দেওয়ানহাট মোড় : ১০০ কোটি টাকা খরচ করেও আসেনি সুফল

ফুটওভারব্রিজ না থাকায় দিনরাত যানজট

হাসান আকবর

শুক্রবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ

মাত্র দেড় থেকে দুই কোটি টাকার একটি ফুট ওভারব্রিজের অভাবে একশ’ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তা এবং ওভারপাসের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী। নগরীর দেওয়ানহাট মোড়ের যান চলাচল গতিশীল করতে প্রায় ৯০ কোটি টাকা খরচ করে ডিটি রোড প্রশস্তকরণ এবং প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে একটি ওভারপাস নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রাস্তার উপর যত্রতত্র পথচারীদের হাতের ইশারায় থেমে যাচ্ছে গাড়ি। ভেঙে পড়েছে ট্রাফিক সিস্টেমও। এতে করে সকাল থেকে গভীর রাত অব্দি দেওয়ানহাট মোড়ে যানজট লেগে থাকে। অপরদিকে হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পারাপারকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে, এই পারাপারে নিয়মিত ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা। দিন কয়েক আগে এক বৃদ্ধের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চতুর্মুখী একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলে। সিডিএ বলেছে, ফুট ওভারব্রিজ করার দায়িত্ব তাদের নয়, সিটি কর্পোরেশনের। অবশ্য সিটি কর্পোরেশন বিষয়টি দেখবে বলে আশ্বস্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বছর কয়েক আগেও ঢাকাসহ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা গাড়ির জন্য চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রবেশমুখ ছিল দেওয়ানহাট। ঢাকা চট্টগ্রাম ট্রাংক রোড ধরে সব ধরনের গাড়ি অলংকার মোড় হয়ে দেওয়ানহাটে এসে নগরীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতো। দিনে দিনে ঢাকা চট্টগ্রাম ট্রাংক রোডে গাড়ির চাপ সামলাতে চরমভাবে ব্যর্থ হতে থাকে। পাহাড়তলী চালের বাজারসহ পুরো প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকতো। এরপর জাকির হোসেন রোড চালু করায় নগরীর শেষ রক্ষা হয়েছিল। পরবর্তীতে ডিটি রোড চালু করে যান চলাচলে গতিশীলতা তৈরি করতে প্রায় ৯০ কোটি টাকা খরচ করে অলংকার মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়। সিডিএ এই রাস্তা সম্প্রসারণের সময় বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখে পড়লেও সবকিছু ম্যানেজ করে রাস্তাটি ৭২ ফুট চওড়া করে সম্প্রসারণ করা হয়।
কিন্তু রাস্তাটি নির্মাণের পরও দেওয়ানহাট মোড়ে তীব্র যানজট লেগে থাকতো। পুরো এলাকা স্থবির হয়ে থাকতো যানজটে। এই অবস্থার উত্তরণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দেওয়ানহাটে প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে নতুন করে একটি ওভারপাস নির্মাণ করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ডবলমুরিং থানার সন্নিকট থেকে দেওয়ানহাটের উপর দিয়ে ধনিয়ালাপাড়া পর্যন্ত ১৮৫০ ফুট বা ৫৬০ মিটার লম্বা ফ্লাইওভারটির প্রস্থ রাখা হয়েছে ২৮ ফুট বা সাড়ে আট মিটার। ডিটি রোডের গাড়ি চলাচলের জন্য এই ওভারপাস নির্মাণ করা হয়। বলা হয় যে, ডিটি রোডের গাড়ি ওভারপাস দিয়ে উপরে উঠে গেলে নিচের টাইগারপাশ-আগ্রাবাদ রোডের গাড়ি চলাচলে প্রত্যাশিত গতিশীলতা তৈরি হবে। কিন্তু এত আয়োজনের পরও দেওয়ানহাট মোড়ের যান চলাচলের সুরাহা হয়নি। সকাল থেকে গভীর রাত অব্দি নগরীর ব্যস্ততম এই মোড়ে যান চলাচল থমকে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যানজট। সরজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায় যে, দেওয়ানহাট ওভারপাস দিয়ে ডিটি রোডের শত শত গাড়ি চলাচল করলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ নিচের রাস্তার মাঝ দিয়ে হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে পার হয় রাস্তা। কেউ কেউ ব্যারিকেডের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হয়। এতে গাড়ি চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতার। হচ্ছে যানজট। দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ থেকে নেমেই যেমন মানুষ জটলায় পড়ে তেমনি ওভারব্রিজে উঠার আগেও। পুরো ওভারব্রিজে জ্যাম লেগে থাকে সারাদিন। কখনো কখনো যানজট টাইগারপাস পর্যন্ত হয়। অপর পাড়ে শেখ মুজিব রোডের ফায়ার সার্ভিসের কাছ পর্যন্ত যানজট তৈরি হয়। দিনভর এই যানজটে স্থবির হয়ে থাকে দেওয়ানহাট মোড়। ঘটে দুর্ঘটনাও। দিনকয়েক আগে এভাবে রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ি চাপা পড়ে এক বৃদ্ধের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেওয়ানহাটের যানজট স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হলে রাস্তার উপর দিয়ে মানুষের পথচলা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। হাতের ইশারায় গাড়ি থামানো ঠেকাতে হবে। গাড়িকে গাড়ির পথে নির্দিষ্ট গতিতে চলতে দিতে হবে। অপরদিকে মানুষের রাস্তা পারাপারের পথও তৈরি করে দিতে হবে। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন নানা কাজে দেওয়ানহাটে আসেন। কেউবা রাস্তা পার হয়ে বিপরীত পাশ থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অন্য গাড়িতে ওঠেন।
দেওয়ানহাট মোড়ে একটি চতুর্মুখী ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব করে তারা বলেন, এখানে ওভারপাসের নিচ দিয়ে একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করে মানুষের রাস্তা পারাপারের সুযোগ করে দিতে হবে। চার দিক থেকে মানুষের উঠা-নামার পথ করে দিতে হবে। শুধু এপাড় ওপাড় করলে হবে না, দেওয়ানহাটের ডবলমুরিং থানা অংশে যেমন ডিটি রোড পারাপারের ব্যবস্থা রাখতে হবে তেমনি বিপরীত পাশের মসজিদের পাশ দিয়েও ডিটি রোড পারাপারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চতুর্মুখী ফুটওভারব্রিজ তৈরি হলে যে কোন একদিক থেকে মানুষ ব্রিজের উপরে উঠে নিজের প্রয়োজনমতো নেমে পড়তে পারবে। এতে করে নিচ দিয়ে এদিক ওদিক রাস্তা পারপারের জটলা থাকবে না। অপরদিকে দেওয়ানহাটের রাস্তার ডিভাইডারের উপরও উঁচু করে বাধা সৃষ্টি করতে হবে। যাতে লাফিয়েও লোকজন রাস্তা পার হতে না পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টিল স্ট্রাকচারের ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করলে সব সমস্যার সুরাহা ঘটবে। এতে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে জানান তারা।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। আমরা রাস্তা করে দিয়েছি। ওভারপাসও নির্মাণ করেছি। ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করার দায়িত্ব আমাদের নয়। তবুও আমরা মুরাদপুর এবং জিইসি মোড়ে তিনটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করে দিচ্ছি। আপাতত দেওয়ানহাট বা অন্য কোথাও কোন ফুটওভারব্রিজ করার পরিকল্পনা আমাদের নেই। বিষয়টি সিটি কর্পোরেশনের দেখা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের বিষয়টি আমরা জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করছি। রাস্তার যান চলাচল সাবলীল করতে এবং পথচারীদের প্রয়োজন হলে অবশ্যই আমরা ফুটওভারব্রিজ করে দেবো। বিষয়টি তিনি সক্রিয়ভাবে ভাববেন বলেও আশ্বস্ত করেন।

x