ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে দরকার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান

শনিবার , ১৩ জুলাই, ২০১৯ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
40

প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একাদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় (বাজেট) অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ ধরনের জঘন্য কার্যকলাপ কখনও মেনে নেয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘আমাদের আইন আরো কঠোর করা দরকার, আরো কঠোরভাবে তাদের (এসব অপরাধীদের) শাস্তি দেয়া দরকার। কারণ এই ধরনের জঘন্য কার্যকলাপ কখনও মেনে নেয়া যায় না।’ এ ব্যাপারে তার সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
আসলে দেশে বর্তমানে ধর্ষণ-খুন যেন মহামারী আকার ধারণ করেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বা এ সংক্রান্ত অপরাধ চেষ্টার পর নারী ও শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে বেপরোয়াভাবে। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের একটি পরিসংখ্যান পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। সেই অনুযায়ী ২০১৮ সালে সারাদেশে ৪৩৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ২২টি শিশু। যৌন নির্যাতনের ফলে মারা গেছে একজন। এছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল ৫৩টি শিশুর ওপর। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা গেছে ২৭১টি শিশু। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ১ হাজার ৬ জন। দিন দিন খুন, হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন যেভাবে বাড়ছে তাতে আমরা সভ্য সমাজে বাস করছি কিনা, এমন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এইদেশে একটা দিনও বাদ যায় না যেদিন কোনও ধর্ষণের ঘটনা পত্রিকার পাতায় প্রকাশ হয় না। আর অপ্রকাশিত শত ঘটনার কথা না হয় বাদই দিলাম। তবুও এর প্রতিকারে কিছুই করা যায় না। ধর্ষণ এই সমাজের কাছে কেবলই ধর্ষণের শিকার নারী আর তার পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয়। বৃহত্তর সমাজের, বিশেষ করে, পুরুষের ধর্ষণে কোনও ক্ষতি নেই।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ একটি মানসিক বিকৃতি। একজন মানুষের মনুষ্যত্ব যখন শূন্যের কোঠায় চলে আসে তখনই সে ধর্ষণ নামক একটি পৈশাচিক অপরাধ করে। তাঁরা বলেন, ধর্ষণের মূল কারণ হচ্ছে- পারিবারিক শিক্ষার অভাব, নৈতিক শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, যৌন শিক্ষার অভাব, ইভটিজিং, অপসংস্কৃতির প্রভাব, মোবাইল পর্নোগ্রাফি, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, নারীর প্রতি জেদ, বাজে সঙ্গ, মাদকাসক্তি, নারী-পুরুষের সমঅধিকারের অপব্যবহার এবং সর্বোপরি আইনের শাসন প্রয়োগের দুর্বলতা। ধর্ষণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে ইভটিজিং। ইভটিজিং যারা করে তারা যদি সঠিক সময়ে বাধা না পায়, বা সংশোধনের সুযোগ না পায় তাহলে তারা পরবর্তীতে ধর্ষক হিসেবে পরিণত হয়। নারীর সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা পুরুষকে মোহিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই বলে আচরণের বহিঃপ্রকাশ পশুর মতো হতে হবে কেন? আমাদের দেশে যদিও এখন অনেক সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু তারপরও ইভটিজিং বন্ধ করতে না পরলে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, আমাদের কিছু সামাজিক অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচার অথবা মানুষ খুন করা, ছোট শিশুদের খুন করা- যখন ঘটনা ঘটে এবং এরপর পত্রিকায় সংবাদ হয়- তারপরে যেন এর হারটা বেড়ে যায়। তিনি ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা চ্যানেলগুলোর উদ্দেশে ধর্ষকদের চেহারাটা বার বার তুলে ধরার আহবান জানান। যাতে তাদের যেন লজ্জা হয়। এসব সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে পুরুষদেরকেও নারীদের পাশাপাশি প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্‌বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু মেয়েরাই এর প্রতিবাদ করবো কেন? এখানে পুরুষ সমপ্রদায়ের জন্য লজ্জার বিষয় যে তারা এই অপরাধটা করে যাচ্ছে। সেজন্য আমাদের পুরুষ সম্প্রদায়কেও আরো সোচ্চার হতে হবে বলে আমি মনে করি।’
আশার কথা, ধর্ষণের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে বাড়ছে সামাজিক সচেতনতা। ব্যক্তি-পরিবার, রাষ্ট্র-সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে শুরু হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। বিগত কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনার পর তারুণ্যের জাগরণই লক্ষ করা গেছে বিশেষভাবে। তবু আমরা মনে করি, ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে দরকার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান। এক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর করতে পারে। কেননা, ধর্ষণের মতো নীতিবিবর্জিত কাজ কারোরই কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট থাকবেন-সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

x