ধর্ষণ-মামলায় দ্রুত বিচারের সংস্কৃতি চালু হোক

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ at ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
15

ধর্ষণ বাড়ছেই। আশে-পাশে। চারদিকে। সারা দেশে। বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতাও। কঠোর আইন, প্রচার-প্রচারণা ও উচ্চ আদালতের নানা ধরনের নির্দেশনার পরও নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো যাচ্ছে না। উল্টো, দিনকেদিন এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। তরুণ, যুবক, মধ্যবয়সী এমনকি বৃদ্ধকেও দেখা যাচ্ছে এ অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে। এককথায় নারী-ধর্ষণ, শিশু-ধর্ষণ ঠিকই চলছে তার দূষিত ঐতিহ্য দিয়ে।
নতুন বছরের শুরুতেই অর্থাৎ ৩ জানুয়ারি একটি অনলাইন নিউজপোর্টালের খবরে দেখলাম- আশুলিয়ায় ধর্ষণের শিকার চতুর্থ শ্রেণির এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। ৬ জানুয়ারি দেখলাম- পঞ্চগড়ে ধর্ষণের শিকার ১৩ বছর বয়সী কিশোরী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যার খবর। একই দিনে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে ‘ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে এক স্কুলছাত্রীকে পাশবিক নির্যাতন করেছে এক লম্পট’- সেই খবরও পড়লাম। ১০ জানুয়ারি দেখলাম- ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে ‘বান্ধবীর সহযোগিতায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গণধর্ষণ করেছে পাঁচ দুর্বৃত্ত।’ একই দিনে দেশের সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগে স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। তবে- ৫ জানুয়ারিতে ঘটে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা তো সারা দেশে ব্যাপক ঝড় তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর এক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২ জন। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এদিকে, ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী।
এছাড়া, নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭০ জন। ২০১৯ যৌন হয়রানির শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তাছাড়া, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬৭ জন নারী। তাদের মধ্যে নির্যাতনে নিহত হন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন তিনজন। আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৪২৩ জন নারী। এই ২০১৯-এ, ২০০ জন নারী তাদের স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন যেখানে ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭৩ জন।
এর বাইরে অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া এবং সালিশি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন অনেক নারী। ২০১৯-এ, তিনজন নারী ফতোয়ার কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মধ্যে একজন পরে আত্মহত্যা করেন (সূত্র: ডয়েচেভেলে ডটকম, ৪ জানুয়ারি ২০২০)।
আমি মনে করি, নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি-ই দায়ী। সমাজের ভিতরে অসংখ্য উপাদান আছে যা ধর্ষণ বা নারীর প্রতি সহিংসতাকে প্রতিনিয়ত উস্‌কে দিচ্ছে। একটি ধর্ষণের বিচার যখন দীর্ঘসূত্রিতার ফিতায় ঝুলে থাকে কিংবা আইনের খাতায় লিপিবদ্ধ হওয়ার আগেই ভিকটিমকে ভয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট করা হয় তখন ধর্ষকামীরা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আর বিচার না হলে তো কোনো কথাই নেই। এই পাশবিক উল্লাস বাড়তে থাকে বহুগুনে। ছড়িয়ে পড়ে দিকে-দিকে।
খবরে প্রকাশ- যেসব ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয় সেগুলোর ক্ষেত্রে শতকরা মাত্র তিন ভাগ অপরাধী শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায়। আর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শাস্তি হয় মাত্র শূন্য দশমিক তিন ভাগ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে- এ ধরনের কোনো ঘটনার বলতে গেলে তেমন কোনো বিচারই হয় না।
কিন্তু কেনো? এমন তো কথা ছিলো না। একটি দেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ন্যায়বিচার পাবে- এটাই সাংবিধানিক প্রথা। কেনো এই সমাজে ধর্ষণের শিকার নারীর চেয়ে ধর্ষক শক্তিশালী হয়ে ওঠবে? কেনো ধর্ষক সামাজিকভাবে প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মরিয়া হয়ে ওঠবে? নারীদের সামাজিকভাবে সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্র সেটা পালন করতে পারছে না কেনো? কেনো সমাজে এখনো নারীকে ভোগের সামগ্রী মনে করা হবে? তাকে সেভাবে উপস্থাপনও কেনো করবে গণমাধ্যম? আমার ক্ষুদ্র মাথায় ঢুকে না। শুধু ভাবি- পুঁজিবাদ, অন্যায়, লোভ আর লাভের এমন সর্বগ্রাসী ক্ষুধা কি আমাদের মনুষ্যত্ববোধকেও সমূলে উৎপাটন তবে করেই দিলো?
অবাক হই যখন দেখি- ৬০ বছরের এক লোক সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণ করেছে। যন্ত্রণা হয় এই ভেবে যে- চকোলেটের লোভ দেখিয়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে কীভাবে পাশবিক অত্যাচার করে তার পিতার বন্ধু! যারা এ ধরনের অপরাধ করছে, তাদেরকে আগে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন তাঁর এক লেখায় বলেছেন- ‘তাদেরকে উন্মুক্ত জনবহুল স্থানে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শরীরে থু-থু নিক্ষেপ করার পর পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।…একজনকে শাস্তি দেওয়া গেলে অন্যরাও সতর্ক হবে। এভাবে সামাজিক ব্যারিকেড তৈরি করতে পারলে এসব অন্যায় কমার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে।’
সামাজিক মূল্যবোধকে সংস্কৃতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে নারী ও শিশু নির্যাতন আগের বছরের চেয়ে পরের বছরে দ্বিগুণ হওয়ার বিষয়টি আমাদের সামনে থেকে দূর হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি কোনো একক সত্তা নয়, ব্যক্তি সামাজিক সমষ্টির অংশ। ব্যক্তিকে তার কার্যকলাপ শিখতে দিতে হবে। মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। তার আগে নির্যাতিত হয়ে নুসরাত অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েছিল। সেখানে সে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নুসরাতের পরিবারকে অনবরত হুমকি দেওয়া হয়েছে। এরপরও তারা থেমে থাকেননি। নুসরাত মরে গিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে। অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণের সব মামলায় আমরা বিচার দেখি না। অনেক সময় বিচার না পেয়ে অপমানে-লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয় ভুক্তভোগীদের। কুর্মিটোলার ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রী যেন ন্যায়বিচার পান, তাকে যেন তার স্বাভাবিক জীবন-কর্মে ফিরতে সহায়তা করা হয়। এখন সময় এসেছে ধর্ষকদের কড়া বার্তা দেওয়ার। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে এই বার্তা দিতে হবে যে- ধর্ষক তোমার রেহাই নাই।
আমি জানি- এই লেখার পরও ধর্ষণের ঘটনা একইভাবে ঘটতে থাকবে। এই সমাজে। এই দেশে। একইভাবে ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু হত্যার চক্র চলতে থাকবে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। তবু বিশ্বাস করি- এসবক্ষেত্রে কেবল বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘দ্রুত বিচারের সংস্কৃতি’ কার্যকর অর্থে ব্যাপকভাবে চালু হলেই আশু প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত হতে পারে। উপহার পেতে পারি আমরা একটি সুন্দর-স্বাভাাবিক এবং নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ। সেই দিন কবে দেখবো আমরা? সেই সংস্কৃতি চালু হবে কবে?