“দ্য বিউটি মিথ”

শাফিনুর শাফিন

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ
147

চুলের ধরণ, স্তন বা ঊরু দেখতে কেমন বা চোখের চারপাশে বলিরেখা বোঝা যাচ্ছে অথবা আলমারিতে তুলে রাখা পোশাকগুলো পরলে আসছে শীতে সুন্দর দেখাবে কিনা এসব নিয়ে ভেবে ভেবে নষ্ট করার মতো সময় যদি আপনার হাতে থাকে তাহলে আপনার জন্যই নাওমি ওলফ একটি বই লিখেছেন “দ্য বিউটি মিথ: হাউ ইমেজেস অভ বিউটি আর ইউজড এগেইনস্ট উইমেন” নামে। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯১ সালে। বের হবার পর রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দেয়। সৌন্দর্য সংক্রান্ত নারীদের ভাবনার জগত কতটা পুরুষ নিয়ন্ত্রিত তা তিনি এই বইতে দেখান।
ওলফ যুক্তি দেখান যে সৌন্দর্য হচ্ছে “পুরুষের আধিপত্যকে বজায় রাখার সর্বশেষ, সর্বোত্তম বিশ্বাসের ব্যবস্থা”। কোন না কোনভাবে আমরা এই ধারণাতে আটকে আছি যে সুন্দর আমাদের হতেই হবে, নইলে কেউ আমাদের ভালোবাসবে না। আমাদেরকে চিকন গড়ন, তরুণ, মসৃণ ত্বক, ছোট নাক, রেশমি চুল ইত্যাদির অধিকারী হতে হবে। এদিকে গড়পড়তা নারীদের বেশিরভাগই তাদের সারাজীবন নিজেদের কুৎসিত, দেখতে ভালো না এবং বয়সের ছাপ পড়ে গেছে এই ভেবে হীনমন্য দিন পার করেন। নিজে যা তাই যে ভালো তাই বা কজনে বোঝে বা বুঝতে পারে?
ওলফ একে বোঝাতে “সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র” বলে অভিহিত করেন; যদিও কল্পনা করা মুশকিল যে ঠিক কারা কারা এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিতে পারেন। শারীরিক সৌন্দর্যের যেসব সামাজিক ধ্যান ধারণা এগুলো আরও বেশি হালে পানি পায় মাস-মিডিয়ার কল্যাণে। যেন নারীর খুঁত থাকা মানেই নারীর লজ্জা। বয়স বাড়লেই নারীদের অদৃশ্য করে দেয়ার যে সংস্কৃতি তার উদাহরণ দিতে গিয়ে ওলফ মিডিয়ার প্রসঙ্গ এনেছেন। দেখা যায় টিভি মিডিয়াতে বয়স্ক উপস্থাপিকার উপস্থাপনা যতই ভালো হোক না কেন তাকে স্ক্রিনের সামনে থেকে সরিয়ে ব্যাকস্টেজে কাজ দেয়া হয়। তার জায়গায় চলে আসেন কোন এক অধিকতর কম বয়সী উপস্থাপিকা। ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় উপস্থাপকদের বেলায়। তাদের যতো বয়স বাড়ে, তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফলে উপস্থাপনায় তাদের চাহিদা বাড়ে। আবার দেখা যায় প্রেসিডেন্টদের স্ত্রীদের বা ফার্স্ট লেডিদের সুন্দর দেখাতে যতো মেকআপের ব্যবহার হয়, তাদের মুখের বলিরেখা মুছে দেয়া হয় তুলির ছোঁয়ায়- তার ছিটেফোঁটা প্রেসিডেন্টদের বেলায় হয় না। ভালোই বড় অংকের টাকা ঢালা হয় এই সৌন্দর্যের ধারণা জারি রাখতে। আর এতে করে বেশ চমৎকার আর স্পষ্ট এক ধারণা পাওয়া যায় যেন বয়স্ক এবং অসুন্দর নারীরা সেসব পণ্য কিনেন যা তাদের প্রয়োজন নেই। হতে পারে তা একটি এন্টি-এইজিং ক্রিম, বা বলা যায় নতুন ডিজাইনের ব্লাউজ (যদিও ডিজাইনটি পুরনোটার চাইতে খুব আলাদা কিছু নয়)। যেন এসব মুখে মাখলেই বা পরলেই বয়স কমে দেখাবে কিশোরী বা সদ্য তরুণীর মতো। ওলফ অবশ্য এইখানে পুরুষদের কথাও বলেছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে পুরুষদের জন্যও কিছু ক্ষেত্রে এমন পণ্যের আয়োজন দেখা যায় যাতে করে তারাও নিজেদের কুৎসিত আর বুড়ো ভেবে এসব পণ্য কিনে।
ওলফ দেখান যে নারী বিষয়ক পত্রিকাগুলো এক্ষেত্রে মানে সৌন্দর্য সংক্রান্ত প্রথাগত ধ্যান ধারণা বিক্রিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। দেখা যায় এসব সাময়িকী বা ম্যাগাজিন সাধারণ নারীদের মধ্যে নারীবাদের প্রসারের চাইতেও সেইসব ফর্মুলা প্রকাশ করে যেগুলোতে অবশ্যই ডায়েট, রূপচর্চা এবং সার্জারি সংক্রান্ত খবর বেশি থাকে। আর এভাবে সাময়িকীগুলো নারীদের কাছে টাকার বিনিময়ে তথাকথিত সুন্দর কিভাবে হওয়া যায় তার উপায় বাৎলে দেয়। আর এটা তারা করবে নাই বা কেন? এসব পশ্চিমা বিজ্ঞাপণের মাধ্যমেই তো বাজার থেকে সাময়িকী বা ম্যাগাজিনগুলোর টিকে থাকাও নির্ভর করছে! সৌন্দর্যের ধারণা সারাবিশ্বেই মূলত পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রভাবিত। তাই বিজ্ঞাপনেও দেখা যায়, ফর্সা রঙের মেয়ের কাছে সবাই হেরে যাচ্ছে। সৌন্দর্যের ধারণাগুলো যে বাস্তবে সবসময় ধোপে টিকে তা নয়। কোন নারী যদি সঠিক শেইপের হনও, দেখা যায় অনেকেই তাকে সন্দেহ করেন।
ওলফ বলেন, “এসব সৌন্দর্যের তথাকথিত ধারণাগুলো আসলে তেমন পাত্তা পেতো না যদি না নারীরা নিজেরা নিজেদের কুৎসিত না ভেবে নিজে যা তা নিয়ে খুশী থাকতো। যতক্ষণ পর্যন্ত নারীরা নিজেদের সুন্দর ভাবতে পারবে না ততক্ষণ আসলে কিচ্ছু করার নেই।“নারীর নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং তার আচরণ ব্যবহার এসব নিয়েই মাথা ঘামানো উচিত বলে ওলফ মন্তব্য করেন। সৌন্দর্য বা কুৎসিতের অথবা অসুন্দরের আসলে কোন নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। এটা যতদিন না বুঝতে পারবে নারীরা ততদিন বিভিন্ন রূপ-ত্বকের পণ্যসামগ্রীর বেচাকেনাও চলবে।
নারীবাদের ইতিহাসে এই বইটি বেশ সাড়া ফেলে দেয় এবং প্রকাশের এতো বছর পরেও দেখা যায় এই বইটি বেশ প্রাসঙ্গিক কারণ সৌন্দর্যের যে মাপকাঠির কথা বলা হয়ে থাকে তা আজও অপরিবর্তিত অনেকক্ষেত্রেই।

x