দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি চাই

সড়ক-মহাসড়কের স্থায়িত্ব রক্ষা করতে

মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
36

জাতীয় মহাসড়কের পেভমেন্টের আয়ুষ্কাল থাকার কথা ২০ বছর। যদিও এক বছরেই আয়ুষ্কাল হারাচ্ছে নতুন নির্মিত অনেক জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক। অনেক সড়ক নির্মাণ চলাকালেই দেবে যাচ্ছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই কার্পেটিংও উঠে যাচ্ছে অনেক সড়কের। ঠিকাদারদের পাশাপাশি এ জন্য দায়ী সওজের প্রকৌশলীরাও। তাদের সাথে যোগসাজশ করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করছেন ঠিকাদাররা। নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে নির্মিত এসব সড়ক কিছুদিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব সড়ক সংস্কারে নতুন করে ব্যয় করতে হচ্ছে বড় অংকের অর্থ। এভাবে ঠিকাদার-প্রকৌশলী পারস্পরিক যোগসাজশে বিপুল অংকের রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করছেন। বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় ‘শুদ্ধি’ অভিযান জোরদারের পর থেকেই আতঙ্কে আছেন সওজের ‘দুর্নীতিবাজ’ এসব প্রকৌশলী। সওজের একাধিক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, সওজের অনেক প্রকৌশলীই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। কয়েকজন প্রকৌশলী দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর থেকে তাদের অনেকেই সতর্ক হয়ে গেছেন। আতঙ্কগ্রস্তও হয়ে পড়েছেন কোন কোন প্রকৌশলী। পত্রিকান্তরে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা নতুন কোন ব্যাপার নয়। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এই অধিদপ্তরে দুর্নীতি চলে আসছে। ব্রিটিশ আমল গেছে, পাকিস্তান আমল গেছে, এখন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হতে চললেও দুর্নীতির সেই ‘ট্রাডিশন’ সমানে চলছে। থেমে নেই সড়ক নিয়ে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা। উন্নত অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ ব্যয় বেশি হলেও এর স্থায়িত্ব বাড়েনি। স্রেফ সড়কের পরিমাণ বেড়েছে। এ ধারাবাহিকতায় দেশে সড়ক অবকাঠামোর পরিমাণ বাড়ছে কিন্তু স্থায়িত্ব বাড়ছে না বরং নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই সড়কের কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে, কোথাও দেবে যাচ্ছে। সড়কের দেখভালের দায়িত্বে যে অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে, তারা দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলেই আজ দেশের সড়কের এই দৈন্যদশা। নিয়মানুসারে যে অনুপাতে নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করার কথা, তা যেমন অনুসরণ করা হচ্ছে না তেমনি এক ঠিকাদার আরেক ঠিকাদারের লাইসেন্স দেখিয়ে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন। অথচ সওজ অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা এ বিষয়ে উদাসীন। কারণ ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে সওজেরই কিছু প্রকৌশলী। তাদের সহায়তা পেয়ে দিনের পর দিন একই সড়কের মেরামতের পেছনে সরকারের বড় অংকের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আশার কথা, সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চলছে। আশা করি সওজের যে প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে বিশ্বের দু-একটি দেশের দুর্নীতি দমনের কথা। নিজ নির্বাচনী এলাকার একটি পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে সামান্য কিছু উপহার সামগ্রী ও অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করায় জাপানের এক মন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দক্ষিণ কোরিয়ার এক মন্ত্রী নিজের মেয়ের উচ্চ শিক্ষাকে কেন্দ্র করে অনিয়ম করেছেন বলে শাস্তিমূলক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের এমন নজির স্থাপন করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে সর্বাগ্রে প্রতিটি ধাপের দুর্নীতি দূর করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সড়ক সংস্কার ও মেরামতের কাজে যারা গাফিলতি করেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আজ গণদাবি। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো সংস্কারের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে, যা দেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি প্রকৌশলীদের জনগণের টাকা অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ গুরুতর অপরাধ, সন্দেহ নেই। তাছাড়া সড়কে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, ঠিকমতো মাটি ও বালি না ফেলার মতো কারণগুলো নিয়মিত তদারক করতে হবে। মুনাফালোভী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা এবং একই সাথে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে শাস্তি দিতে হবে।
মহাসড়কের পেভমেন্টের আয়ুষ্কাল থাকার কথা ২০ বছর। কিন্তু এক বছরেই আয়ুষ্কাল হারাচ্ছে নতুন নির্মিত অনেক জাতীয় আঞ্চলিক মহাসড়ক। উন্নত দেশগুলো ঘন ঘন মেরামত কাজে ঠিকাদারকে বাধ্য করে। অথচ আমাদের দেশে একবার কাজ সম্পাদনের পর আর কোন খোঁজ রাখা বা নিয়ম করে দেখভাল করা হয় না। রাজনৈতিক চাপে অযোগ্যদের কাজ দেওয়ার সংস্কৃতি বাড়ছে, যা দেশের টেকসই অগ্রগতির অন্তরায়। গতবছর দুদকের অনুসন্ধানে সওজ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, ভুয়া, বিল-ভাউচারের মাধ্যমেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে এর প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠে এসেছে পূর্ত নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও। একই কাজে ঠিকাদারকে একাধিকবার বিল পরিশোধে সহায়তা করা বা একই স্থানে দুবার কাজ সম্পন্ন দেখানোর পাশাপাশি প্রয়োজন না থাকলেও সড়ক উন্নয়নের নামে অর্থ তুলে নিতেও সহায়তা করেছেন তারা। দেশের ৫৫টি সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। হাতে গোনা কয়েকজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অতীতে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের বড় অংশই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকাটা সংশ্লিষ্ট মহলের কাজের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উল্লেখ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে বছর খানেক আগে ২১ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টির কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তার তদারকি অত্যাবশ্যক। দুদকের সুপারিশ যেন কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে জড়িত সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সনাতন ধারার পরিবর্তে কীভাবে সড়কের টেকসই উন্নয়ন ঘটানো যায়, সে ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। উন্নত দেশগুলো তাদের সড়ক-মহাসড়কগুলো কীভাবে স্থানীয় জলবায়ু উপযোগী করে তৈরি করে সে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে সড়কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাটা আর্থিকভাবে ফলপ্রসূ হবে। তবে সওজের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং একই সঙ্গে উন্নত জ্ঞানসমৃদ্ধ প্রকৌশলীদের পদে বসানো একান্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে দায়িত্বরত মন্ত্রণালয়কে তৎপর হতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে যোগ্য লোকদের দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

x