দুজনে দোঁহে একা

সুরাইয়া বাকের

শুক্রবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ
29

কতদিন পর দেশে ফিরে আসা। দশটা বছর আমেরিকায় কাটিয়ে মায়ের জন্যে দেশে ফিরে আসল নীলাদ্রী। এসে খুব ভাল লাগছে। শেষ চৈত্রে পা রাখল দেশের মাটিতে। ইতিমধ্যে সংস্কৃতি অঙ্গনের ছেলেগুলো এসে দেখা করেছে। নীলাদ্রীকে নিয়ে খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে চায় তারা। হাসতে হাসতে বলে নীলাদ্রী, ১০ বছর আমেরিকায় থেকে যান্ত্রিক হয়ে গেছি। আবার কি সক্রিয় হতে পারব? হৈ হৈ করে উঠে জুনিয়র ছেলেগুলো। একশবার পারবেন। এই মফস্বল এলাকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেছিলেন। আজ যারা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছে সব আপনার হাতে গড়া, এবার জমিয়ে ছাড়ুন বস।
ছেলেগুলোর উচ্ছ্বাস দেখে প্রাণ খুলে হাসে নীলাদ্রী। কিন্তু দায় এড়াতে পারে না। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন পরিষদ থেকে তারপর দিনই ওকে চেপে ধরে। আসতেই হবে। কোনো ওজর আপত্তি শুনল না। সভা করে আহ্বায়ক বানিয়ে তবেই নিষ্কৃতি।
করব না, পারব না করেও শেষ পর্যন্ত তারুণ্যের স্রোতের টানে ভেসে গেল নীলাদ্রী। রক্তে মিশে ঘুমিয়ে ছিল যে উন্মাদনা পথ পেয়ে বেড়িয়ে আসছে কলকল ছলছল ছন্দে, নৃত্যে। পহেলা বৈশাখ নিয়ে মেতে উঠল নীলাদ্রী। বুটিকশপে ছেলেদের জন্য একই ধরনের ফতুয়া আর মেয়েদের জন্য অর্ডার দিল শাড়ির। কারণ র‌্যালিটা হতে হবে বর্ণাঢ্য। চমৎকার একটা কর্মযজ্ঞ শুরু হলো। নিজস্ব সংস্কৃতি আর উদার মানবিক বিপুল আহ্বানে পহেলা বৈশাখের প্রাকপ্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। ছেলেগুলো খুশিতে টগবগ করে ফুটছে।
সন্ধ্যায় আলো-আঁধারিতে কর্মক্লান্ত ছেলেগুলোকে নিয়ে চা খেতে বসল। চা আসতে কিছুক্ষণ সময় লাগবে। খুঁটিনাটি কিছু বিষয় নিয়ে ছেলেরা গল্পে মেতে উঠল। অনন্তদা নীলাদ্রীকে চেপে ধরল কবিতা আবৃত্তির জন্য। নীলাদ্রী, ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি আবৃত্তি করো। অনেকদিন তোমার কবিতা শোনা হয়নি। মঞ্চে করব বলে কাটাতে চায় নীলাদ্রী, পারে না। তন্ময় ছেলেটা নাছোড়বান্দা। কিছুতেই ছাড়ছিল না। বলে, মঞ্চে তো করবেনই। শুধু আবৃত্তি নয়, গানও গাইতে হবে। ঝাঁকড়া চুলের লম্বা ছেলেটাকে ইতিমধ্যে ভালবাসতে শুরু করেছে নীলাদ্রী।
চেয়ারে বসে দু চোখ বন্ধ করে নীলাদ্রী। হাত দুটি বুকের মধ্যে ভাঁজ করে রাখা। সন্ধ্যায় হাওয়া চুপিসারে দোলা দিয়ে যায় নীলাদ্রীর কাঁধ অবধি ঝুলে থাকা চুলে। উদাত্ত কণ্ঠে একটু একটু ছড়িয়ে পড়ে কবিতা। বাতাসে ছুটোছুটি খায় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের লাইনগুলো।
‘আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে
প্রভাত পাখির গান।
না জানি কেনরে এতদিন পড়ে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
চা এসে গেছে। সবার হাতে হাতে কাপ। কাছের দিঘির শান্ত জলে আলোর প্রতিবিম্ব। নীলাদ্রী আবৃত্তি করছিল,
আমি ভাঙ্গিব পাষাণ কারা
আমি জগত প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল পারা
রাত করে বাড়ি ফিরে নীলাদ্রী। মায়ের ঘরে কিছুক্ষণ সময় কাটায়। মা ঘুরেফিরে শুধু বিয়ের তাগিদ দেয়। মার গলা জড়িয়ে ধরে হো হো করে হাসে নীলাদ্রী। বলে, দূর! ৪০ পেরিয়ে গেছে, এখন আরকি বিয়ে মা? অন্য কথা বলো।
মা রেগে যায়। বলে, যার জন্যে বিরাগী হলি, তার স্বামী-সন্তান নিয়ে ভরা সংসার। তুই কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস?
মার অনুরোধ চলতে থাকে। নীলাদ্রী মার কথার উত্তর না দিয়ে ঘরে ফিরে যায়। ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। নিমের একটা ডাল ব্যালকনি ছুঁয়ে আছে। প্রচুর নতুন পাতা গজানো। পাতাগুলো নরম, কোমল। আলতো করে ছোঁয় নীলাদ্রী। মূলত মনে আজ অন্য সুর। মনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছে একজন। তাকে ফিরানোর সাধ্য কি? তাই আগল খুলতেই হলো। কি প্রচণ্ড ভালোবাসতো মৌমিতা আর নীলাদ্রী পরস্পরকে! ভালোবেসে কাছে আসা। কিছুই পরিপূর্ণতা পায় না মৌমিতার পারিবারিক কারণে। মাঝখান থেকে নীলাদ্রী হলো দেশান্তর। বিয়ে করে সংসার পাতল মৌমিতা। মেয়েরা এমনই। বেশিরভাগ মেয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্তের কাছে অসহায়।
রবির গান আর কবিতার নীলাদ্রী। ধনের মতো আগলে রাখা মৌমিতার শেষ চিঠিটা আলমারি থেকে বের করে। তখন মৌমিতার বিয়ের সবকিছু ঠিকঠাক। মৌমিতা অনেকটা গৃহবন্দী। নীলাদ্রী পাগলপ্রায়। কিছুতেই মৌমিতাকে পাচ্ছিল না। অবশেষে একদিন চিঠিটা আসে। কত শত সহস্র বার পরা। প্রতিটা লাইন মুখস্থ। ব্যালকনির আবছা আলোয় চিঠিটা আজ আবার পড়ে।
নীল,
পারিবারিক সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত বিয়েটা আমাকে করতে হচ্ছে। তোকে ছাড়া আমার জীবন আমি কখনো ভাবিনি। পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। বার বার অবাধ্য চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। হাজার স্মৃতি ভিড় করছে। কত কথা, কত গান, কত হৈ হুল্লুড়। মনে আছে সেবার বৈশাখী মেলার কথা?
র‌্যালির প্রস্তুতি চলছিল। বাসন্তী আর কলাপাতা রঙের অপূর্ব মিশেলের পাঞ্জাবিতে তোকে ভারী সুন্দর লাগছিল। কি ভীষণ ব্যস্ততা তোর! আমার দিকে তাকাবার সময়ই হচ্ছিল না। আমি বৈশাখী সাজে অভিমানে চুর চুর হচ্ছিলাম। ইচ্ছে সবার মাঝ থেকে তোকে টেনে নিয়ে আসি। বলতে ইচ্ছে করছিল, নীল আমাকে দেখ, বৈশাখের তাবৎ রুদ্র সৌন্দর্য আজ আমাতে আছে।
অভিমানে আমি আস্তে আস্তে বকুলতলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। খুব সম্ভবত শান্তনুদা ব্যাপারটা খেয়াল করছিল। তিনি তোকে অনেকটা জোর করেই বকুলতলার দিকে ঠেলে দিল। তুই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলি। চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছিল না। আর আমার ক্রমাগত বাড়ছিল হৃদস্পন্দন। একেবারে সামনে এসে আলগোছে তুলি নিলি আমার দুটি হাত।
তোর বলিষ্ঠ দুই হাতের উষ্ণতায় আমার হাত দুটি গলে গলে যাচ্ছিল মোমের মতো। চোখ দুটি রাখলি আমার চোখে। তোর শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি শিহরিত হলাম। কি ছিল সে চোখে? ছিল অতল জলের আহ্বান। বিমুগ্ধতার ঢেউ তুলে আবেগমথিত কণ্ঠে বললি, অপূর্ব! ওই একটি মাত্র শব্দ উচ্চারিত হওয়ার পরপরই একদল মেয়ে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
ব্যানার হাতে সামনে দাঁড়াতে হবে। তুইও আমার পাশে এসে দাঁড়ালি। আমার বুকের রক্ত ছলকে উঠল। ফাজিল অতনুটা আরো যা, আরো যা বলে ঠেলে তোর গায়ের সাথে লাগিয়ে দিল। পিছন থেকে সাকিব ভাই চিৎকার করে বলল, এটা বৈশাখী শোভাযাত্রা নাকি রাধা-কৃষ্ণের শোডাউন যাত্রা। মালা বদল আজ হয়ে যাক না। র‌্যালি জুড়ে হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল। ছন্দা কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, মৌ নীল সাগরে একবার সাঁতার কেটে আয় না। নববর্ষ সার্থক হয়ে যাক।
আমি মরমে মরে যাচ্ছিলাম। র‌্যালি শুরু হলো। ব্যান্ড বাদকদলের বাজনার শব্দে আর সবকিছু চাপা পড়ে গেল।
কি চমৎকার প্রাণবস্ত্ত দিনগুলো হারালাম! আমার মা-বাবা তোকে পছন্দ করে থাকলেও তুই ব্যক্তিগতভাবে কিছুই করিস না। শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে হৈহুল্লুড় করা বাউণ্ডুলে একটা ছেলে। তাদের কাছে তুই ছেলে হিসেবে ভালো, কিন্তু পাত্র হিসেবে যোগ্য না। মা-বাবার মতামত অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস আমার ছিল না। তাই ভালোবাসার চোরাকুঠুরিতে তালা মেরে নিয়তিকে মেনে নিলাম।
নীল, মনে আছে সেই রবীন্দ্র সংগীতটা, যা তোর আমার দুজনের খুব প্রিয় ছিল। ওই গানটার লাইন আমার জীবনে ধ্রুব সত্য হয়ে গেল। লাইনটা হলো এমন ‘আর তো হলো না দেখা, দুজনে দোঁহে একা’।
সত্যি কি তোর সাথে আমার কখনো দেখা হবে না? আমাকে ভুলে যাসনে নীল। উপলব্ধি করিস মনের গহীনে নিভৃতে। আমার বিরহ যেন তোকে অভ্যস্ত করে না তোলে। আর আমার কথা? কষ্টের নীল সমুদ্রে আমি ডুবসাঁতার কাটব অবিরাম-এটাই নিয়তি।
তোর মৌ

x