দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল অবকাঠামো সুবিধা ও চিকিৎসক নার্স বাড়ান

বুধবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:১০ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসক থাকার কথা একজন। অথচ বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার ৮৭১ জন মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন একজন। প্রশ্ন আছে চিকিৎসকের মান নিয়েও। এ ছাড়া প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি দুজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স আছে একজন। সংকট আছে রোগী অনুপাতে হাসপাতালে শয্যা সংখ্যারও। বৈশ্বিক প্রায় সব মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকলেও বার্ষিক ৯ শতাংশের বেশি হারে বড় হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের আকার ছিল ৩২০ কোটি ডলারের। ওই সময় থেকেই এ খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত খাতটিতে বার্ষিক যৌগিক প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই হার বিবেচনায় নিয়ে আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ শুধু স্বাস্থ্যসেবা খাতের আকার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়। যে কোন রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার কথা রাষ্ট্রের। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের এই পাঁচটি মৌলিক চাহিদা অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বৈশ্বিক প্রায় সব মানদণ্ডেই পিছিয়ে আছে এ দেশের স্বাস্থ্যখাত। স্বাস্থ্য সেবার জন্য এদেশের বড় বাধা আর্থিক বাধা। যদিও আমরা জানি স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু বরাদ্দ করা হয়েছে ২৭ ডলার, তবুও ৬৪ শতাংশ টাকা আসে মানুষের পকেট থেকে। এটা ঠিক যে আমাদের দেশের সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্য বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার স্বাস্থ্যসেবার রোডম্যাপ করে ফেলেছে। সরকারের একটি রোডম্যাপ থাকলেও এনজিও প্রশাসনিক গবেষণা ও উপদেষ্টা সংস্থার সহযোগিতা দরকার। কানাডার মডেলের মতো নার্সরা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ভালো হতো। এদেশে নার্সিং শিক্ষা শেষ করেও নার্স শুধু যন্ত্রচালিতের মতো কাজ করেন। স্বল্পসংখ্যক নার্সের পক্ষে অধিক মানুষের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ বা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা। সংজ্ঞায় বলা হয়েছে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ তার প্রয়োজনীয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা বহনযোগ্য ও যৌক্তিক খরচে পেতে পারবে। এজন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই বর্তমানে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজের আওতায় যার যার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অবকাঠামো ও জনশক্তির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা একটা বড় সমস্যা। উপজেলায় ১৫০শয্যার হাসপাতাল করা হলেও জনশক্তি ৫০ শয্যায় রয়ে গেছে। অর্থাৎ অবকাঠামো বাড়ানো হলেও জনশক্তি বাড়ানো হয়নি। এতে আমরা দেখাতে পারছি হাসপাতাল হয়েছে। কিন্তু সেখানে সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, হয়তো কোন হাসপাতালে অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন কিন্তু নার্স নেই। সাপোর্ট ফোর্স নেই। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম দুর্বলতা। আমাদের শহরগুলোয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। আমাদের রেফারেন্স সিস্টেম কাজ করছে না। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অতি মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। এর কারণে মানের প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। সুস্থ সেবা দেওয়ার মাধ্যমে যৌক্তিক মুনাফা অর্জনের যে বাণিজ্যিকীকরণ, সেটাতে দোষ নেই। কিন্তু অতি মুনাফার লক্ষ্যে বাণিজ্য চালানো বন্ধ করতে হবে। অতিমুনাফার বাণিজ্যিকীকরণে সঠিক সময় ধরে রোগীকে দেখা হচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও টেস্ট দিয়ে জনগণকে অযথা বেশি খরচের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজা দরকার। স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে ভালো হওয়া সত্ত্বেও সরকার দেশের সব মানুষের জন্য এখনও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে পারছেন না। অন্যদিকে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিনা মূল্যে চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে সরকারি হাসপাতালে নানামুখি সংকট রয়েছে। এ কারণে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় দরিদ্র থেকে বিত্তবান সবশ্রেণি পেশার মানুষের ন্যূনতম মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্থাৎ ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মূল জায়গা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। একে সচল রাখতে হবে।
স্বাস্থ্যখাতে আমাদের অগ্রগতি যে নেই, তা নয়। কিন্তু তাতে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। ভবিষ্যতের করণীয় ঠিক করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবার কাছে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছাতে হলে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়নও খুবই প্রয়োজন। সরকারি পর্যায়ে যে জনবল ও অবকাঠামো আছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ অবস্থায় অবকাঠামোগত সুবিধার সাথে সাথে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। বর্তমান টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত এবং সববয়সের সবার কল্যাণে কাজ করার যে প্রত্যয় রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

x