দেশি প্রিন্ট মিডিয়া – আজাদী এবং আবেগ

মোস্তফা কামাল পাশা

সোমবার , ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ
19

অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্য। বাংলাদেশের একমাত্র প্রিন্ট মিডিয়া দৈনিক আজাদী অসাধারণ এক রেকর্ড গড়ে ফেলেছে! আজাদী কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সম্ভবত এটা জানে না, পাঠকতো অনেক দূর! রেকর্ডটা হচ্ছে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বাংলা দৈনিক আজাদী হচ্ছে দ্বিতীয় সেরা। যেটা টানা সর্বোচ্চ প্রচার সংখ্যা ধরে রেখে ৬০ বছর পথ পাড়ি দিচ্ছে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার পর বৃহত্তর চট্টগ্রামে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখে আঞ্চলিক দৈনিক আজাদী ৬০ বছর বা হিরক জয়ন্তীর মহাসড়কে এখন। জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক ৬৬ বছর পার করলেও প্রচার সংখ্যায় জাতীয় পর্যায়ে অনেক পিছনে পড়ে গেছে। এমনিতে দেশ বিশেষ করে চট্টগ্রামে পত্রিকার জন্মমৃত্যুর হিসাব রাখা খুবই কঠিন। জন্মহারের তুলনায় মৃত্যু হার অবিশ্বাস্য।
চট্টগ্রামে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই অসংখ্য সংবাদপত্র জন্ম হয়েছে। সবগুলোর কুষ্ঠি আছে সম্ভবত অগ্রজ সহকর্মী মরহুম কাজী জাফরুল ইসলামের বইয়ে। দৈনিকের সংখ্যাও অগুনতি। এ’ছাড়া দেশে প্রকাশিত পত্র পত্রিকার হিসাব নিয়ে বসলে বাস্তবিক অর্থেই মাথা আউলা হয়ে যাবে! অতো ক্লেশ নিচ্ছিও না। পত্রিকার আয়ু ক্ষীণজীবী হওয়ায় অন্তত ৯৫% কাগজ মানুষের মনে স্থায়ী দাগ বা আঁচড় কোনটাই রাখতে পারেনি। তুলনায় দৈনিক আজাদীর জন্ম অনেক পরে। পাকিস্তানের আইয়ুবশাহীর আমলে। ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। বিস্ময় মানতে হয়, যেখানে কোন দৈনিক পত্রিকাই ঠিকছে না। জন্মের চে’ মৃত্যু ‘ দ্রুততর! তার উপর ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবের নিষ্ঠুর সামরিক স্বৈরাচার!
পাকিস্তান জন্মসূত্রেই ছিল একটি বিকলাঙ্গ শিশু। এক ঠ্যাং আকাশে-আরেক ঠ্যাং পাতালে! অর্থাৎ দেড় হাজার কিলোমিটারের চেয়ে বেশি দূরত্বে দেশটির দু’টো পাখা বা রিহম. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান! মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আজব আবিষ্কার! নিজে ধার্মিক না হয়েও ধর্মের রশিতে আটকে দেশের বিচ্ছিন্ন দুটো অংশের সংহতি ধরে রাখার চেষ্টা করেন জিন্নাহ! ফলাফল, বিশাল অশ্বডিম্ব! যদি পূর্ব অংশকে উপনিবেশ বানিয়ে আখ মাড়াই কলে শোষণ করা না হতো, ধর্মের রশিটা আরো ক’বছর বেশি জোড়া লাগাতে পারতো হয়তো। চট্টগ্রামের রাউজানের প্রথম গ্র্যাজুয়েট ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক নিজের বিদ্যার যোগ্যতায় বড় চাকরি নিয়েও ছেড়ে দেন। লেগে থাকলে নিশ্চিত বিশাল ধনী ও প্রভাবশালী হতেন। আসলে সৃষ্টিকর্তা তাঁকে পাঠিয়েছেন আরো বড় মিশন দিয়ে। তিনি পছন্দ করতেন সৃজন ও মননশীল কাজ। নগরীর আন্দরকিল্লায় প্রতিষ্ঠা করেন, কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেস, কোহিনূর লাইব্রেরি, সাপ্তাহিক কোহিনূর পত্রিকা। তিনিই এ’ অঞ্চলে প্রথম ইলেক্ট্রিক প্রেস গড়েন। তাঁর সবগুলো প্রতিষ্ঠানই ব্যবসার চেয়ে সৃজন-মননকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। কোহিনূর প্রেস থেকেই ছাপা হয় বায়ান্নের ভাষা শহীদের বিচার চেয়ে মাহবুবউল আলম চৌধুরীর লেখা আগুনঝরা কবিতা- “কাঁদতে আসিনি- ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি”! একুশে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের পরপরই এমন কবিতা প্রকাশের সাহস ইন্‌িজনিয়ার সাহেবই দেখিয়েছেন! এই কবিতার জন্য প্রচুর মূল্য গুণতে হয়েছে তাঁকে। কবিতাটি পরবর্তীতে পুরো দেশের সম্পদ হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার খালেক সাহেব দেশের গুরুতর দুর্দিনে দৈনিক আজাদী প্রকাশের সাহস দেখান। ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় আজাদী। শুরুতে বর্তমান সম্পাদক এম এ মালেকসহ পরিবারের সব সদস্য ও নিকটাত্মীয় পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন, এটা সম্পাদক সাহেবের নিজের ভাষ্য। অনেক শ্রম ও কষ্টের সফলতা এখনকার আজাদী। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। ফজরের নামাজের পর কিছু ছিন্নমূল দরিদ্র মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে বিশেষ কমিশনে পত্রিকা বিক্রির কাজে নিয়োগ দেন। পুঁজির অভাবে এরা পিছটান দিতে চাইলে তিনি নিজেই এদের প্রাথমিক পুঁজি যোগান দেন। মূল পুঁজির ওপর ভর করে গড়ে তোলেন একদল পেশাদার হকার। পত্রিকার পেশাদার হকার তৈরিতেও আজাদীর অবদান বিশাল। একই সূত্রে ক্ষুদ্র খণ ও সামাজিক ব্যবসারও জনক বলা যায় তাঁকে। দুর্ভাগ্য, আজাদীতে কাজ করলেও তাঁকে দেখার সুযোগ হয়নি। দেখেছি নব্বই দশকের নিউজ ডেস্কের ঘেরাওয়ে তাঁর একটি ছোট ছবি। জ্যোতির্ময়, দ্যুতি ঠিকরানো এমন জীবন্ত ছবি জীবনে খুব কম দেখেছি! শ্রদ্ধায়-নুইয়ে আসে মাথা। অফিসে ঢুকেই অন্তত ত্রিশ সেকেন্ড তাঁকে দেখতাম। পুরো শরীর শক্তি-উদ্দীপনায় ‘রিচার্জড’ হয়ে যেত আমার! আশ্চর্য জ্যোতির্ময় কমনীয় ব্যক্তিত্ব! শুরুতে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সাহেব সম্পাদক এর দায়িত্ব পালন করেন। ৬২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। এরপর অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ পত্রিকা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। পারিবারিক সূত্রে খালেদ সাহেব ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মেয়ের জামাই। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব দেশের দুঃসময়ে শুধু আজাদী প্রতিষ্ঠা করেননি, পত্রিকাটির চমৎকার সার্কুলেশন নেটওয়ার্কও গড়ে দিয়ে যান। ফলে চট্টগ্রাম থেকে প্রচুর পত্রিকা বের হয়ে মড়কের ছোবলে হারিয়ে গেলেও আজাদী শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে যায়। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সাহেবের মত যোগ্য সম্পাদক এর নেতৃত্বগুণে ভিত্তি আরো সুসংহত হয়। শুধু তাই নয়, দ্রুত চট্টগ্রামের গণ মানুষের মুখপত্র হয়ে ওঠে আজাদী। আজাদী এমন এক কীর্তিও গড়েছে, যা ইতিহাসে বেনজির! ‘ ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে দেশের প্রথম দৈনিক হয়ে আজাদী প্রকাশিত হয় ১৭ ডিসেম্বর। এটাও এক বিরল রেকর্ড! এখন নগরীর ৭০ লাখ মানুষের কাছে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপের মত আজাদী ঘরে ঘরে অভ্যাসের নিত্যবস্তু। কারণ সোজা, চট্টগ্রামবাসীর নাড়ির স্পন্দন একমাত্র আজাদীই পড়তে পেরেছে। চট্টগ্রামবাসীর সুখে-দুখে পারিবারিক সদস্যের মত সবসময় পাশেই আছে আজাদী। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক খবরের চেয়ে চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের খবরই বেশি বেশি তুলে আনছে কাগজটি। পালন করছে অনেক সামাজিক দায়বদ্ধতাও। শুরুটা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের হাত ধরে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেস ও সাপ্তাহিক কোহিনূর পত্রিকা প্রচুর নতুন লেখক যেমন দেশকে উপহার দিয়েছে, তেমনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল কবি, লেখকের বইও প্রকাশ করে দিয়েছে।
চট্টগ্রামে আজাদীর আগে পরে মোটামুটি কিছু পাঠকপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হলেও মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ধারাবাহিক প্রকাশনাসহ প্রচার সংখ্যা ধরে রাখতে পেরেছে। কিন্তু কোনটাই আজাদীর ধারেকাছে নেই। চট্টগ্রামের বিপুল পাঠক চাহিদা পূরণে ঢাকার কিছু জনপ্রিয় দৈনিক তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কোন কোনটা আলাদা চট্টগ্রাম সংস্করণও বের করছে আধুনিক ছাপাখানা বসিয়ে। কোনটা বড় বাজার পেলেও আজাদীর সাথে জানামতে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেনা। চট্টগ্রামে ঢাকার কাগজের প্রথম ছাপাখানা চালু করে দৈনিক জনকণ্ঠ। কিন্তু অনেক আগেই তা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি জাতীয় পর্যায়েও কাগজটি এখন রুগ্ন দৈনিক। জনকণ্ঠও আজাদীর সাথে পাল্লা দিতে চট্টগ্রামে ছাপাখানা বসায়।
চট্টগ্রামে অন্য দৈনিকগুলোর সার্কুলেশন নানা কারণে ব্যাপক উত্থান-পতন ঘটলেও আজাদীকে এমন পরিস্থিতি কখনো মোকাবেলা করতে হয়নি। ঢাকার জনপ্রিয় পুরনো বাংলা দৈনিকগুলো নতুন কর্পোরেট দৈনিকগুলোর তুলনায় অনেক পেঁয়নে পড়ে গেছে। নতুন আঙ্গিক ও মাত্রার ‘আজকের কাগজ’তো বন্ধই হয়ে গেছে একযুগেরও বেশি আগে। জাতীয় ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দৈনিকগুলোর এত উত্থান পতনের মাঝেও চট্টগ্রাম মহানগর এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামে আজাদী একক শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে টানা। এটা খুব কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। পাঠকের রুচি বদলাচ্ছে খুব দ্রুত। অসংখ্য স্যাটেলাইট টি ভি, নিউজ চ্যানেল। এরপর শত শত এমনকি হাজারো অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও অনলাইন টিভিতে ছয়লাপ দেশের গণমাধ্যম। এর ওপর আছে বিদেশি টিভি চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্ফোরণ। আজাদীও প্রিন্ট মিডিয়া হলেও সময়ের সাথে তাল রেখে বেশ কটি অনলাইন সংস্করণের পাশাপাশি ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট চালু করছে। ফলে আঞ্চলিক দৈনিক হয়েও এটা এখন গ্লোবাল দৈনিক।
আসলে আজাদী মানেই চট্টগ্রাম- চট্টগ্রাম মানেই আজাদী। চট্টগ্রামের মাটি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সাহিত্যের সাথে আজাদী এমনভাবে মিশে গেছে,আজাদীকে বিয়োগ করে চট্টগ্রামকে কল্পনা করাও কঠিন। আমার সৌভাগ্য, সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ও উত্থান আজাদীকে লতিয়ে। আজাদী থেকে ছুটি নিয়ে চর্চাটা অনেক বাড়ালেও আজাদীর শিক্ষা বাদ দিয়ে টিকে থাকা ও নানা মাত্রায় নিজকে ভাঙচুর করা কল্পনাও করতে পারিনা! তাই আজাদী চট্টগ্রামবাসীর অভ্যাস হলেও আমার কাছে কিন্তু আবেগ। আবেগের প্রতিষ্ঠানটি গণ মাধ্যমের আধুনিক ধারণা এবং চাহিদা ধারণ ও বরণ করে হাজার বছর তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখুক এটাই কামনা।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

x