান আর নানা বিদেশী সংগীতের একচেটিয়া প্রভাব। যেকোন উৎসবে গান মানেই বিদেশী গান। দেশীয় যে কয়টি গান ছিল সেগুলোর কোন কদরই ছিলনা বলতে গেলে।
আর এ বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে চট্টগ্রামের সংগীত পিপাসু কয়েকজন তরুণকে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে তখন থাকতেন খোকন ও হাবিব খান। সেই সুবাদে প্রতিদিন কলোনিতে আড্ডা দিতে আসতেন সদ্য প্রয়াত কন্ঠশিল্পী নওশাদ বাবু, লিড গিটার বাদক কাসু, রিদম গিটার বাদক স্বপন (বর্তমানে এলআরবি’র) সাথে যুক্ত, বেস গিটার বাদক খোকন, ড্রামস বাদক টন্টি (বর্তমানে ফিডব্যাক’র সাথে যুক্ত), কি বোর্ড বাদক হাবিব খান ও পার্থ বড়ুয়া। সাথে ছিলেন একরামুল হক বাহাদুর।
তারা আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে খালি গলায় গান গাইতেন। এসময় প্রয়াত পপ সংগীত শিল্পী আজম খানের গান তাদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। প্রসংগত তখনো কেউই বাদ্যযন্ত্র বাদনে দক্ষ ছিলেন না। তবে মনে সবার একটাই বাসনা আর তা হলো একটি ব্যান্ড গড়ার। যেহেতু সারাদেশে বিদেশী সংগীতের আধিক্য বেশি ছিল এই কারণে আড্ডারুরা চিন্তা করতে থাকেন কী করে দেশীয় ধারার গানকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
তারা সবাই মিলে বিষয়টি নিয়ে বসলেন এবং এক পর্যায়ে তারা সদ্য প্রয়াত সংগীতশিল্পী ও খ্যাতনামা গিটারবাদক আয়ুব বাচ্চুর শরণাপন্ন হন। আয়ুব বাচ্চুর প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সহায়তায় আড্ডারুরা শেখা শুরু করেন নানা বাদ্যযন্ত্র বাদন। বাচ্চুর কাছে তারা নিয়মিত শিখতে থাকেন।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যন্ত্রপাতি যোগাড় করার ক্ষেত্রে। কারণ তখন প্রায় সবাই ছাত্র। ফলে টাকা পয়সা খুব একটা ছিল না কারো কাছেই। এদের মধ্যে বাহাদুরের পারিবারিক ব্যবসা ছিল আগে থেকেই। তাই তিনিই প্রথম কিছু বাদ্যযন্ত্র যোগাড় করে দলকে সাহস যোগান। আর দলের চর্চা চলতে থাকে জামালখান সেন্ট ম্যারিস স্কুলে।
যাক কিছুদিন পর গঠন করা হলো ব্যান্ডদল ম্যাসেজ। আর তাদের প্রতিপাদ্য ছিল দেশের সংগীতাঙ্গনকে দেশিয় ধারার নতুন কিছু উপহার দেয়া। ১৯৮৫ সালে আগ্রাবাদ সরকারি কর্মচারি কল্যাণ সমিতির মিলনায়তনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয় ম্যাসেজ দলের।
এদিকে, বাচ্চুর সাথে দলের সদস্যদের তিনমাস গানসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাদন শেখাবেন এমন চুক্তি হয় এবং সেই মোতাবেক চলেও সবকিছু। কিন্তু এক পর্যায়ে বাধ সাধেন কাসু। তাই উপরোক্ত অনুষ্ঠানের আগেই দল ছাড়েন তিনি। ফলে লাইন আপে আসে আরেক দফার পরিবর্তন।
নতুন লাইন আপ দাঁড়ায় এমন। লিড গিটারে পার্থ বড়ুয়া, কি বোর্ডে সেলোস্টিয়েন পিনোরো, রিদম গিটারে কামরুল, ড্রামসে এনাম এলাহী টন্টি, বেস গিটারে খোকন, কন্ঠশিল্পী নওশাদ বাবু। আর ইংরেজি গানের গায়ক হিসেবে যোগ দেন সাবু ও অনুপ বড়ুয়া।
একই বছর দলটি একের পর অংশ নেয় সরকারি সিটি কলেজ চট্টগ্রাম, সরকারি বাণিজ্য কলেজ চট্টগ্রাম, সরকারি চট্টগ্রাম কলেজসহ নানাস্থানে।
১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে ঢাকার খ্যাতনামা ক্যাসেট বিপণন সংস্থা সরগম থেকে বের হয় দলের প্রথম ক্যাসেট। ক্যাসেটের শিরোনাম ছিল ম্যাসেজ।
ক্যাসেটের গানগুলো ছিল যথাক্রমে তুমি জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন নিভাইয়া গেলানা, নির্জনে বসে একা, সদরুল হাই, কোন শুভ্র বেলায়, নীল আকাশে, একটি কবিতা, লুসাই পাহাড়, চলো একদিন, দিন ফুরাইলো, বিদায় বসন্তে, উড়হঃ ষড়ড়শ নধপশ ইত্যাদি। এরমধ্যে জ্বালাইয়া গেলা সে সময় তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়।
১৯৯৪ সালের দিকে দলে ভাঙনের সুর বাজতে থাকে। এসময় পার্থ বড়ুয়া ঢাকায় চলে গেলে দীর্ঘ সময়ের জন্য দলের কার্যক্রম থেমে যায়। আর এই সময়ে দলের সদস্যরা যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে যান। ২০০০ সালে দলটি কার্যত বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

x