দুনিয়া পোড়াই

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে বনাঞ্চলে যতগুলো দাবানল ঘটেছে (বলা ভালো সংঘটিত) তার ৮৪ শতাংশই মানবসৃষ্ট। লেখাটির শুরুতেই এই তথ্য দিয়ে রাখা সমীচিন মনে করছি, পাছে পাঠক বিভ্রান্ত না হয়ে পড়েন। মানব-সৃষ্ট এ-ধারার বনজ দাবানল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে – যা আক্রান্ত বন তো বটেই, সারা বিশ্বের অপরাপর দেশগুলির জন্যও ধ্বংসাত্মক প্রভাব বয়ে আনছে।
যেসব বনাঞ্চলে গাছ বা কাঠের ঘনবসতি থাকে সেখানকার বাস্তু পরিবেশ রক্ষায় আগুনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রাচীন বা ঘন বনাঞ্চলের মেঝেতে যে বায়েম্যাস বা ঝোপঝাড়-আগাছা থাকে সেসব পরিষ্কার করে নতুন গাছের আবাদে সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে আগুন লাগানো হাজার হাজার বছর ধরেই চলছে। পাহাড়ে জুমচাষ পদ্ধতিতেও এই প্রক্রিয়ার প্রয়োগ দেখা যায়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই আগুনের প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ, দুটোই মানুষের হাতে থাকে। তাছাড়া এই প্রক্রিয়া সংঘটনের জন্য সংশ্লিষ্টদের রয়েছে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, অন্যথায় যেকোনো মুহূর্তে ওই আগুনই ভয়াবহ এবং অনিরাময়যোগ্য ক্ষতি ডেকে আনে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে অতর্কিতে দাবানাল সৃষ্টির ঘটনাও এসব বনাঞ্চলে বিদ্যমান। এর ফলে মারাত্মকভাবে জীববৈচিত্র হ্রাস, বায়ূদূষণ, প্রাণীমৃত্যু, মানব-মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবং, যেহেতু এমতন দাবানলের অন্যতম প্রধান কারণ মানুষ, তখন ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার মানুষের কাঁধেই বর্তায়।
অষ্ট্রেলিয়ায় চলমান দাবানলের খবর নিশ্চয় পাঠকদের চোখ এড়ায়নি, এড়ায়নি সাম্প্রতিক আমাজন বনাঞ্চলের দাবানলের খবর। গত এক দশকে প্রায় সবক’টি মহাদেশের অনেক দেশই ভয়াবহ-মারাত্মক দাবানলের শিকার হয়েছে। কঙ্গো, রাশিয়া, বলিভিয়া, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, গ্রীস…এরকম অসংখ্য দেশ বা ভূখণ্ডের নাম আমরা পরপর নিতে পারি। শুরুতেই তথ্য দিয়ে রেখেছি, যার ৮৪ শতাংশই মানুষের দ্বারা সৃষ্ট। পাঠক, চলুন সেরকমই কিছু মানবসৃষ্ট দাবানালের তথা ‘হত্যাকাণ্ড’-এর খবারাখবর জেনে নিই।
হিলংজিয়াং দাবানল, চীন, ১৯৮৭
বিগত কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক দাবানলের কয়েকটির একটি হিলংজিয়াং-র দাবানল। একজন বন কর্মীর পেট্রোলচালিত ব্রাশ কাটার (আগাছা পরিষ্কারের যন্ত্রবিশেষ) থেকে অসাবধানতাবশত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে এসে তা শুকনো ঘাসে লাগে এবং দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে দাবানল রূপে। এই আগুনে চীনের দ্য গ্রেটার খিংগান রেঞ্জের তিন কোটি একর বন গ্রাস করেছিল, যা চীনের মোট কাঠের মজুদের ছয়ভাগের একভাগ গাছ পুড়িয়ে দেয়। তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পরার পেছনে শুকনো মৌসুমকে দায়ী করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই দাবানল চীনের ভূ-প্রকৃতিতে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে এটি। ওই দাবানল নেভাতে প্রায় চৌত্রিশ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়, প্রায় তেত্রিশ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। বনজ কাঠের ক্ষয়ক্ষতি চীনের রাষ্ট্রিয় অর্থনীতিকে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয় এবং পোড়া বনভূমি আর কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। গত তিন দশকে ওই খিংগান রেঞ্জ ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, যা বৈশ্বিক জলবাযু উষ্ণতার জন্যও সরাসরি দায়ী।
ওয়ালৌ দাবানল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০১১
গহীন অরণ্যের অমোঘ টানে বহু এডভেঞ্চার প্রিয় মানুষই গভীর বনে গিয়ে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে ক্যাম্প পাতেন। ২০১১ সালের মে মাসে এমনই দুই এডভেঞ্চারপ্রিয় আরিজোনার হোয়াইট মাউণ্টেনের বিয়ার ওয়ালৌ বনাঞলে ক্যাম্প খাটান। তা ক্যাম্প এলাকায় আগুনের ব্যবহার তো হয়েই থাকে। কিন্তু বিপর্যয় তখনি ঘটে যখন ক্যাম্পসাইটে ব্যবহৃত আগুন থেকে দূর্ঘটনাবশত দাবানলের সূত্রপাত হয় এবং পুড়িয়ে দেয় প্রায় পাঁচ লক্ষ চল্লিশ হাজার একরের বনভূমি! ওই দাবানল বাগে আনতে খরচ হয় বাহাত্তর মিলিয়ন ডলার, ক্ষয়ক্ষতির পর পোড়া ছাই-জঞ্জাল পরিষ্কারে খরচ হয় সাইত্রিশ মিলিয়ন ডলার। দাবানলের ধোঁয়া ভূপৃষ্ঠ থেকে ত্রিশ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠে যায়। বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় প্রায় ষাট হাজার মানুষকে। শুধু আরিজোনায়ই নয়, এই দাবানল নিউ মেক্সিকোর ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়েছিলো।
ব্র্যাণ্ডেনবার্গ দাবানল, জার্মানি, ২০১৮
ইউরোপে ক্রমবর্ধমান দাবানলকে অনুসরণ করে ( হরেদরে যেসবের পেছনে খরা মৌসুমকেই দায়ী করা হয়ে থাকে) জার্মানির ব্র্যান্ডেনবার্গ বনাঞ্চলও দাবানলের শিকার হয় ২০১৮ সালের ২৫ আগষ্ট। এই দাবানলের সূত্রপাত পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, স্থানীয় পুলিশের জোরালো বিশ্বাস ওই বনের লাগোয়া গ্রামবাসিরাই এই দাবানলের জন্য দায়ী। এই দাবানলের তীব্র-ঘন ধোঁয়া বার্লিনের উপকণ্ঠে প্রায় বিশ কিলোমিটার ছেয়ে ফেলে। মাত্র একহাজার একর এলাকায় এই দাবানল ছড়ালেও এর ভয়াবহতা চরম আকার ধারণ করতে পারতো। কেননা ব্রাণ্ডেনবার্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের সময়কার স্থলমাইন পোঁতা এলাকা, যার অনেকগুলোই এখনও পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় করা হয়ে ওঠেনি। যদি দাবানল দ্রুততার সাথে বাগে আনা না যেতো তাহলে তা ইতিহাসে প্রলয়ংকরী দাবানলে রূপ নিতো।
স্যাডলওয়ার্থ মুর দাবানল, যুক্তরাজ্য, ২০১৮
গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যে ছোট ছোট বেশকিছু দাবানল তথা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও ম্যানচেস্টারের কাছাকাছি স্যাডলওয়ার্থ মুর বনভূমিতে যে আগুন লাগে তা এখনও পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে নথিবদ্ধ। প্রাথমিক তদন্তে সে-ই উত্তপ্ত আবহাওয়া বা খরাকে দাবী করা হলেও স্থানীয় জনগন তথ্য-প্রমাণ দেখিয়ে দাবি করেছেন যে বাইকার্সদের একটি দল বনের ভেতর অস্থায়ী ক্যাম্প খাটায় এবং সেখান থেকেই ওই দাবানলের সূত্রপাত। এর ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে দেয় ওই বনভূমির নীচে থাকে খনিজ আকরিক যা খুব দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আগুন লাগার পাঁচদিন পর সেনাবাহিনী এসে আগুন নেভানোর কাজে হাত দেয়। ততদিনে ছাঁই এবং পোড়া বস্তুকণা গোটা ম্যানচেস্টারের আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তৈরি করে ঘন কুয়াশার আস্তরণ।
উত্তরাখণ্ডের আগুন, ভারত, ২০১৬
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত উত্তরাখণ্ডে ফি-বছরই দাবানল লাগে যারা বেশিরভাগই মানবসৃষ্ট। অনেকাংশেই তা অল্পে নিয়ন্ত্রণে আসে, পাশপাশি গণমাধ্যমও তেমন নজরদারি রাখতো না এ-বিষয়ে। কিন্তু দুহাজার ষোলো সালের মে মাসের অগ্নিকাণ্ড গণমাধ্যমে চাউর হলে ভারতীয় বিমানবাহিনী ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেয় আগুন নেভানোয়। উত্তরাখণ্ডের বনাঞ্চলের এই আগুন একটি ঐতিহাসিক সমস্যা হিসেবেই স্বীকৃত। ধারণা করা হয় মধু আহরণ জন্য কিংবা বনাজী ঔষধ ও বীজ সংগ্রহের জন্য যারা এসব বনে যায় তারা হিংস্র পশুদের ভয় দেখাতেই আগুন জ্বালায়। এছাড়াও কাঠের চোরাকারবারীরাও সারাবছর ধ’রে এই বনে হানা দেয় গাছ বা কাঠ সংগ্রহে ফলে আগুন লাগিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা দাবানলের মতো ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। ষোলো সালের ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় দশ হাজার একর বনভূমি পুড়ে যায়। তবে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।
প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশের বনাঞ্চলের মোট পরিমাণ এবং এতে মানবসৃষ্টের আশংকা প্রকাশ করে শেষ করছি। এদেশের পাহাড়ি, সমতল, ম্যানগ্রোভ এবং সামাজিক বনায়নের আওতাধীন আছে পঞ্চান্ন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার একর বনভূমি যা বাংলাদেশর মোট ভূমির প্রায় সতের শতাংশ। ঘনত্বের দিক দিয়ে এসব বনভূমি মাঝারি মানের। আবার গোটা বনাঞ্চলের প্রায় ষাট ভাগই একা সুন্দরবনের আওতায়। এখন, সুন্দরবন ধ্বংসের (এটিও মানবসৃষ্ট) সুদূরপ্রসারী পাঁয়তারা চলমান থাকলেও, দুর্ভাগ্যক্রমে যদি ওই বনে বিপর্যয়কর মাত্রার দাবানলের সূত্রপাত হয় এবং তা যদি একা সুন্দরবনেরই বেশিরভাগ জায়গা পুড়িয়ে ফেলে তাহলে সুদূরপ্রসারী পাঁয়তারা আলোর মুখ দেখবার আগেই ইতিহাস হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে বৈকি। আমাদের বনবিভাগ নিশ্চয় এসব বিষয়ে সজাগ আছে, আমাদের বিভিন্ন বাহিনী নিশ্চয় এমন মাত্রার দাবানল দ্রুততম সময়ে নিভিয়ে ফেলার সামর্থ্য রাখে!

x