দুয়েকদিনের মধ্যেই হকার উচ্ছেদে অভিযান

বেহাত জমি উদ্ধারের পর নামজারির উদ্যোগ

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:২৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নামে জমির নামজারির উদ্যোগ নিয়েছে চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি। গতকাল সোমবার কমিটির সভায় এ উদ্যোগ গ্রহণ করে কাজ শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন কমিটির সভাপতি ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। চমেক ও হাসপাতালের বেহাত হওয়া জমি উদ্ধার করতে হলে আগে নামজারি সম্পন্ন করতেই হবে মন্তব্য করে মেয়র সভায় বলেন, নয়তো ভবিষ্যতে আরো জটিলতা বাড়বে। নাম জারি করতে শুধু চিঠি চালাচালি করলে হবে না। দৌঁড়-ঝাপও করতে হবে। নামজারির জন্য আগে কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এরপর সার্ভেয়ার দিয়ে সার্ভে করাতে হবে। আমাদের একজন এস্টেট অফিসারকে দায়িত্ব দিচ্ছি। তিনি এখন থেকেই কাগজ-পত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করবেন। এরই মাঝে চসিকের এস্টেট অফিসার এখলাছুর রহমান সভায় উপস্থিত হন। যে কয়দিন সময় লাগে, দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে কাজটি সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন সিটি মেয়র। কাগজ-পত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হলে চসিকের সার্ভেয়ার দিয়ে চমেক হাসপাতালের জমি সার্ভে করানোর ঘোষণা দেন মেয়র।
এসময় তিনি বলেন, কাগজ-পত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সার্ভে করানোর পর ওই জমি যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দালিলিক হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নামজারির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। এ কাজে চসিকের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তার দেয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
গতকাল দুপুরে চমেক হাসপাতালের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত সভা পরিচালনা করেন হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমদ। তিনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিবও। মেয়রের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মাঝে চমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. শামীম হাসান, শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ও চমেক উপাধ্যক্ষ ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি আলী আব্বাস, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির, বিএমএ চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী, সানসাইন গ্রামার স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাফিয়া গাজী রহমান, গণপূর্তের (সার্কেল-১) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজির আলী, চমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম, আবাসিক সার্জন ডা. মঈন উদ্দিন মাহমুদ, সেবা তত্ত্বাবধায়ক রাধু মুহুরি, নার্সিং এসোসিয়েশনের সভাপতি রতন কুমার নাথ, হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রনব কুমার হালদার, ৩য় শ্রেণির মেডিকেল সরকারি কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো. ছাদেকুর রহমান চৌধুরী, ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো. রতন আলী মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্যে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমদ বলেন, হাসপাতালের প্রশাসনিক অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ১৩১৩টি। কিন্তু প্রতিনিয়ত ৩ হাজার রোগী অন্তঃবিভাগে ভর্তি থাকেন। এছাড়া দৈনিক প্রায় ৪ হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা নেন। এই বিশাল সংখ্যক রোগীর সেবায় জনবল কিন্তু ৫শ’ শয্যার। এই ৫শ’ শয্যার জনবল কাঠামোতেও প্রায় দেড়শ কর্মচারীর পদ শূন্য। অর্থাৎ ৫শ’ শয্যারও কম জনবল নিয়ে দৈনিক ৭ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতাটুকু মানুষকে বুঝতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের কর্মচারীর সংখ্যা খুবই কম। এই বিশাল সংখ্যক রোগী হ্যান্ডল করতে আরো আড়াইশ কর্মচারী প্রয়োজন। আনসার ও নিরাপত্তা কর্মীর সংখ্যাও অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, অথচ রোগী প্রতি কমপক্ষে ২/৩ জন করে এটেন্ডেন্ট থাকে। এর উপর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি, ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমাণ দোকান, ভ্যানওয়ালা, পানওয়ালা, হকার, অ্যাম্বুলেন্সওয়ালা তো আছেই। সবমিলিয়ে দৈনিক ১০/১২ হাজারেরও বেশি মানুষের আনাগোনা এই হাসপাতালে। এই বিশাল সংখ্যক দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণে আরো আড়াইশ আনসার ও আড়াইশ পুলিশ সদস্য দরকার। সেটি হলে অব্যবস্থাপনা থাকবে না। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। এসব নিয়ম-নীতি সময় ও ব্যয়বহুল। তবে হাসপাতালে সেবার মান বাড়াতে হলে বাজেট ও জনবল বাড়াতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। নয়তো যে সিস্টেমে চলছে, সেটি মেনে নিতে হবে। বক্তব্যের শুরুতে হাসপাতালের সার্বিক চিত্র নিয়ে একটি পাওয়ার-পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন হাসপাতাল পরিচালক।
বক্তব্যে সাংবাদিকরাও যাতে হাসপাতালে সুচিকিৎসা পায় সে বিষয়ে নজর দিতে হাসপাতাল প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি আলী আব্বাস। অব্যবস্থাপনা কমাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
বিএমএ সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী বলেন, হকার উচ্ছেদে ওয়ার্ড মাস্টার, পুলিশ কেউ কাজ করে না। সন্ধ্যার পর হাসপাতাল এলাকাটি হকার মার্কেটে রূপ নেয়। ভাসমান ভ্যান থেকে একশ টাকা করে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। চমেক ক্যাম্পাসে হকার, ভাসমান দোকান-স্থাপনা উচ্ছেদে কয়েকদিনের মধ্যেই ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়ে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, এসব উচ্ছেদ করা হবে। এরপর কিন্তু এসব দেখার দায়িত্ব পুলিশের। এ নিয়ে ওয়ার্ড মাস্টার, আনসার ও পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে কঠোর নির্দেশনা দেন হাসপাতাল পরিচালক।
সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে হাসপাতালের পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে মেয়র বলেন, একজন রোগীর জন্য একাধিক এটেন্ডেট ওয়ার্ডে থাকছে। কিন্তু তাঁরা থাকলে চিকিৎসায় তো বরং অসুবিধা হচ্ছে, বিষয়টি তাদের বুঝতে হবে। তাই সাধারণ মানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। আর জনসাধারণকে সচেতন করতে মিডিয়ার জোরালো ভূমিকাও প্রত্যাশা করেন মেয়র। সভায় হাসপাতালের পরিবেশ ছাড়পত্র, মহিলা ইন্টার্ন হোস্টেলের নামকরণ, শ্রেষ্ঠ ইন্টার্ন চিকিৎসক নির্বাচনে কমিটি গঠন, গোঁয়াছি বাগান, কলা বাগান, লিচু বাগান ও মসজিদ কলোনিতে অবৈধ বিদ্যুতের লাইন নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে হাসপাতালের চারতলায় আইসিইউ বিভাগের পাশে অপারেশন থিয়েটারে অর্থোস্কপি মেশিন উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র।

x