দুঃস্বপ্নের সকালে ভাগ্যের চাকা থেমে গেল রিকশাচালক মাহমুদুলের

সবুর শুভ

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:২৩ পূর্বাহ্ণ
1350

বিস্ফোরণের দিন শনাক্ত না হওয়া লাশটি হতভাগ্য রিকশা চালক মাহমুদুল হকের (৩০)। চরম অভাবের সংসার তাদের। স্ত্রী ও ফুটফুটে চার সন্তানকে নিয়ে পরিবারের আকারটা বড় মাহমুদুলের। কিন্তু উপার্জনের মানুষ বলতে একমাত্র তিনিই ছিলেন। ঘটনার মাত্র ১৮ দিন আগে স্ত্রী ও চার সন্তানকে গ্রামের বাড়ি লোহাগাড়া থেকে নিয়ে আসেন। কোনো রকমে মাথা গোঁজার মত একটি ঘর নেন বাকলিয়ার ভেড়া মার্কেটের বেলাল কলোনিতে। অভাবের সংসার হলেও নতুন শহরে আসায় বেশ ফুরফুরে ছিলেন স্ত্রী শাহিনা আক্তার ও সন্তানরা। বান্দরবান আলীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত বড় ছেলে সলিম উল্লাহ। মাত্র ৮ বছর তার বয়স। এখানে এসে কোনো স্কুলে ছেলেকে পড়াবে বলে মনস্থির ছিল মাহমুদুল হকের। দ্বিতীয়জন জান্নাতুল মাওয়ার বয়স ৬, শহীদুল্লাহর বয়স ৪ বছর এবং ৬ মাস আগে জন্ম নেয় নবী হোসেন।
পরিবারের আর্থিক সংস্থানের বোঝা মাথায় নিয়ে খুব ভোরেই প্যাডেলে পা রাখেন মাহমুদুল। রিকশার চাকা যত তাড়াতাড়ি ঘুরবে তত দ্রুত তার জীবনের সংকট মিটবে। এ ধরনের চিন্তা থেকেই মূলত ভোরে রিকশা নিয়ে তার বেরিয়ে যাওয়া। সেই মাহমুদুলকে মৃত্যু একেবারের না ফেরার জগতের বাসিন্দা বানিয়ে দিল তারই প্রত্যাশিত ‘ভাগ্য ফেরানোর ভোরেই’। দরিদ্র আবুল কাশেম ও মমতাজ বেগমের তিন ছেলে ও পাঁচ মেয়ে মিলে বিশাল সংসার মাহমুদুল হকদের। ছেলেদের মধ্যে মাহমুদুল সবার বড়। আবুল কাশেম আবার শারীরিকভাবেও সুস্থ নন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়নি এখনো। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অসামর্থ্য তাদের বিয়েকে ঠেকিয়ে রেখেছে বলে জানালেন আবুল কাশেম।
এরই মাঝে মাহমুদুলের মর্মান্তিক মৃত্যু মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। তার স্ত্রী ও চার সন্তানের কী হবে এই ভেবে অস্থির কাশেম। মাহমুদুলের অন্য ভাইরাও সকলে আলাদা থাকেন নিজেদের মতো। এ পরিবারে সামর্থ্যবান কেউ-ই নেই।
আবুল কাশেম বলেন, আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায় শহরে গেল ছেলে। ফিরল লাশ হয়ে। বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে এ পরিবার বাঁচবে। রোববার চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণে নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় ওইদিনই মিলেছিল। বাকি ছিল শুধু একজন। রোববার সকাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরে পড়ে থাকা সেই লোকটিই মাহমুদুল হক (৩০)। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়ায় তেইল্যাকাটা সেনেরচরে তার বাড়ি। তার সন্ধানে তার ছোট ভাই, বাবা ও স্ত্রী এসেছিলেন। স্ত্রীর কোলে ছিল ৬ মাসের নবী উল্লাহ। এসময় চোখে মুখে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নিয়ে তাকিয়ে থাকা মাহমুদুলের স্ত্রী শাহিনা আক্তার বলেন, ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর জন্যই আমরা এখানে এসেছিলাম। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু থমকে দিল সব স্বপ্ন। কেড়ে নিল সবকিছু। এখন আমাদের কী হবে?
এদিকে আবুল কাশেম জানিয়েছেন, তিন বছর বান্দরবান শহরে রিকশা চালায় আমার ছেলে। এরপর এক বছর হল চট্টগ্রাম শহরে এসেছে। বউ বাচ্চা নিয়ে আসে ঘটনার মাত্র ১৮ দিন আগে। মাহমুদুল হকের এ মৃত্যু পুরো পরিবারকে ছিটকে দিল শহর থেকে গ্রামে। এখন তাদেরকে থাকতে হবে সেই গ্রামেই। গতকাল সোমবার স্বামীর লাশের সাথে সাথে এ শহরকে ছেড়ে গেলেন স্ত্রী শাহিনা আক্তার।

x