নজরুলের শিশুসাহিত্য

কাঞ্চনা চক্রবর্ত্তী

শুক্রবার , ২৪ মে, ২০১৯ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
205

রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যে এক বিরল ও ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। শিশু মনোজগতের অপার রহস্যকে তিনি তাঁর লেখনির মাধ্যমে আবিষ্কার করেছিলেন। শিশু সাহিত্যে নজরুলের অবদান অপরিমিত।তিনি একমাত্র কবি যিনি শিশুদের নিয়ে লিখতে গিয়ে একাধারে অদ্বিতীয় ও কালজয়ী। শিশুকিশোরদের জন্য কবি নজরুল অনেক কবিতা লিখেছেন। শিশুতোষ বইগুলোর মধ্যে ঝিঙে ফুল,পুতুল বিয়ে,ফুলে ও ফসলে,তরুণের অভিযান,সাত ভাই চম্পা,মইকু মাইতি, জাগো সুন্দর চিরকিশোর এবং সঞ্চায়ন উল্লেখযোগ্য। তাঁর শিশুসাহিত্য বেশ বৈচিত্র্যময়। কখনো কিশোর দুরন্তপনা ও ডানপিটে স্বভাব আর কখনো রহস্য সন্ধানের আকাঙ্ক্ষা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে।
আমাদের শৈশবে আমরা সকলেই ঘুম থেকে জেগেছি একটি ছড়া শুনে আবার কেউ কেউ এই ছড়াটি নিজেরাই আবৃত্তি করেছি-“ভোর হলো /দোর খোলো/ খুকুমণি ওঠো রে।
ঐ ডাকে/ জুইশাখে/ ফুলখুকী ছোটরে।
রবি মামা দেয় হামা/ গায়ে রাঙা জামা ঐ
দারোয়ান /গায় গান /শোনো ঐ,রামা হৈ।
এই ছড়াটি আর শৈশব যেন একই সুতায় গাঁথা। ছড়াটিতে নজরুল সূর্যের আভা,সকালে ওঠার পর শিশুর কাজ কী ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। শিশুদের জন্য রচনার ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন আন্তরিক। নজরুল শিশুকালে যে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন ঠিক তাঁর সাহিত্য বিচারের সেটি উঠে আসে।কাজী নজরুল ইসলামই একমাত্র কবি,যিনি শিশুদের প্রকৃতির নানা প্রজাতির রূপ,রস,বর্ণনা করে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন।যেমন-
“প্রজাপতি প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা!
টুকটুকে লাল নীল ঝিলমিল আঁকা বাঁকা।”
শিশু সওগাতে একটি শিশুর নানা শারিরীক অঙ্গভঙ্গি ও দৈহিকভাবে বেড়ে উঠাকেও আলোকপাত করেছেন।বলেছেন-
“ওরে শিশু, ঘরে তোর এল সওগাত,
আলো পানে তুলে ধরে ননী-মাখা হাত!
নিয়ে আয় কচিমুখে আধো আধো বোল,
চকমকে চোখে আন আলো ঝিকিমিকি,
খুলে দেবে তুলে দেরে আঁধারের চিক।”
নজরুল ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার ছাপ পড়েছে শৈশবে। তাই তো তিনি “লিচুচোর কবিতায় শৈশবের নানা দুষ্টুমির বিষয়গুলোকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন-
“বাবুদের তাল-পুকুরে/ হাবুদের ডাল কুকুরে,
সেকি বাস করলে তাড়া/ বলি থাম একটু দাঁড়া।”
বস্তুত “লিচু চোরের ” মতো অভিনয় উপযোগী কবিতা বাংলা শিশু সাহিত্যে বিরল। কবিতাটি হাস্যরস পরিপূর্ণ এবং নাটকীয় গুণে সমৃদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে “লিচুচোর” শৈশবের দুরন্তপনার একটি জীবন্ত চলচ্চিত্র। কবি শিশুমনের ইচ্ছা ও অভিব্যক্তিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে আলোকপাত করেছেন। তিনি “কি কি হবি বল” কবিতায় শিল্পকলার সুন্দর স্ফূর্তি দেখা যায়। এই কবিতায় বোন তাদের সাত ভাইকে জীবনের গতি কি হবে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন কেউ পণ্ডিতমশাই,কাবুলীওয়ালা,ফেরিওয়ালা, দারোগা ও কন্সটেবল হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।সাতভাইয়ের মধ্যে সপ্তম ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল এরকম–
” আমি হব বাবার বাবা/ মা সে আমার ভয়ে,
ঘোমটা দিয়ে লুকোবে কোণে/ চুনি-বিলী হয়ে”
অপরদিকে জিজ্ঞাসা কবিতায় মনের ভাব অন্যভাবে প্রকাশিত হয়েছে-
“‘রব না চক্ষু বুজি/ আমি ভাই দেখি খুঁজি
লুকানো কোথায় কুঁজি/ দুনিয়ার আজব খানায়।”
নজরুল শিশুদের জন্যে শুধু ছড়া বা নাট্যধর্মী কবিতা রচনা করেননি,নাটিকাও রচনা করেছেন। যেমনঃ পুতুলের বিয়ে -শিশুদের জন্য এটি বেশ উপভোগ্য। শিশুমন স্কুলে যেতে চায় না। এর অন্যতম কারণ শিক্ষকভীতি। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন –
“‘যেথায় আবার থাকে
এক যে জুজু, গুরুমশাই বলে তাকে ডাকে
নাকের ডগায় চশমা তাঁহার, মাথার ডগায় টিকি
হাতের ডগায় কঞ্চি বাঁশের, তাই দেখি আর লিখি।”
এর মাধ্যমে তিনি আনন্দহীন শিক্ষা থেকে বের করে আনার কথাই বলেছেন। মায়ের সাথে নজরুলের সম্পর্কে ছিল খুব রহস্যময়। শৈশবে মায়ের কাছে আবদার আহ্লাদ করলেও পিতার মৃত্যুর পর নজরুল সেই যে মাকে ছাড়লেন,শেষে অবেলার ডাক এ এসে মাকে স্মরণ করেন অশ্রুধারায়। শৈশবে মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পছন্দ করেনি এমন শিশু বিরল। কবি নজরুল ও তাঁর শৈশবকে মনে করে,মায়ের মমতাময়ী কোলকে স্মরণ করে লিখেছেন-
“হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ
মায়ের কোলেতে শুয়ে
জুড়ায় পরাণ।
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কতনা সোহাগে মাতা
বুকটি ভরান।”
শিশুরা কবির কাছে প্রকৃতির মতই সতেজ ও সুন্দর ও সম্ভাবনাময়। হলুদ ঝিঙে ফুলের সপ্রাণ হাসি যেমন মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয় ঠিক তেমনি শিশুরাও কবির ভাবনাকে প্রাঞ্জল করে তোলে।শ্যামল আলোর প্রকৃতির কোলে ঝিঙে ফুল যেমন নান্দনিক তেমনি শিশুরাও মায়ের কোলে শাশ্বত ও নান্দনিক। তিনি লিখেছেন –
“শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকুরে
আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা দুপুরে।
প্রজাপতি ডেকে যায়
বোটা ছিড়ে চলে আয়
আসমানে তারা চায়
চলে আয় এ অকূল
ঝিঙে ফুল।’
শিশুরা চির নতুন। আগামীর দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের কাছে কবির অনেক প্রত্যাশা। তাইতো তিনি লিখেছেন-”
“নতুন দিনের মানুষ তোরা
আর শিশুরা আয়
নতুন চোখে নতুন লোকের
নতুন ভরসায়।”
ঘুমকাতুরে খুকীকে মা কিছুতেই ঘুম ভাঙাতে পারে না।কতো সাধ্য সাধনা।শেষ পর্যন্ত কবি নিজেই ছুটে আসেন ঘুম কাতুরে ঘুম ভাঙাতে। আশার ভাষায় কবি বলেন-
“খুলি হাল তুলি পাল ওই তরী চললো
এইবার এইবার খুকু চোখ খুললো।”
শৈশব থেকেই কবির মধ্যে প্রগতিশীল জাগরণী চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল। যেই চিন্তাকে তিনি শিশুদের মাঝে সঞ্চারিত করেছিলেন। তাঁর খোকার সাধ কবিতাটিতে তিনি বলেছেন-
“আমি হবো সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে
তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে।”
১৯২১ সালের কথা। নজরুল একবার কুমিল্লায় বেড়াতে গেলেন।উঠলেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে।তার ভারী দুষ্টু আর মিষ্টি একটা মেয়ে।নাম ছিল অঞ্জলি। বিকেল বেলায় মেয়েটি পেয়ারা খাওয়ার জন্য গাছতলায় গিয়ে গাছের উপর কাঠবেড়ালী দেখতে পেল। প্রত্যেকদিন মেয়েটির এমন আচরণ দেখে নজরুল খুকী ও কাঠবেড়ালী কবিতাটি লিখেছেন-
“কাঠবেড়ালী, কাঠবেড়ালী পেয়ারা তুমি খাও?
গুড় মুড়ি খাও?দুধ ভাত খাও?
বেড়াল বাচ্চা?কুকুর ছানা তাও?”
“ঝিঙে ফুল’ এর কবিতাগুলো হাস্যরসাত্মক। ছোটদের মনমানসিকতা, ভালোলাগা এবং কৌতূহলী মনকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে।
“বাবুদের তাল পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সেকি বাস করলে তাড়া
বলি থাম একটু দাঁড়া।”
মা কবিতায় শিশু হৃদয়ে মাতৃস্নেহের অনাবিল ধারাকে অনবদ্যভাবে লিখেছেন-
“পাঠশালা হতে যবে
ঘরে ফিরি যাব সবে
কত না আদরে কোলে তুলি নেবে মাতা,
খাবার ধরিয়া মুখে
শুধাবেন কত সুখে
কত আজ লেখা হলো পড়া কত পাতা?”
নজরুল স্কুলের প্রথাগত বাঁধা ধরা নিয়মকানুনে ছিলেন অসহিষ্ণু। তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন শিশুদের মুক্ত জীবন ও মন কখনো বন্দী কারাগারের মত পাঠশালায় থাকতে যায় না।এই জীবন মুক্ত ও স্বাধীন। তাঁর ইচ্ছা প্রজাপতির মত মুক্ত জীবন-
“মোর মন যেতে চায় না পাঠশালাতে
প্রজাপতি! তুমি নিয়ে যাও সাথী করে তোমার সাথে।”
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন শিশু মনস্তত্ত্ব। তিনি শিশুর প্রতি অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে শিশু সাহিত্যকে প্রাণস্পর্শী ও আবেগময় করে তুলেছেন। তাঁর শিশু সাহিত্য এক বিস্ময়কর পৃথিবী। শিশু প্রেমিক নজরুলের প্রতিটি কবিতায় ফুটে উঠেছে শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম প্রীতি ও ভালোবাসা। বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্য তাঁর হাতে হয়ে উঠেছে সার্থক ও অনবদ্য।

x