ধুলা ঠেকানোর জন্য তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে

রবিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

গত ১২ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ক্যাপশন ছিল এরকম : ‘কুয়াশা নয়, ধুলা। ধুলোয় ঢাকা আরাকান সড়ক।’ আমাদের শহরে শীত এখনো জেঁকে বসেনি। তাই শীতের কুয়াশাও তেমন দৃশ্যমান নয়। কিন্তু দিনভর আকাশ ঢাকা থাকছে ধোঁয়ায়। কুয়াশায় আচ্ছন্ন। দুপুরেও মনে হয় যেন সকাল হয়েছে মাত্র। শুধু আরাকান সড়ক নয়, অধিকাংশ সড়কের সংস্কার কাজ ও ওয়াসার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে নগরজুড়ে এখন ধুলোর রাজত্ব। অবশ্য আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসে ক্ষতিকর ধুলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় নগরের কোথাও কোথাও এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বাতাস যে একেবারেই অস্বাস্থ্যকর তাও প্রকাশ পাচ্ছে এই ধুয়াশায়। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, নগরায়ন ও শুষ্ক মৌসুমের ফলে নগরীর আকাশে ছোট ছোট ধূলিকণা ভেসে বেড়াচ্ছে। যে কারণে মনে হচ্ছে কুয়াশা পড়েছে। ধুলিকণা নির্ধারিত মানমাত্রার অধিক পরিমাণে বায়ুমন্ডলে উপস্থিত থাকার কারণে বাতাসের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করছে।
এই ধুলার কারণেই নগরবাসীকে দিনরাত নাকাল হতে হচ্ছে নানাভাবে। ঘর থেকে বের হওয়া মাত্র চোখে ঝাপসা দেখতে হয়। বাতাস এত বেশি পরিমাণে দূষিত যে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আর তাই শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। শহরে বাড়ছে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বাতাসে উড়ছে বিভিন্ন রোগের জীবাণু। বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যান্য রোগের আক্রমণ। শহরজুড়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও সেখানে রোগীদের ভিড় দেখে বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। নগরী হয়ে পড়ছে শ্রীহীন। একসঙ্গে কয়েকটি উন্নয়ন কাজ চলায় ধুলায় নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীকে; এই দুর্ভোগ এড়াতে তেমন কোনো পদক্ষেপও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।
ধুলোর কারণে নগরে বেড়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ধুলোযুক্ত বাতাস গ্রহণের ফলে প্রাথমিকভাবে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি অনেক বেশি। ক্যান্সার তৈরির সঙ্গে যুক্ত কিছু রাসায়নিক- ইউরিয়া, প্যারাবিন, থ্যালেট, পেট্রোলিয়াম বাই প্রডাক্টস ও প্রোপাইলিন গ্লাইকল পানির সঙ্গে মেশে না। এগুলো ধুলার সঙ্গে বাতাসে উড়তে থাকে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে গিয়ে ধীরে ধীরে ফুসফুসে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। সর্দি-কাশিতো এখন সাধারণ ঘটনা। সর্দি-কাশি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘যেসব শিশু ধুলার সংস্পর্শে আসে তাদের ১০০ জন শিশুর মধ্যে ১০ জন শিশুরই এ্যাজমা বা হাঁপানি হয়। আর বড়দের মধ্যে শতকরা ৭ থেকে ৮ জন আক্রান্ত হন ক্রনিক ব্রংঙ্কাইটিসে।’ তাঁরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ধুলার মধ্যে যদি দূষিত দ্রব্যের কণা মিশ্রিত থাকে, তাহলে তা থেকে হতে পারে ফুসফুসের ক্যান্সার।’ এখন ঘরে ঘরে শিশুরা সর্দি, কাশি, জ্বর, হাঁপানিতে আক্রান্ত হচ্ছে। কফ জমে আছে তাদের বুকে। এই সংখ্যাও কিন্তু আশংকাজনক হারে বাড়ছে।
শহরজুড়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজ চললেও অনেকের মতে এসব সংস্থার কাজের মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। আজ এ রাস্তা খুঁড়ে মেরামত করছে, কাল আবার আরেকপক্ষ এসে সেই একই রাস্তা খুঁড়ে কয়েকমাস ফেলে রাখছে। এভাবেই চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির এই যাত্রাপালা। অথচ সব সংস্থার কাজ যদি সমন্বয়ের মাধ্যমে করা হতো, কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে যদি অহেতুক দেরি বন্ধ করা যেত, যদি ভবন নির্মাণকারীদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা যেত, ধুলা-ময়লা ব্যবস্থাপনার জন্য যদি ব্যাপক কোন উদ্যোগ নেয়া হতো তাহলেও কিছু পরিবর্তন আসতো। বন্ধ হতো ধুলার ছড়াছড়ি। ধুলা ঠেকানোর জন্য সিটি করপোরেশনের তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। প্রকল্প এলাকায় ট্রাক থেকে যেভাবে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, তার মাত্রা আরো বাড়াতে হবে। যেভাবেই হোক, ধুলা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বর্তমান প্রজন্ম রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়বে। পরবর্তী প্রজন্ম মেধাশূন্য হয়ে জন্ম নিবে। শুধু তাই নয়; নানারকম রোগ নিয়েই জন্ম নেবে নবজাতক। বড় হয়ে তারা অভিশাপ দিবে বর্তমান প্রজন্মের মেধাবীদের।

x