দিন যায় কথা থাকে

শৈবাল চৌধুরী

মঙ্গলবার , ২১ মে, ২০১৯ at ৪:৪২ পূর্বাহ্ণ

১৯৭০-এর দশকে তখন আমরা স্কুলের ছাত্র, স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখাটা ছিল থ্রিল মেশানো সাপ্তাহিক বিনোদন। থ্রিল বলার কারণ, বাসায় এবং স্কুলে ধরা পড়ে মার খাওয়া, বকা খাওয়া আর পুরো সপ্তাহ জুড়ে সে ছবির গান গাওয়া। ছবি দেখার পর সে ছবির গানের বই কিনতাম। সুরে বেসুরে গানগুলো গাওয়া হতো স্কুলের ক্লাসরুমে পথে ঘাটে মাঠে। আর রেডিওতে কান পেতে থাকতাম। টেলিভিশন তখনো তেমন সড়গড় হয়নি। ছবির নায়ক নায়িকাদের মতো গায়ক গায়িকারা এমনকি গীতিকার সুরকারেরাও রীতিমত স্টার ছিলেন সে যুগে আমাদের কাছে। আজ বুঝি গানই ছিল মূলধারার সেসব ছবির প্রাণভোমরা। কমপক্ষে ছ’খানা গান থাকতো প্রতিটি ছবিতে। এই গানগুলোর কারণেই ছবিগুলো হিট করতো।
আর রেডিওর তখন ভরা যৌবন। সকাল থেকে মাঝরাত অব্দি কতরকম গানের কতরকম আসর। সে সময় গান শোনার এতরকম অ্যাপস না থাকলে কি হবে, সারাদিন প্রচুর গান শোনা হতো। গীতিময় জীবন। বেসুরো মানুষ সুরেলা ছিল। পড়াশুনোর এত চাপ ছিল না স্কুল কলেজে। হাতে করে বই নিয়ে যেতাম, পিঠে বেঁধে নয়। বিদ্যে অর্জন তেমন হয়নি বটে, তবে জীবনটা বোধ করি বিফলে যায়নি। অনেক আনা মিছে হলেও ষোলো আনা নয়।
রেডিওতে সিনেমার গানগুলো হরদম বাজলেও বেসিক গান যাকে আধুনিক গান বলা হতো সেগুলোও বাজতো। নিত্যনতুন। নতুন গানের জন্য ঢাকা বেতারে প্রতিদিন সন্ধ্যারাতে ‘ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস’ থেকে ‘রঙধনু’ বলে একটা আসর প্রচারিত হতো। রাত সাড়ে আটটা থেকে ন’টা। বড়রা যেহেতু শুনতেন, পড়া রেখে আমরাও শুনতাম। হাউস টিউটর পড়িয়ে তখন চলে যেতেন। আসর শুনে আবার পড়তাম।
অনেক নতুন শিল্পী তখন উঠে আসছেন শাম্মী আখতার, রফিকুল আলম, আফরোজা খানম, নার্গিস পারভিন, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, শামীমা ইয়াসমিন। আর সিনিয়রেরা তো আছেনই। কিন্তু একজন শিল্পীর গান তখন সারাদেশকে মাতিয়ে তুলেছিল-সুবীর নন্দী, কন্ঠটি অন্যরকম, গায়কী সম্পূর্ণ আলাদা, কন্ঠে সুরের দুর্দান্ত মিহি এক মাদকতা, একবার শুনলে অনেকক্ষণ ভাবতে হয়। যে গানটি গাইছেন সেটিই শ্রোতাপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে খন্দকার নুরুল আলম, সত্যসাহা আর শেখ সাদী খানের সুরে। ‘বন্ধু হতে চেয়ে আমি’, পাহাড়ের কান্না দেখে, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে’ ‘আমার এই দুটি চোখ’ ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’ এরকম বেশ কিছু ভিন্ন আঙ্গিকের গান বলতে গেলে এই শিল্পীকে প্রচণ্ড জনপ্রিয় করে তোলে। গানগুলোর কথাও ভিন্ন ধরনের। বেশীর ভাগই মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, নজরুল ইসলাম বাবু ও আবদুল হাই আল হাদীর লেখা। এসব গান পরবর্তী সময়ে সিনেমায়ও ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে আলমগীর কবিরের ‘মহানায়ক’ ছবিতে বেশকটি গান ছিল।
সিনেমার প্লেব্যাকে সুবীর নন্দীকে পাকাপাকিভাবে নিয়ে যান সত্য সাহা। ‘অশিক্ষিত’ ছবিতে ১৯৭৮ সালে। এই ছবির ‘মাস্টার সাব’ গানটি রীতিমত অপরিহার্য করে তোলে সুবীর নন্দীকে সিনেমার প্লে ব্যাকে। অসাধারণ কিছু প্লে ব্যাক রয়েছে তাঁর। ‘ঐ রাত ডাকে ঐ চাঁদ ডাকে’ ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’ ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে’ ‘তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে, ‘তোমারই পরশে জীবন আমার ওগো ধন্য হলো’ ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’ তার কয়েকটি নিদর্শন। প্লেব্যাকে তিনি সত্য সাহার পাশাপাশি পেয়েছিলেন খান আতাউর রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, আলী হোসেন ও শেখ সাদী খানকে। তবে অতৃপ্তি ছিল তাঁর কন্ঠটি যথাযথ ও যথেষ্টভাবে ব্যবহৃত না হওয়ার দুঃখে। অনেক সাধারণ চটুল প্লেব্যাকও তাঁর অসাধারণ গায়কীর কারণে স্মরণীয় হয়ে উঠেছে।
সুবীরের কন্ঠ ছিল শাস্ত্রীয় সংগীত তালিমপ্রাপ্ত। যে কোনো গানের ভেতরে সুর খুঁজতে জানতেন তিনি। সুর বের করে এনে তাকে খেলানোর মুন্সিয়ানা ছিল তার গায়কীতে। সাথে ছিল তার অনুকরণীয় এবং উপমাহীন কন্ঠ। সুবীরের কন্ঠটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের। মার্গসংগীতের অনায়াস চলাচল ছিল। ফলে নিমেষেই যেমন খাদে নামতো তেমনি পরক্ষণেই অত্যন্ত সাবলীলভাবেই তার চূড়ায় উঠে পেতে সক্ষম হতো। সচেতন এবং সাধারণ উভয় ধরনের শ্রোতার সমীহ ও শ্রদ্ধা তিনি পেয়ে গেছেন আজীবন। অন্ত্যোষ্টির আগে তার নশ্বরদেহ যখন শহীদ মিনারে রাখা হয় সর্বস্তরের জনসাধারণের অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের দৃশ্যে তা প্রমাণিত হয়।
হবিগঞ্জ জেলার বানিয়চং গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে তার জন্ম (৩০ নভেম্বর ১৯৫৩)। গানের শুরু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৬৩ সালে। সিলেট গানের দেশ। রাধারমন, হাছন রাজা, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী, শাহ আবদুল করিম, বিদিত লাল দাশের
দেশ বৃহত্তর সিলেট। মরমিয়া ও লোক সংগীতের আকর ভূমি এই শ্রীহট্ট। সুবীরও তালিম নিয়েছেন শাস্ত্রীয় সংগীতে ওস্তাদ বাবর আলী খান এবং লোকসংগীতে পন্ডিত বিদিত লাল দাসের কাছে। রেডিওতে তার প্রথম গান গাওয়া ১৯৬৭ সালে সিলেট বেতারে মাত্র ১৪ বছর বয়সে। তখন হবিগঞ্জে সিলেট বেতার শোনা যেত না, বিশেষ করে বানিয়াচং এ। সুবীর বাবা ও ভাইবোনদের নিয়ে সিলেটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছিলেন রেডিওতে তার প্রথম গান শুনতে। এসব কথা তার এক টিভি সাক্ষাৎকারে জেনেছিলাম। ঢাকা বেতারে প্রথম গান করেন ১৯৭২ সালে। মোহাম্মদ মোজাক্কেরের লেখায় আর মীর কাশেমের সুরে সে গানটি ছিল ‘যদি ধূপ জ্বেলে দেয়। তবে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের গানগুলোই তাঁকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলে।
‘অশিক্ষিত’ ছবির আগে তিনি ১৯৭৬ সালে রাজাশ্যামের (রাজাহোসেন খান ও সুজেয় শ্যাম জুটি) সংগীত পরিচালনায় সূর্য গ্রহণ ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করেন ‘দোষী হইলাম আমি দয়াল রে’। তবে ১৯৭৮ সালে ‘অশিক্ষিত’ ছবির প্লে ব্যাকের মধ্য দিয়েই তিনি পুরোপুরি দর্শক সমক্ষে চলে আসেন। প্লেব্যাকে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর কিছু গান রয়েছে তার সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা ও শাম্মী আকতারের সঙ্গে। বিশেষ করে সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে সুবীর নন্দীর রসায়ন খুব ভালো যা অশিক্ষিত ছবির মাধ্যমে শুরু।
রাগভিত্তিক এবং লোকভিত্তিক সুরে তার কন্ঠ খুলতো বেশী। সুর নিয়ে তখন স্বতস্ফূর্তভাবে খেলতে পারতেন। যেহেতু শতভাগ পেশাদার কন্ঠশিল্পী তিনি ছিলেন না (ব্যাংকের উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন) ফলে নির্বাচিতভাবে গান করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। এর ফলে সুবীর নন্দীর গাওয়া সব গানই শ্রোতাদৃত।
সুবীর নন্দীর গায়কীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট ও শুদ্ধ উচ্চারণ। গানের যে অন্তর্নিহিত অভিনয় এটা তিনি খুব ভালোভাবেই অনুভবে সক্ষম ছিলেন এবং কন্ঠে সে অভিনয় চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। এটা যে কেবল প্লেব্যাকেই তার কাছে পাওয়া যেত তা নয়, বেসিক গানেও এই অভিনয় যথাযথভাবে উপস্থাপন করতেন তিনি।
দেখা গেছে রাগাশ্রয়ী জটিল চলনের গান হলেই সুরকারেরা অবধারিতভাবেই যেতেন সুবীরের কাছে। সুবীরও এসব গান প্রাণবন্ত করে তুলতেন সহজাত পারঙ্গমতায়।
সুবীর নন্দীর আরেকটি বড় গুণ তার অত্যন্ত অমায়িক ও নিরহংকারী আচরণ। আমি তার কয়েকটি মঞ্চানুষ্ঠান শোনার এবং একবার কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। অসামান্য সৌজন্যবোধ ও সদালাপ সৌম্যদর্শন এই শিল্পীকে আরো প্রিয় করে তুলেছিল সবার কাছে। মঞ্চে তার সহবাদ্যশিল্পীদের নির্দেশনা দিতে দেখিনি যেটা অনেক শিল্পী হরহামেশাই করতেন। সহশিল্পীদের অত্যন্ত মৃদুভাষ্যে সুর তাল ধরিয়ে দিতেন। মঞ্চে এবং মিলনায়তন জুড়ে এক সহজিয়া পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেন সহজ সরল আলাপচারিতায়। শ্রোতা ও সমালোচক সকলের সমীহ ও শ্রদ্ধা তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন যা খুব কম জনই পারেন।
রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্মাননায়ও ভূষিত হয়েছেন বার বার। রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ কন্ঠশিল্পীর জাতীয় পুরস্কার পাঁচবার, মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬) শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) এবং মহুয়া সুন্দরী (২০১৫)। খেয়াল করলে দেখা যায়, একটা পুরস্কারের সাথে আরেকটি পুরস্কারের ব্যবধান অনেক। অর্থাৎ প্রমাণ করে তার কন্ঠের ধারাবাহিকতার কোনো ব্যত্যয় নেই। বাচসাস পুরস্কারও পেয়েছেন পাঁচবার। নিজেও কিছু গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন।
অনেকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন সুবীর নন্দী। বেশ ক’বছর আগে আরো একবার ভীষণ অসুস্থ হন। সেবারেও সহযোগিতা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারেও তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিডনির অসুখ খুব জটিল রোগ। কিন্তু তার কন্ঠে বা আচরণে তা ধরা পড়তো না। গত মার্চ মাসেও তার লাইভ অনুষ্ঠান দেখেছি টিভিতে। বরাবরের মতোই সাবলীল ছিলেন।
রেডিওতে, টেলিভিশন ও সিনেমায় প্রায় আড়াই হাজার গান গেয়েছেন তিনি। বেশীরভাগই শ্রোতাপ্রিয়। বিশাল এক অর্জন। শারীরিক অসুস্থতা এই শিল্পীকে সত্যিকার অর্থেই অকালে থামিয়ে দিল। মাত্র ৬৬ বছর বয়সে ৭ মে ২০১৯ এর ভোরে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে। হবিগঞ্জে জন্ম নেয়া শিল্পী মিশে গেলেন কর্মভূমি ঢাকার মাটিতে মে অপরাহ্নে। শিল্পীর মৃত্যু নেই। শিল্পীরা অমৃতের সন্তান। মৃত্যুকে তারা অস্বীকার করেন আপন সৃষ্টিতে, কীর্তিতে, কৃতিতে।

x