নতুন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন জরুরি

সোমবার , ১৫ জুলাই, ২০১৯ at ১০:১২ পূর্বাহ্ণ
184

কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত কালুরঘাট সেতু ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। যে কোনো মুহূর্তে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এখানে উল্লেখের দাবি রাখে যে, ২০০১ সালে রেলওয়ে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে। অথচ এ সেতু দিয়ে চলাচল করছে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ ভারী যানবাহন। চলছে যাত্রীবাহী ও ফার্নেস অয়েলবাহী ট্যাঙ্কার। এই সেতু মূলত দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাতায়াতে ট্রেন চলাচলের জন্য নির্মিত।
গতকাল দৈনিক আজাদীতে ‘আর ভার বইতে পারছে না কালুরঘাট সেতু’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সেতুটির বর্তমান অবস্থা দেখে যে কারো মনে হতে পারে-সেতুটি যেন আর ভার বইতে পারছে না। একটানা ভারী বর্ষণে কালুরঘাট রেল সেতু এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দুই পাশে ড্রেজার দিয়ে প্রচুর পরিমাণে বালি উত্তোলনের ফলে জরাজীর্ণ সেতুটির অবকাঠামোকে আরো বেশি নড়বড়ে করে তুলেছে বলে জানান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ব্রিজ) আতাউল হক ভূঁইয়া। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর পিচ, পিস প্লেট ও রেলবিট ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি পড়লেই কংক্রিট ও পিচ ওঠে বড় বড় গর্তে মরণফাঁদের সৃষ্টি হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৩০ সালে নির্মিত সেতুটিতে রেলের পাশাপাশি যানবাহন চলাচল করছে ১৯৫৮ সাল থেকে। এই একটি সেতু দিয়ে যান চলাচল, পায়ে হেঁটে পারাপার এবং রেল চলাচল করে থাকে। একমুখী চলাচলের কারণে দুই পাশে যানজট হওয়ার পাশাপাশি সেতুর ওপর চাপ থাকে সব সময়। যার জন্য বারবার মেরামত করে সেতুটি সচল রাখার ব্যবস্থা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ১৯৯৭ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ১০ টনের অধিক পরিবহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) এক গবেষণায় সাত মাত্রার ভূমিকম্পে সেতুটি ধসে পড়ার শঙ্কার কথা বলা হয়। সর্বশেষ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে সেতুটি মেরামত করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়। এ সময় ১১ মাস সেতুর উপর যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সালেও দুই দফায় সংস্কার হয় সেতুটি। এছাড়া প্রতিনিয়ত ছোটখাটো মেরামত কাজ করা লাগে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই সেতুর।
এদিকে, বোয়ালখালী-কালুরঘাট নতুন সেতু দ্রুত নির্মাণের দাবিতে অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন বোয়ালখালীর মুক্তিযোদ্ধারা। এ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে স্থানীয় সাংসদ মঈন উদ্দিন খান বাদল বলেন, এ অঞ্চলের প্রাণের দাবি নতুন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন না হলে আগামী ডিসেম্বরে সংসদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। তাঁর এই হুঁশিয়ারি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
আসলে কালুরঘাট সেতু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আশ্বাসের বাণী শুনে আসছেন চট্টগ্রামবাসী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে কর্ণফুলী নদীর ওপর আরেকটি সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। ২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর (হযরত শাহ আমানত সেতু) উদ্বোধন শেষে পশ্চিম পটিয়ায় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী কালুরঘাট সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট কর্ণফুলীর কালুরঘাটে দ্বিতীয় সড়কসহ রেলসেতু প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী নীতিগতভাবে অনুমোদন দেন। ২০১৮ সালে ৭ আগস্ট অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি উঠলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্প নিয়ে অধিকতর সমীক্ষার নির্দেশ দেন। সেই বৈঠক শেষে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (বর্তমান অর্থমন্ত্রী) জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী সমীক্ষার কাজ শেষ হলে প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে।
বলা বাহুল্য, ১৯৯১ সাল থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ কালুরঘাটে একটি দ্বিমুখী রেলওয়ে-কাম সড়ক সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করার পর অনেক মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দ্রুত সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বোয়ালখালী তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশা জেগেছিল। কিন্তু কালুরঘাট সেতু নির্মাণ এখনো প্রকল্পই রয়ে গেল। এ ব্যাপারে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

x