দুঃখ মুছে আনন্দ ছড়ায় যে স্কুল

মুহাম্মদ মনির হুসাইন (নিলয়)

শনিবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ
214

‘আমার বাবা রিকশা চালায়, সারাদিন বাইরেই পইড়া থাকে … মা বড়লোকের বাসায় এ চারকী করে … আমি সারাদিন থাকি স্কুলে।’ হাসিমাখা মুখে কথাগুলো এইভাবেই বলছিলো শিক্ষার্থী তন্ময় (ছদ্মনাম)। এই বছর প্রাথমিক সমাপনীতে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। কোন স্কুলে পড়ছো? জিজ্ঞেস করতেই সে জানায় মমতার বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে সে। তার সাথে আরও কয়েকজন বন্ধু পড়ে এই স্কুলে, তারাও এবার প্রাথমিক সমাপনীতে ভাল ফলাফল অর্জন করেছে। তন্ময় জানায়, এই স্কুলের স্যারেরা আমাদেরকে অনেক আদর করে, পড়া বুঝিয়ে দেয়। পড়া না পারলে মারে না, আরও বেশি করে বুঝায়। চট্টগ্রামের স্বনামধন্য ও জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মমতা কর্তৃক পরিচালিত হয় এই বিদ্যালয়। স্কুলটিতে ১ম শ্রেণি হতে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়ে থাকে। নগরীর বন্দরটিলার আকমল আলী রোডস্থ এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পিতামাতারা বেশিরভাগই গার্মেন্টস কর্মী, দিনমজুর, কাজের বুয়া ও শ্রমজীবী মানুষ। এসব শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ পরিবারেই আহার যোগাতেই টানাপোড়ন লেগে থাকে। এমতাবস্থায় তাদের ভাষ্য মতে, শিক্ষা তাদের জন্য বিলাসিতাই বটে। তবে শিক্ষা সবার অধিকার এই নীতিটাকেই বাস্তবায়নে এখানে কাজ করছে এই বিদ্যালয়টি। এই স্কুলটি শুরুতে শিক্ষার্থী সংকটে পড়লেও বর্তমানে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি, ঈর্ষণীয় ফলাফলের কারনে অত্র এলাকায় এটি বেশ জনপ্রিয় এবং সমাজের সকল শ্রেণি পেশার জনগোষ্ঠীর নিকট পছন্দের একটি বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক চিন্তার বাইরে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকল্পে এবং সেবামূলক মানসে পরিচালিত হওয়ায় এখানে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদেরকেই ভর্তির ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। এখান থেকে যারা জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় তাদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে ও পড়াশুনার যাবতীয় ব্যয় বহন করছে মমতা। এই স্কুলে সন্তানকে পাঠিয়ে বেশ খুশি তন্ময়ের মা তাহেরা বেগম। তিনি জানান, সারাদিন মানুষের বাসায় কাজ করি, সন্তানকে পড়াশুনা করানো দূরে থাক ঠিকমতো খাবারও দিতে সমস্যা হয়। তবুও আমার সন্তানের পড়াশুনার দায়িত্ব নেয় মমতা স্কুলের স্যারেরা। হাসিমুখে জানালেন, এবার তার ছেলে পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে। কথাগুলো জানানোর সময় কখন যে তার চোখের কোনে জল জমা হয়ে পড়েছে সেটা খেয়ালই করেননি তিনি। মমতা বিদ্যালয়ের আরেকটি বিষয় হলো, এখানে তথাকথিত কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়। এই স্কুলের শিক্ষকরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শেষে কোন পারিশ্রমিক ব্যতীত অপেক্ষাকৃত দূর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ যত্ন নেন। এতে বছর শেষে সবাই ভাল ফলাফল করছে। বিগত তিন বছরের পরিসংখ্যানে মমতা বিদ্যালয়ে প্রতিবছরেই শতভাগ পাস করে এবং এ পর্যন্ত জিপিএ-পাঁচ পেয়েছে মোট ৮ জন। এদের প্রত্যককেই আন্তরিকতার সাথে পরম যত্নে গড়ে তুলেছে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানান, আমরা নিজেদের আনন্দ থেকেই এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে থাকি। কেননা আমরা জানি এসব শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে আসা। তাই তাদেরকে গড়ে তোলার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন মমতার প্রধান নির্বাহী রফিক আহমদ। পড়াশুনার পাশাপাশি এখানে রয়েছে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ ও সুযোগ। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যারা আগ্রহী তাদেরকে মমতা কালচারাল ইনস্টিটিউট’র মাধ্যমে বিভিন্ন মঞ্চে সুযোগ করে দেওয়া হয়। তাছাড়া ছবি আঁকা, গল্প,কবিতা ও আবৃত্তির জন্যও রয়েছে বিশেষ পাঠদান ব্যবস্থা।
স্কুলটির সফলতার বিষয়ে কথা বলেন লায়ন রফিক আহমদ। তিনি জানান, শিক্ষা একটি সার্বজনীন বিষয়। সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে মমতা অত্র অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত কল্পে কাজ করে যাচ্ছে মমতা। ইতোমধ্যে মমতা বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। সেটি সম্পন্ন হলে আমরা তথ্য প্রযুক্তি সম্পন্ন শিক্ষা প্রদান সহ আরও বর্ধিত পরিসরে শিক্ষার সুযোগ প্রদান করতে পারবো। আমি আশা করি অচিরেই এই স্কুল সকলের নিকট একটি মডেল হিসেবে রূপলাভ করবে।

x