‘দুষ্টচক্রে’ দায় চাপালেন নাজির

বিচারকের স্বাক্ষর জাল

সবুর শুভ

রবিবার , ৬ অক্টোবর, ২০১৯ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা জজের স্বাক্ষর জাল করে তিনজনকে বদলির অভিযোগে জেলা নাজিরের বিরুদ্ধে রুজু হওয়া বিভাগীয় মামলার তদন্ত শুরু করেছেন পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ গোলাম কবির। এদিকে ওই নাজিরকে জেলা জজের করা শো’কজের লিখিত জবাবে তিনি কয়েজনের নাম বলেছেন। এতে নাজির এ জালিয়াতির ঘটনার সাথে জড়িত নয় বলেও দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে আইনজীবীরা বলছেন, জালিয়াতি যে বা যারাই করুক না কেন ঘটনা ঘটে গেছে। তাই এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্তদের খুঁজে বের করা জরুরি। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
তথ্য অনুযায়ী, বদলি সংক্রান্তে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর জেলা নাজিরকে শো’কজ করা হয় গত ২৪ সেপ্টেম্বর। জেলা জজ আদালতের করা ওই শো’কজের জবাব দাখিল করেছেন তিনি ২৯ সেপ্টেম্বর। শো’কজের জবাব দিতে গিয়ে জেলা নাজির এ জেড এম রেজাউল করিম উল্লেখ করেছেন, ‘মহোদয়ের (জেলা জজ) পবিত্র হজব্রত পালনকালীন সময়ে মাননীয় ভারপ্রাপ্ত জেলা জজের স্বাক্ষর আমি জাল করিনি এবং স্বারকসমূহ আমি দেইনি। অগ্রবর্তী পাতাগুলোও আমি প্রেরণ করিনি বা আমার নিকট থেকে কেউ গ্রহণ করেনি।’ তিনি আরো উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি নাজির হওয়ার পর থেকে আমাকে হেয় ও অযোগ্য নাজির হিসেবে প্রচারের জন্য আমার পেছনে লেগে থাকা ‘দুষ্ট চক্র’ তাদের ভিত্তি মজবুত করেছে।’ তিনি শো’কজের জবাবে নায়েব নাজিরদের বিষয়ে বলেছেন, ‘আমি অফিসে গেলে (ঘটনার পর) নায়েব নাজির-১ (এনামুল হক আখন্দ) জানান সিটি এসবির লোক এসেছে এবং নায়েব নাজির-২ (তৌফিকুল আলম) জানান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) লোক এসেছে আমাকে খুঁজতে।’ এ বিষয়ে নায়েব নাজির-২ তৌফিকুল আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, ‘নাজির সাহেবকে দুদকের লোক খুঁজতে এসেছিলেন। আমার বস হিসেবে সেটা আমি উনার নজরে এনেছি। কত গুরুত্বপূর্ণ কাজে একজন আরেকজনকে খুঁজে। এক্ষেত্রে আমিও আমার অফিসিয়াল বসকে জানিয়েছি। এতে দোষের কি থাকতে পারে?’
উল্লেখিত ঘটনায় এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর জেলা নাজিরকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ করার আদেশ দেন হাইকোর্ট। একইসাথে তাকে মেহেরপুরের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রেকর্ড কিপার হিসেবে যোগদানেরও আদেশ দেয়া হয়। হাইকোর্টের আদেশে বদলির সাথে সাথে চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের নাজির এজেডএম রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ। স্বাক্ষর জাল করে তিন জেলার তিন প্রসেস সার্ভার ও অফিস সহায়ককে আন্তঃজেলায় বদলি করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর আবেদনপত্র পাঠানো অভিযোগ ওঠে জেলা নাজিরের বিরুদ্ধে। সেই অনুযায়ী উল্লেখিত তিনজনের বদলির আদেশ হয়েছিল। এরপর তারা যোগদান করতেও চলে আসেন চট্টগ্রাম আদালতে। তবে ওই আদেশও উল্লেখিত আদেশগুলোর সাথে স্থগিত করে বদলিকৃত তিনজনকে আগের জায়গায় ফেরত নেয়া হয়েছে।
আদালতের মতো আইনের জায়গায় এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বিএসটিআইয়ের প্যানেল আইনজীবী এডভোকেট আশরাফ উদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা আদালতের মতো জায়গায় একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এর পুনরাবৃত্তি রোধে ঘটনার সাথে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন খুঁজে বের করতে হবে।’ এক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক তদন্ত হওয়ার কথাও বলেন এ আইনজীবী।
জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে নাজিরকে দেয়া কারণ দর্শানোর (শো’কজ) নোটিশে নাজিরের বিরুদ্ধে ১৯৮৫ এর অধীন কেন আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা তিনদিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে নাজিরের দেয়া জবাবে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রশাসনিক বিভাগ অথবা নায়েব নাজির কর্তৃক মাননীয় ভারপ্রাপ্ত জেলা জজ হতে স্বাক্ষর নেয়া পত্র হিসেবে আমাকে দেয়া হলে তা কথিত মতে জারিকারক বক্করকে দিয়ে থাকতে পারি। যাতে কোনো ধরনের জালিয়াতি ছিল বলে আমার জানা ছিল না।’ শো’কজের জবাবের সর্বশেষ প্যারায় এ জেড এম রেজাউল করিম লিখেন, ‘আমি স্বাক্ষরপত্র (তিনজনের বদলির) ত্রয় প্রস্তুত স্বাক্ষর জাল ও স্মারক নম্বর প্রদানসহ কোথাও ডাকযোগে, পিয়ন বইযোগে বা কারো হাতে হাতে মহামান্য উচ্চ আদালতে আন্ত:জেলা বদলির জন্য প্রেরিত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নই।’
প্রসঙ্গত: জবাবে আরো দুই কর্মচারীর (নাম উল্লেখ করে) প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। এ বিষয়ে তৌফিকুল আলম জানান, আমি কিংবা এনাম সাহেব জেলা নাজিরের (রেজাউল করিম) নির্দেশনা পালন করে থাকি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে। নিজেরা কোনো কিছু করার সুযোগ নেই।

x