নগর জুুড়ে আলোর ঝর্ণাধারা

কাশেম শাহ

শুক্রবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:২৪ পূর্বাহ্ণ
454

সন্ধ্যা হলেই নগরীতে যেন নেমে আসছে আলোর ঝর্ণাধারা। প্রায় সড়কেই ছড়িয়ে পড়ছে আলোর বিচ্ছুরণ। লাল, নীল, সবুজ নানা রঙের বাতিতে ঝলমল করছে নগরীর বিভিন্ন সড়কের দু’পাশ। সাথে উড়ছে চাঁদ তারকা খচিত পতাকা। মোড়ে মোড়ে দেখা মিলছে সুসজ্জিত-সুদৃশ্য তোরণের। যেখানে লেখা রয়েছে ‘আহলান সাহলান ইয়া মাহে রবিউল আউয়াল’। দেখে সহজেই বুঝা যায়, এসেছে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) এর মাস, এসেছে জশনে জুলুসের মাস। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে রবিউল আউয়াল এলেই তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ঐতিহাসিক জশনে জুলুসকে ঘিরে সুন্নী মুসলমানদের মাঝে নেমে আসে ঈদের আনন্দ। ১২ রবিউল আউয়াল উদযাপনে নেয়া হয় সর্বাত্মক প্রস্তুতি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বিমানবন্দর সড়ক থেকে ইপিজেড-বারিক বিল্ডিং-আগ্রাবাদ হয়ে জামালখান, কিংবা কর্ণফুলী সেতু হয়ে মইজ্জার টেক অথবা রাহাত্তার পুল, মুরাদপুর হয়ে বিবিরহাট, অক্সিজেন, সর্বত্রই লেগেছে আলোর ছোঁয়া। যেন সড়কে খেলা করছে আলোর রোশনাই। এমনটাই দেখা যাবে আগামী রোববার পর্যন্ত। সেদিন বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও উদযাপন করা হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ)। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়ায় শুভাগমনের দিনটি সারাদেশে উদযাপন করা হয় নানা অনুষ্ঠান ও ইবাদত বন্দেগির মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামে এ উপলক্ষে সবচেয়ে বড় আয়োজনটি করে আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট। গত ৪৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এ আয়োজন করে আসছে আধ্যাত্মিক এ সংস্থাটি। বছরে বছরে এ আয়োজন আরো বর্ণাঢ্য হচ্ছে, বাড়ছে পরিধি, লোক সমাগমের সংখ্যা।
সম্প্রতি আনজুমান ট্রাস্ট আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ট্রাস্টের উপদেষ্টা আলহাজ সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেছেন, এবারের
জুলুসে (র‌্যালি) ৬০ লাখ লোকের সমাগম হবে। তিনি বলেন, একটি নির্মল ইসলামী সংস্কৃতির প্রবর্তক হিসেবে আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৯৭৪ সাল থেকে এদেশে জশনে জুলুস চালু করেন। প্রতিবছর ১২ রবিউল আউয়াল চট্টগ্রামে ও ৯ রবিউল আউয়াল ঢাকায় জুলুস বের হচ্ছে। এখন সারাদেশে অসংখ্য দরবার, ইসলামী প্রতিষ্ঠান থেকে জশনে জুলুস বের করা হচ্ছে।
এর আগে পহেলা রবিউল আউয়াল স্বাগত র‌্যালির মধ্য দিয়ে মিলাদুন্নবী (দ) উদযাপনের আনুষ্ঠানিক শুরু করেছে গাউসিয়া কমিটি চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। সেদিন জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ থেকে বের করা হয় এ র‌্যালি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় য়োরম্যান আলহাজ পেয়ার মোহাম্মদ (কমিশনার) জশনে জুলুসের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে আজাদীকে বলেন, আল্লাহর রহমতে এবার আরো শানদার ভাবে জশনে জুলুসের আয়োজন করা হচ্ছে। একবছর পর আবারো জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন আওলাদে রাসুল (দ) হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মাজিআ)। তাই ভক্ত-মুরিদ, আশেকদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। সাথে আছেন দুই সাহেবজাদা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ (মাজিআ) ও আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামেদ শাহ (মাজিআ)।
জুলুস আয়োজনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও, ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের প্রায় সব উপজেলা থেকেই লোক সমাগম হবে। শনিবার রাতের মধ্যেই তারা চট্টগ্রাম এসে পৌঁছাবেন বলে আশা করছি।
বর্ণিল আয়োজন : নগরী ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সড়কে বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ। যেসব সড়কে জুলুস যাবে না সেখানেও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে উৎসবের এ আমেজ। সড়কে চলাচলকারী যে কারো নজর কাড়ছে রঙিন এ আলোকসজ্জা। ঈদে মিলাদুন্নবীর আয়োজনকে ঘিরে নগরজুড়ে আলোকসজ্জা, প্রস্তুতি বিষয়ে সাব কমিটির আহবায়ক মুহাম্মদ আজহারুল হক আযাদ বলেন, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের ১৩ সাংগঠনিক থানার আওতাধীন শাখাগুলোর সহায়তায় নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে আলোকসজ্জা এবং শতাধিক তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। আওলাদে রাসুলের আগমনের খুশিতে জশনে জুলুসকে বরণে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা : জশনে জুলুসকে ঘিরে আনজুমান ট্রাস্ট, গাউসিয়া কমিটির নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনর পুলিশের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে ব্যাপক নিরাপত্ত ব্যবস্থা। মঙ্গলবার দামপাড়া পুলিশ লাইনের সিএমপির সম্মেলন কক্ষে আনজুমান ট্রাস্ট নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবর রহমান। গতকাল রাতে দৈনিক আজাদীকে পুলিশ কমিশনার বলেন, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে আগামী রোববার নগরীতে ‘জশনে জুলুস’ (ধর্মীয় শোভাযাত্রা) ঘিরে পুলিশ বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। শোভাযাত্রায় যেন কেউ ব্যাগ বা পোটলা নিয়ে অংশ নিতে না পারে এবং দুষ্কৃতকারীরা মুসল্লির ছদ্মবেশে বিশৃক্সখলা সৃষ্টি করতে না পারে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইন-শৃক্সখলা জনিত যেকোন জরুরি সেবা পেতে ৯৯৯ যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও আইন শৃক্সখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়নে সার্বিক দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন সিএমপি কমিশনার। এদিকে আলহাজ পেয়ার মোহাম্মদ বলেন, আনজুমানের নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স এএসএফ ছাড়াও গাউসিয়া কমিটির ২০ হাজারের অধিক স্বেচ্ছাসেবক থাকবে জুলুসের শৃক্সখলা রক্ষার্থে।
জুলুস যেন উৎসব : গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতেয়ার বলেন, চট্টগ্রামবাসীর কাছে ঈদে মিলাদুন্নবীর জুলুস উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রিয় নবীর আগমন দিবস আনন্দ সহকারে উদযাপন করার বিধান শরীয়ত সম্মত। ফলে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ’ জুলুসে রূপ লাভ করা চট্টগ্রামের জশনে জুলুস এখন চট্টগ্রামবাসীর কাছে ঈদের উৎসবের চেয়ে কম কিছু নয়।

x