দেশের প্রথম বোন’স লাইব্রেরি চমেকে

মানব শরীরের ২০৬টি অস্থির সবকটিই থাকছে এখানে ।। মৃতদেহ নিয়ে বাণিজ্য বন্ধের আশাবাদ

রতন বড়ুয়া

মঙ্গলবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ
186

তাকেতাকে সারিসারি সাজানো নানান বিষয়ের এবং প্রখ্যাত লেখকের বইপুস্তকে সমৃদ্ধ লাইব্রেরির সাথেই আমাদের সকলের কমবেশি পরিচয়। তবে বইপুস্তকের পরিবর্তে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অস্থি বা হাড় দিয়ে সাজানোগোছানো কোন লাইব্রেরি তেমন একটা দেখেনি দেশের মানুষ। যদিও মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে মানবদেহের একটি কঙ্কাল দেখতে পাওয়া যায় সচরাচর। কিন্তু মানবদেহে যে ২০৬টি অস্থি থাকে, তার সবকয়টি নিয়ে কোন লাইব্রেরি স্থাপনের তথ্য এর আগে বাংলাদেশে শোনা যায়নি। সেই প্রথম কাজটিই করেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক)। মানবদেহের অস্থির ১৫টি সেট নিয়ে (প্রতি সেটে ২০৬টি করে অস্থি) গড়ে তোলা হয়েছে বোন’স বা মানবদেহের অস্থির লাইব্রেরি। যা দেশে সর্বপ্রথম বলে দাবি চমেক প্রশাসন ও চমেক ছাত্র সংসদের। কেউ কেউ আবার এটিকে বিশ্বের প্রথম বলেও দাবি করেছেন, তবে উদ্যোক্তাদের সেই দাবির যথার্থতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মেডিকেল কলেজের নতুন একাডেমিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় মূল লাইব্রেরির পাশেই গড়ে তোলা এই লাইব্রেরির নামকরণ করা হয়েছে ‘অধ্যাপক মনসুর খলিল বোনস লাইব্রেরি’ নামে। লাইব্রেরিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে আস্ত একটা মানবদেহের কঙ্কাল। প্রথম দেখাতেই যে কেউ এটি দেখে শিউরে উঠবেন। একটু ভেতরে যেতেই দেখা মিলবে মাথা, বুকের পাঁজর, মেরুদণ্ড, হাতপা সহ মানবদেহের নানা অঙ্গপ্রতঙ্গের অস্থিও। বোঝার সুবিধার্থে প্রতিটি হাড়ের বৈজ্ঞানিক নামও লিখে রাখা হয়েছে। সেইসাথে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হাড়ের শারীরিক অবস্থান, হাড়ের নম্বর, হাড়ের কোন অংশের কী নামসহ যাবতীয় সকল তথ্যই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে লাইব্রেরিতে ১৫ সেট অস্থি সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্তত ২৫০ জন শিক্ষার্থী এসব অস্থি একাডেমিক কাজে লাগাতে পারবেন। অবশ্য, আগামী জানুয়ারির মধ্যে এখানে ৫০ সেট অস্থি সংরক্ষণের কথা জানালেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে লাইব্রেরিতে বোনস (অস্থি) ইস্যুকরণেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানে বসে শিক্ষার্থীরা যাতে অস্থি নিয়ে নানামুখী গবেষণা ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায় সেজন্য রাখা হয়েছে গোলাকার বেশকিছু টেবিলও।

প্রসঙ্গত, গত ৯ সেপ্টেম্বর ব্যতিক্রমী এই লাইব্রেরিটি উদ্বোধন করেন চমেক হাসপাতাল পরিচালনা পর্যদ সভাপতি ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। উদ্বোধনকালে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে মেয়র বলেন, ‘চমেক প্রশাসন ও কলেজ ছাত্র সংসদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে প্রথমবারের মতো বোনস লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল উদ্যোগ। এমন সৃজনশীল উদ্যোগ দেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসাথে এটি অন্যসব মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন মেয়র।

কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়২০১০ সালের দিকে চমেকের এনাটমি বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক মনসুর খলিল। মূলত ওই সময় থেকেই বোনস লাইব্রেরিটি স্থাপনের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা শুরু হয়। পরে কিশোরগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন অধ্যাপক মনসুর খলিল। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি না থাকলেও তাঁর চিন্তা বা পরিকল্পনা থেমে থাকেনি। চমেক প্রশাসনের সহায়তায় সর্বশেষ চমেকের বর্তমান ছাত্র সংসদ উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করেছে। কলেজের বর্তমান ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে রয়েছে সাব্বিরআকাশ পরিষদ।

চমেক প্রশাসনের তথ্য মতে, ২০১০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ১২০টি ডেড বডি হাসপাতাল থেকে পাওয়া গেছে। যারা নামঠিকানাবিহীন ছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নামঠিকানাবিহীন কিন্তু ননপুলিশ কেস ডেড বডিগুলোর একমাত্র দাবিদার মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগ জানিয়ে চমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আজাদীকে বলেন, হাসপাতালে এ ধরণের ডেড বডি থাকলে তা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের নিকট স্থানান্তর করার নিয়ম রয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ মানবদেহটি অন্তত তিন মাস সংরক্ষণ করে থাকে। কেউ যদি ওই মৃত ব্যক্তির স্বজন দাবি করেন, সেক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রমাণ দেখানো সাপেক্ষে ডেড বডিটি স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নয়তো, ডেড বডিটি কলেজ কর্তৃপক্ষের মালিকানায় চলে আসে।

নিয়মানুযায়ী ২০১০ সাল থেকে শতাধিক ডেড বডি পাওয়া গেছে জানিয়ে অধ্যক্ষ বলেন, আমাদের স্টক থেকেই সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, কুমিল্লা, কঙবাজার, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজসহ চট্টগ্রামের সবকয়টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে কঙ্কাল সরবরাহ করা হয়েছে। চমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেনআইন অনুযায়ী মরদেহ (ডেড বডি) কোন ভাবেই বেচাকেনার যোগ্য নয়। কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গও নয়, অস্থিও নয়। কিন্তু শিক্ষা উপকরণ হিসেবে এমবিবিএস শিক্ষার্থীরা যে অস্থি কিনে নেন, সেগুলো আইন লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বেচাবিক্রি করে থাকেন। দীর্ঘ দিন ধরে এই আইন লঙ্ঘন হয়ে আসছে। এই বিষয়টিতে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অস্থির সমন্বয়ে বোনস লাইব্রেরি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করেছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ডেড বডি বাইরে বেচাকেনা বন্ধ করা। অর্থাৎ ডেড বডি নিয়ে কেউ যেন আর বাণিজ্য করার সুযোগ না পায়।

প্রাথমিক ভাবে লাইব্রেরিতে ১৫টি মানবদেহের অস্থি সংরক্ষণ করা হয়েছে জানিয়ে অধ্যক্ষ বলেন, একটি মানবদেহে মোট ২০৬টি অস্থি থাকে। সে হিসেবে প্রতিটি সেটে ২০৬টি করে অস্থি রয়েছে। এই লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত অস্থি শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক কাজে ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। এতে করে চিকিৎসা শাস্ত্রের শিক্ষার্থী, চিকিৎসক ও শিক্ষকযদি করো কাছে কোন অস্থি প্রয়োজন পড়ে এই লাইব্রেরি, সেই প্রয়োজন মেটাবে। এখন যারা বাইরের দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া মূল্যে অস্থি কিনে একাডেমিক কাজে লাগান, তাদের আর সেগুলো কিনতে হবে না বলেও জানান অধ্যক্ষ।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এমবিবিএস পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এই বোনস লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে চমেক ছাত্র সংসদের ভিপি সাব্বির আহমেদ বলেন, শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় এক সেট বোনস কিনতে হয়। যা অনেকের পক্ষে কেনা খুবই কষ্টসাধ্য। এখন এসব শিক্ষার্থীদের এত টাকা খরচ করে বাইরে থেকে বোনস কিনতে হবে না। লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত মোট ১৫ সেটের মধ্যে কলেজের এনাটমি বিভাগ থেকে সাতটি সেট ও বাকি আট সেট বোনস ডোনেশন হিসেবে পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

x