ধর্ষণ কেন বাড়ছে

নির্মূলে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ, পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
155

ধর্ষণ বাড়ছে, বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ঠুরতা। কখনো বিউটি, কখনো সীমা কিংবা ইয়াসমিন, কখনো রূপা, তনু, নুসরাত- এদের অসময়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। যে সময়টাতে তাদের স্বপ্ন দেখার, বাঁচতে শেখার কথা, সেই সময় তাদের চলে যেত হলো নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে।
সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, কর্মহীনতা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রসার; সর্বোপরি নারীর প্রতি পুরুষের হীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য। শিশু থেকে কিশোরী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা, স্কুল ছাত্রী থেকে পোশাককর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী এমন কি ভিখারিনীও রেহাই পাচ্ছে না মানুষরূপী এসব হায়েনাদের হিংস্র থাবা থেকে। ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ঘটাচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। একাধিক সংস্থার হিসাবে গত ছয় বছরের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে যতটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে গত ৬ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে। সে হিসেবে এ ভয়াবহ অপরাধ এখন দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ধর্ষিতাদের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ হচ্ছে, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন হচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে। মিছিলে স্লোগান উঠছে, অপরাধীর ফাঁসি চাই। আল্টিমেটাম দেওয়া হচ্ছে কখনো ৪৮ ঘণ্টার, কখনো আবার তিন দিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, অন্য ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় পুরনো সব ঘটনা।
ধর্ষণ রুখে দিতে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, প্রতিটি পরিবারে যেমন কন্যা সন্তান আছে, তেমনি ধর্ষকরাও কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান। তাই ধর্ষণের মতো সামাজিক মরণব্যাধি নির্মূলে প্রতিটি পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে, পাশাপাশি মিডিয়াতে এ ধরনের ঘটনা প্রচারে আরো কৌশলী হতে হবে।
বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। মানুষের মধ্যে যে আদিম প্রবৃত্তি, তা দমিয়ে রাখতে হলে শৈশব থেকে বা পরবর্তীতে স্কুল-কলেজে যথাযথ জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার মধ্যে সাইকোলজিক্যাল একটি ব্যাপারও কাজ করে। কোনো স্থানে একজন করল, তা প্রচার হওয়ার পর দেখা যায়, এক নাগাড়ে এখানে-ওখানে হতেই থাকে। এটা হয় কারণ, যাদের মধ্যে সেই আদিম মনোবৃত্তি দমানো যায়নি তারা ঘটনার সংবাদটি জেনে উদ্বুদ্ধ হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিউইয়র্ক শহরে প্রচুর খুনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তারা সেটা সেভাবে প্রকাশ করে না ওই একই কারণে। যখন কেউ ধর্ষণ করে বা হত্যা করে তখন সে আনকনশাস থাকে। অবদমিত প্রবৃত্তি তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ ধরনের ঘটনা বাড়তে দিলে তো সামাজিকীকরণ থাকবে না। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হওয়া উচিত, পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন ও মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কটা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগটা হচ্ছে না। মূল্যবোধ, আদর্শের অবক্ষয় হচ্ছে। বিকৃত যৌন আগ্রহের সৃষ্টি হচ্ছে। সমপ্রতি কয়েকটি ঘটনায় দেখলাম ধর্ষকের ভূমিকায় বিবাহিতরাই। পরিবারে অভিভাবকের শাসনটাও হচ্ছে না, শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যৌন শিক্ষার ধারণা না থাকায় যৌন আগ্রহটা বেশি। ধর্ষণের সময় ধর্ষক মনে করছে আমরা এনজয় করছি। চারদিকে দেখছি ধর্ষকের পর এভাবে মেরে ফেলে নদীতে ফেলে দেয়া হচ্ছে। অশিক্ষিত ধর্ষকরা তারই অনুসরণ করছে।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতাদের মতে, থানায় দায়ের হওয়া মামলা এবং পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে নারী ও শিশু ধর্ষণের প্রকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনা ভিকটিমের পরিবার গোপনের চেষ্টা করে। কিন্তু এরপর যে তথ্য পাওয়া যায় সেটা ভয়াবহ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার অভাবে বাড়ছে ধর্ষণের মতো ঘটনা। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এসব পরিবার সব সময় নানা ধরনের টানাপড়েনের মধ্যে থাকে। এর সুযোগ নেয় এক ধরনের নরপশু। তারা সুযোগ বুঝে এসব পরিবারের শিশুদের নিজের কাছে নেয় এবং অবুঝ শিশুরা তাদের লালসার শিকার হয়। সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে বেশিরভাগ নারী বিচার চাইতে যান না। আবার যেসব নারী বিচার চাইতে যান, তাদের পুলিশ, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যথেষ্ট হেনস্তা হতে হয়। ধর্ষণের অভিযোগগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণ হয় না। এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে ঘটনার তদন্ত প্রভাবিত হওয়া।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ নারীর বয়স ১৮ বছরের মধ্যে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বেশিরভাগ সময় ধর্ষণের শিকার ওই নারীর সাথে ধর্ষকের বিয়ে দিয়ে অথবা ভুক্তভোগীর পরিবারকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলা হয়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে পড়েও অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। তারপরও ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে আসা নারীর সংখ্যা বাড়ছে।