দুঃসহ স্মৃতি আজও কাঁদায় সন্দ্বীপবাসীকে

ব্লক বেড়িবাঁধে আশা জাগলেও এখনো অরক্ষিত সন্দ্বীপ

অপু ইব্রাহিম, সন্দ্বীপ

সোমবার , ২৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ৪:০৩ অপরাহ্ণ

আজ সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল। বছর ঘুরে এই দিনটি এলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সন্দ্বীপের সাড়ে তিন লাখ মানুষ। স্বজন হারানোর বেদনায় বিধুর হয়ে পড়েন তারা। সেই অরক্ষিত উপকূলে ২৮ বছর পরে ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণ আশার আলো দেখালেও এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে সন্দ্বীপ।

১৯৯১ সালের এদিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত এবং এক কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারায়। নিহতের সংখ্যা বিচারে স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে ৯১-এর এই ঘূর্ণিঝড় একটি।

৯১-এর এই ভয়াল ঘটনা এখনও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলবাসীকে। ঘটনার এত বছর পরও স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না সেই দুঃসহ দিনটি। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে হলে। নিহতদের লাশ, স্বজন হারানোদের আর্তচিৎকার আর বিলাপ বার বার ফিরে আসে তাদের জীবনে।

১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড়ের আঘাতে উত্তর চট্টগ্রামের উপকুলীয় অঞ্চল সন্দ্বীপও লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এই দিনটির কথা আজো ভুলেনি সন্দ্বীপের মানুষ। সেই বিভিষীকাময় মুহূর্তগুলো নিজ চোখে দেখেছিলেন ওমান প্রবাসী আকতার হোসেন। তিনি সেদিনের অনূভূতি ব্যক্ত করে দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘সকাল থেকে আকাশ ছিল গম্ভীর, বিকালের দিকে মনে হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মাগরিবের পর থেকে আকাশ ভারী হয়ে আসলো। এশার পরে আমার জেঠাজি (হেজু মেম্বার) আমি, আমার ছোট ভাই ও জেঠাতো ভাইবোন সহ মোট ৫ জনকে নিয়ে গেলেন আমাদের এলাকার পাশেে বাড়ির নির্মাণাধীন একটি ভবনে। যদি রাতে বন্যা হয়ে যায় তাহলে হয়তো কালকে আর খাবারের জন্য কিছুই পাওয়া যাবে না। তাই কিছু শুকনো খাবারও নিয়ে রেখেছেন জেঠা।

আমরা প্রথমে ভবনের নিচতলায় ছিলাম। যখন ভারী বর্ষণ ও তুফানের গতিবেগ বেড়ে গিয়ে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের বিভীষিকাময় তান্ডবলীলা শুরু হলো তখন সবাই দেখতে পেল ভবনে পানি ঢুকে যাচ্ছে। এইতো শুরু হলো সকলের আর্তচিৎকার। সবাই সিঁড়ি দিয়ে ছাদের উপরে উঠতে লাগলো। আমাদেরকেও জেঠা ছাদের উপরে নিয়ে গেলেন। সে কি তুফান! আর আকাশের বিদ্যুৎ চমকানো। বিদ্যুতের আলোতে দেখতে পাচ্ছি বাড়ির আঙ্গিনার উপর দিয়ে কত যে ঘর-দরজা উত্তর দিক থেকে চলে যাচ্ছে। শুধু বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে আছি। এরই মাঝে দেখলাম মানুষও ভেসে যাচ্ছে। একটা মানুষ দেখলাম সম্ভবত ঘরের চাল ধরে ভেসে যাচ্ছে।

রাতও শেষ হয়ে এলো, ভোরের আলো দেখার সাথে সাথে আমার জেঠা ভবন থেকে বাড়ির দিকে ছুটে গেলেন। আমাদের বললেন, তোমরা সকাল হলেই তারপর এসো। জেঠা চলে যাওয়ার কয়েক মিনিট পরে আমরাও ভিজে ভিজে বেরিয়ে গেলাম! রাস্তায় এসে দেখি! হায় আল্লাহ! একি! রাস্তা সব বন্ধ হয়ে গেছে কি বিশাল বড় বড় গাছগুলো সব রাস্তার উপর পড়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো সব ডালপাতা শুন্য হয়ে আছে। চারিদিকে দেখি বিলের পানিতে লাশ, রাস্তার পাশে লাশ, খালের পাড়ে লাশ! সব দেখতে দেখতে কোনোমতে কষ্ট করে বাড়ি আসলাম। এসেই দেখি বাড়ীতে কারো কোনো ঘর নেই। সব পড়ে গেছে।

আমাদের ঘরের খালি ভিটার উপরে একটা কিশোরীর লাশ পড়ে আছে। বাড়ীর উত্তর পাশের কোনায় ঝোপের মাঝে গিয়ে দেখি একজন বয়স্ক মুরুব্বীর লাশ পড়ে আছে যার গায়ে সাদা পাঞ্জাবি ছিল। উনার পাঞ্জাবির পকেটে বান্ডিল মোড়ানো অনেকগুলো টাকাও দেখা যাচ্ছিল। বাড়ির উত্তরে বিলের মাঝে দেখি আরো কয়েকটা লাশ পড়ে আছে। তার মাঝে দেখলাম হাতে আলতা মেহেদী লাগানো একটা নববধূর  লাশও পড়ে আছে। ছেলেমানুষী মনে এদিক ঐ দিক দৌঁড়াদৌড়ি করছি। কোনো লাশের প্রতি আফসোস/মায়া হচ্ছে না।

হঠাৎ দেখি আমার জেঠা, আমার মা, বাবা ও দাদীর জন্য কান্না করতে করতে বেড়িবাঁধের দিকে যাচ্ছে। আমিও মা বাবার জন্য কান্না শুরু করলাম। আমিও বেড়ীবাঁধের দিকে যাচ্ছি। আমাকে দেখে মা বিল থেকে দ্রুত চলে এসে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতে লাগলেন। আলহামদুলিল্লাহ। আমার পরিবারের সবাই বেঁচে আছে। কিন্তু অনেকে হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের। বন্যা পরবর্তী সময়ে মানুষের কষ্টের অন্ত ছিল না। খাদ্যদ্রব্যসহ বিশুদ্ধ পানির অনেক অভাব ছিল। দুর্বিষহ সেই করুণ স্মৃতি আজও মনে উঠলে চোখের পানি টলমল করে।’

তরুণ সুজা উদ দ্দৌলা সজীব বলেন, ‘সন্দ্বীপে বসবাসরত প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের জন্য সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে মাত্র ৭০টি। প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য সাইক্লোন শেল্টার একটি। একটি সাইক্লোন শেল্টারের ধারণ ক্ষমতা তিনশরও কম মানুষ। সন্দ্বীপে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ব্লক বেঁড়ীবাধ নির্মাণ হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। তবে নির্মাণ যাতে টেকসই হয় সে ব্যাপারে সঠিক মনিটরিং জরুরি।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সভাপতি ড. ইদ্রিস আলম বলেন, ‘উপকূল বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। ১৯৯১ সালে ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল রাতে সন্দ্বীপে প্রায় ২০-৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আজ স্বজন হারা বেদনা ও হতাশ হৃদয় নিয়ে তাদেরকে স্মরণ করতে হচ্ছে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর দ্বীপবাসির প্রাণের দাবি ব্লক নির্মাণ হচ্ছে। তা অবশ্যই টেকসই হতে হবে। দ্বীপকে পর্যটন কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্তকরণ করতে হবে। বর্তমান সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য কাজ করছে। এটি দীর্ঘমেয়াদী এবং অব্যাহত থাকা উচিত।’

আমরা সন্দ্বীপবাসী সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক ডা. রফিকুল মাওলা বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সন্দ্বীপ এখনও অরিক্ষিত রয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে কাছের উপজেলা হওয়ার পরও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে সন্দ্বীপের মানুষ।’

সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, ‘১৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্লক বেঁড়ীবাধ নির্মাধীন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সন্দ্বীপে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে ঝড় জলোচ্ছ্বাস থেকে সন্দ্বীপের মানুষকে বাঁচানোর জন্য আরও আশ্রয় কেন্দ্রের প্রয়োজন।’

x